মনের যত্ন …

শাহিদা আরবী ছুটি

(ক্যানবেরা অস্ট্রেলিয়া থেকে): আমি খুব চাই, আমার এই লেখাটা সবাই পড়ুন.. আজকে সময় না থাকলে কালকে পড়ুন, তবুও পড়ুন।

এক.

আমার মেয়ের বয়স ছয় বছর। তিন বছর বয়স থেকেই সে ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করে। টুল নিয়ে বেসিনের পাশে দাঁড়িয়ে সে খুব আগ্রহ নিয়ে এই কাজটা করে। যেই বাচ্চা জুতার ফিতাটা পর্যন্ত ঠিক করে বাঁধতে পারেনা,সে এই পার্সোনাল হাইজিনটা ঠিক জানে।

একইভাবে সে যখন পড়ে গিয়ে কোথাও ব্যথা পায়, সেই জায়গাটা কাটুক কিংবা না কাটুক , রক্তের কোনো চিহ্ন থাকুক কিংবা না থাকুক – সে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে। তার তখন একটা ব্যাণ্ডেজ লাগবে এবং সেই সঙ্গে লাগবে সেই ব্যথা পাওয়া জায়গায় আমার একটা চুমু।

ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ দেয়ার বিষয়টা আমরা সবাই জানি, ক্ষত ঢাকার প্রক্রিয়াটা আমাদের ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়। যদিও আমাদের সময় অবশ্য এসব ব্যাণ্ডেজ ফেন্ডেজ এতো পপুলার ছিলোনা, তখন ছিলো অন্য প্রক্রিয়া. যেমন হাত পা  ছিলে গেলে, ঘাস ডলে সে ক্ষতস্থানে তার রস লাগানো, ঠান্ডা  লাগলে অল্প একটু হলুদ গরম দুধে দিয়ে সেই দুধ পান করা, খুশ খুশ কাশিতে আঁদা চা খাওয়া (যদিও এটা ছোটদের জন্য সেভাবে বরাদ্দ ছিলোনা) তখন এমন আরো অনেক ঘরোয়া নিরাময় পদ্ধতি ছিল , যা আমাদের তৎক্ষনাত ফার্স্ট এইড সার্ভিস দিতো।

আচ্ছা সেই ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় কি করে শরীরের যত্ন নিতে হবে, কিভাবে সাধারণ ক্ষতগুলো দ্রুত নিরাময় করা যাবে, কিন্তু মনের বিষয়ে আমাদের কিছু বলা হয়না কেনো ? আমাদের শরীর এক ধরণের যত্ন পায় আর আমাদের মনের স্বাস্থ্যের  বিষয়টা আমরা এভাবে চেপে যাই কেনো ? কেনো মনের ফার্স্ট এইড সার্ভিস আমাদের শেখানো হয়না?

স্কুলের প্রিয় বন্ধুর বাবার যখন অন্য জায়গায় ট্রান্সফার হয় তখন সেই প্রিয় বন্ধুকে হারাবার কষ্ট আমরা বুকে চেপে মুভ অন করি , নতুন বন্ধু বানাই তারপর সেই কষ্ট ভুলে যাই একসময়। কেনো ? কেন মনের সেই শত শত ক্ষতগুলো আমরা খোলা বাতাসে এমনি এমনি শুকিয়ে নিরাময় করি ?

কেনো আমাদের বাবা মা এগুলো বলেনি, ‘ও দূরে চলে গেছে এটা অবশ্যই খুব দুঃখজনক কিন্তু ও তো ইচ্ছে করে যায়নি, ওর বাবার ট্রান্সফার হয়েছে। ও তোমার বন্ধু ছিলো এবং থাকবে। তুমি ওকে চিঠি লিখতে পারো, ঈদে কার্ড পাঠাতে পারো , স্কুলের ছুটিতে ওর বাসায় ঘুরে আসতে পারো এবং আরো আনন্দের ব্যাপার হলো তোমার এখন নতুন আরো কিছু বন্ধু হবে, যাদের গল্প ওকে চিঠি লিখে বলতে পারো।’

তাহলে আমরা খুব সহজেই সে সময় গ্রিফ (দুঃখপ্রকাশ) হ্যান্ডেল করাটা শিখে ফেলতাম। চিঠি লিখা , ঈদে কার্ড পাঠানো, নতুন বন্ধু বানানো এসব আমরা হয়তো এমনিতেই করেছি, মনের অজান্তে করেছি-কিন্তু ছোটবেলার সেই গ্রিফ বা হারানো টাকে কেউ ঠিক করে আইডেন্টিফাই করেনি। কেউ ব্যাণ্ডেজ লাগিয়ে দেয়নি..

