মনে পড়ে ভেন্টিলেটার ছিলো

ইরাজ আহমেদ

স্মৃতির বারান্দায় পায়চারী করতে করতে মনে পড়লো ভেন্টিলেটারের কথা। শহুরে বাড়িতে এখন আর ভেন্টিলেটার বলে কিছু নেই। নতুন সময়ে স্থাপত্য পরিকল্পনার অংশ নয় আর ছাদের কাছাকাছি সেই চৌকো ফাঁকা জায়গাটুকু। বইতে পড়েছি ঘুলঘুলি নামটা। এখন থেকে বছর তিরিশ আগেও এই শহরের প্রায় সব বাড়িতেই ভেন্টিলেটার থাকার চল ছিলো। নতুন প্রজন্মের অনেক পাঠকই হয়তো ভাবছেন, এ আবার কী বস্তু! আসলে বদ্ধ ঘরে হাওয়া চলাচলের জন্য তৈরী করা হতো ভেন্টিলেটার। তখন তো এয়ার কন্ডিশনারের এতো প্রতিপত্তি ছিলো না। হয়তো অপ্রতুল ছিলো ফ্যানও। আর তখন ঢোকার বহু বাড়িতেই ছিলো কাঠের জানালা। রাতে আবদ্ধ ঘরে বাইরের হাওয়ার সঙ্গে সংযোগ তৈরীর পথ তৈরী করতো ভেন্টিলেটার।
ভেন্টিলেটার কি শুধুই বায়ু চলাচলের পথ হিসেবেই থেকে যেত? একেবারেই নয়। শৈশব থেকে দেখেছি সেই ভেন্টিলেটার পাখির, বিশেষ করে চড়ুই পাখির বাসা হিসেবেই বেশী ব্যবহৃত হতো। আমার জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে ভাড়া বাড়িতে। সে সব বাড়িতে তখন ভেন্টিলেটার ছিলো। নতুন ভাড়া বাড়িতে উঠেও দেখেছি ভেন্টিলেটারে রয়ে গেছে চড়ুই পাখির বাসা। ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গতেই শুনতে পেতাম তাদের কিচিরমিচির। কোত্থেকে রাজ্যের খড় এনে ভেন্টিলেটারে জমা করতো তারা। অনেক সময় পাখিদের জমানো খড় আর নানা জিনিসে ভর্তি হয়ে আটকে যেতো ভেন্টিলেটারে হাওয়া চলাচলের পথ। সেখানেই তাদের ডিম ছাড়া এবং সন্তান উৎপাদন। তারপর একটা সময়ে বাচ্চা চড়ুই পাখিরা বড় হয়ে উড়ে যেতো ভেন্টিলেটারের ঘর পেছনে ফেলে। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবতাম ভেন্টিলেটারে ওরা ঢোকে কী করে! কারণ ওই সামান্য ফাঁকটুকু দুদিক থেকেই সিমেন্টের তৈরী নকশাকাটা জাল দিয়ে আটকানো থাকতো।তখন স্যানিটারি সামগ্রীর দোকানে ভেন্টিলেটারের নানা ধরণের নকশাকাটা জাল পাওয়া যেতো।
ছোটবেলা একটা প্রিয় কাজ ছিলো চেয়ারের ওপর মোড়া বসিয়ে চড়ুই পাখির ঘরে ডিম দেখা। দেখে নেয়া কটা বাচ্চা হলো তাদের।আমার বন্ধুদের কেউ কেউ চড়ুইয়ের ডিমও চুরি করতো।
ভেন্টিলেটার তখন অনেক বাড়ির বাসিন্দাদের লকার হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তখন চোরের খুব উপদ্রব ছিলো। মূল্যবান সোনার গহনা আর টাকাও অনেকে গচ্ছিত রাখতো ভেন্টিলেটারে। সেক্ষেত্রে ঘরের ভেতরে ভেন্টিলেটারের জালটা আলগা করা থাকতো। মনে আছে একবার একটি ভাড়া বাড়িতে উঠে ভেন্টিলেটারে সামান্য কয়েকটা টাকা পেয়েছিলাম। সম্ভবত পূর্ববর্তী ভাড়াটের সম্পদ। আমার দাদু টাকাগুলো এক ভিক্ষুককে দান করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চড়ুই পাখিরা কিছু সময়ের জন্য বিপদে পড়েছিল। তখন শহরের সব বাড়িতেই ভেন্টিলেটার ক্যালেন্ডারের শক্ত পৃষ্ঠা কেটে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ব্ল্যাকআউটের রাতগুলোতে ঘরের মৃদু আলোও যাতে বাইরে যেতে না পারে সেজন্যই ওই ব্যবস্থা নেয়া। তখন প্রতিবেশী পাখিদের কথা ভেবে মন খারাপ হতো।
সেদিন এক বাসার ছাদের চিলেকোঠার ঘরে পাখির বাসা দেখে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি হুড়মুড় করে সামনে এসে দাঁড়ালো। মনে পড়লো ভেন্টিলেটারের কথা। চড়ুই পাখি তখন ভেন্টিলেটারের কল্যাণে আমাদের প্রতিবেশী ছিলো।তাদের সংসারের কিচিরমিচির শব্দ, তাদের আসা যাওয়া ছিলো আমাদের খুব পরিচিত। এখন আমরা আর পাখিদের প্রতিবেশী নই।

ছবিঃ গুগল