এভাবে, অটোমেটিক উপায়ে আমরা অনেকগুলো ঘা শুকাতে শুকাতে বড় হই, তারপর? তারপর বড় বেলার বড় ঘা গুলো নিয়ে আমরা বিপাকে পড়ে যাই।  আমরা খুব চাই ছোটবেলার মতন ঘা গুলো এমনি এমনি শুকিয়ে যাক, কিন্তু বড়বেলার বড় ঘা গুলো আর বাতাসে শুকায় না – একসময় সেখান থেকে ক্যান্সার হয়, আর  আমরা একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই।

দুই.

ধরা যাক, একটা মেয়ে একটা ছেলের সঙ্গে ব্রেক আপ করেছে, সেই ছেলে যখন তার কাছের কোনো বন্ধুর সঙ্গে ব্যাপারটা শেয়ার করে , তখন সেই বন্ধুটি ধুম করে বলে ফেলে।

”আরে ওতো একটা মা**, আগেই কইসিলাম দূরে থাক. যাক ব্যাপার  না – ভাত থাকতে কাউয়ার অভাব হয়না তুই এর চেয়ে অনেক ভালো মেয়ে পাবি , মুভি ওন দোস্ত”

কি হলো এর মানে? সে আপনাকে তার মতোন সমাধান দিয়েছে, মনের খায়েশ মিটিয়ে আপনার এক্স কে গালি দিয়েছে। আপনার পুরো কষ্টের বিষয়টা সে ভাত আর কাউয়ার সঙ্গে তুলনা করেছে, কিন্তু আপনার মনের ক্ষতটুকু সে আইডেন্টিফাই করেনি , বলেনি –

‘দোস্ত, আমি হয়তো তোর মতন করে তোর কষ্ট বুঝবোনা কিন্তু আমারও খুব খারাপ লাগছে – এমন হওয়াটা ঠিক হয়নি। আমি জানিনা আমি কি করতে পারবো কিন্তু চল আজকে সারারাত আমার বাসার ছাদে গিটার বাজাই, গান গাই। ’

তারপর সেই গান গাইতে গাইতে বললো , ‘দোস্ত পৃথিবীতে আরো অনেক ভালো, লক্ষী মেয়ে আছে যে তোকে হয়তো তোর মতন করে ভালোবাসবে, this is not end of the world …. আস্তে আস্তে তুইও মুভ অন কর …’

একই ভাষ্য , একই উপদেশ কত আলাদা ভাবে দেয়া যায়।

কিন্তু তা হয়না, সেই ছেলে আরেক মেয়ের সঙ্গে মুভ অন করে ঠিকই  কিন্তু তার মনে থাকে অবিশ্বাস , তার ভালোবাসা নির্মল হয়না, হয় খুব কন্সাস। খুব ছোট থেকে ছোট ভুলে, সেও একসময় তার দ্বিতীয় গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ব্রেক আপ করে। ব্রেক আপ তার কাছে এখন ডাল ভাত – কিন্তু ব্রেক আপ এর সময় সেই মেয়েকে সে তার বন্ধুর শেখানো সেই গালিটা দিয়ে ফেলে, যেই গালি সে আগেরজনকে দিতে পারেনি।

তারপর সেই মেয়ের বান্ধবী এই কাহিনী জেনে বলে উঠে – ‘হারামজাদা কোথাকার , দেখলেই ফালতু মনে হইতো। ওর কপাল তুই ওর সঙ্গে প্রেম করসিস , কাউয়ার মুখে কমলা। বাদ দে , দুনিয়ার আরো কত পোলা তোর জন্য লাইন ধরে আছে। মুভ অন কর ’

মুভ অন এতো সহজ? কারো এক পা ভাঙলে তাকে কি বলেন অন্য পা দিয়ে দৌড়াতে ? সে পাড়বে ?তাহলে কি হলো এটা? কষ্টটার আইডেন্টিফাই হয়েছে? মেয়েটার হয়তো ব্রেক আপ না কিন্তু ছেলেটার দেয়া সেই গালি কুরে কুরে খাচ্ছিলো। ছেলেটার সঙ্গে তো তার শুধু মনের সম্পর্ক ছিলোনা , শরীরেরও ছিল।  তাহলে কি সে সত্যি সত্যিই একটা মা**?

শুরু হয় ডিপ্রেশন, আতঙ্ক … ঘৃণা হয় নিজের শরীর ,মনকেও  … তারপর? তারপর কোনো একদিন সে তার পেছনে ছেলেদের বিশাল লাইন উপেক্ষা করে আত্মহত্যা করে ফেলে।

শুধু যদি একবার সেই বান্ধবীটা বলতো , ‘দোস্ত একেইতো ব্রেক-আপ তার উপর এই কুৎসিত গালি। আমার খুব খারাপ লাগছে কিন্তু শোন, তুই মোটেও এমন না।  আমি জানি তুই কেমন মেয়ে, তোর আব্বা আম্মা জানে তুই কেমন মেয়ে , অমুক ভাই তমুক আন্টি জানে তুই কত লক্ষী। একটা গালি তোকে পাল্টে দেয় নাই। গালি দেয়া না দেয়া পারিবারিক শিক্ষা , সেই শিক্ষা ওর ছিলোনা কিন্তু তুইতো ভালো মেয়ে। পুরা পৃথিবীর কাছে তুই যেমন ছিলি তেমনি আছিস। চল আজকে ধানমন্ডির ক্রিমসন কাপে কফি খাই, ফারজানা শাকিলস এ আমার ভ্রু প্লাগ করতে হবে – তোর হেয়ার কালারও  যা তা অবস্থা – চল হেয়ার কালারও করে আসি।আজকে  আমি সারাদিন ফ্রি।”

আপনি সারাদিন ফ্রি না থাকলেও , বান্ধবীর জন্য হয়ে ফ্রী হয়ে যান।  আপনার বান্ধবীর তৎক্ষণাৎ ফার্স্ট এইড লাগবে , মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড। এই সামান্য চিকিৎসা হয়তো, আপনার বান্ধবীর জীবন রক্ষা করতে পারে।

পরিশেষে :

লেখাটা বড় , বেশ বড়। সেজন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমার পাঠকের কোনো নির্ধারিত বয়সসীমা নেই। তাই বড়বেলা ছোটবেলার দুটো উদাহরণ দেয়াই আমার জন্য জরুরি ছিলো।আমাদের মধ্যে কেউ হয়তো বাবা মা কেউ হয়তো বন্ধু বান্ধবী , কেউ হয়তো দুটোই। তাই, যে যেই বয়সেই থাকুন না কেনো , আসুন আমরা মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড শুরু করি..

পার্সোনাল হাইজিন এর পাশাপাশি, ইমোশনাল হাইজিন চর্চা করি. মনের ক্ষতগুলোকে কিভাবে দেখে – শুনে – বুঝে নিরাময় করা যায় সেই চর্চা করি. এই জিনিস পশ্চিমা বিশ্বে ঢুকে গেছে কিন্তু আমাদের মাঝে ঢুকেনি। এই জিনিস মাথায় ঢুকানোর জন্য টাকা পয়সা না, প্রথমে সচেতনতা দরকার। আসুন, উপরের উদাহরণের মতন – আমরা একজনের ঘৃণা বহন করে আরেকজনের মাঝে ছড়িয়ে না দেই…

তথ্য : পার্সোনাল হাইজিন – যেমন দাঁত ব্রাশ করা, মাথায় শ্যাম্পু করা, নিয়মিত গোসল করা, ডিওড্র্যান্ট ব্যবহার করা – মাত্র গত পঞ্চাশ বছরে এই বিশ্বে অনেক পপুলার হয়ে উঠে। তার ফলস্বরূপ – গত বিশ বছরে , এই কারণে মানুষের গড় আয়ু ২০-৩০ বছর বেড়ে যায়।
জাস্ট একবার ভাবুন, ইমোশনাল হাইজিন মানে নিজের মনের ক্ষত সময়মতোন আইডেন্টিফাই করে নিরাময় করতে জানলে এবং নিয়মিত যত্ন নিতে পারলে কতশত মানুষ বেঁচে যাবে।

আসুন শরীরের পাশাপাশি আমরা আমাদের মনের যত্নকেও বাধ্যতামূলক করে ফেলি ..

ছবি: লেখক/গুগল