মনে পড়ে সেই বইগুলোর কথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মনে পড়ে ছেলেবেলার সেই রঙচঙে আর মনকেমন করা গন্ধে মাখামাখি সেই রুশ বইগুলোর কথা? মনে পড়ে চুক আর গেক-কে? আর সেই ধলা কুকুর শামলা কান, মিশকা ভালুকের কথা?এখন থেকে তিরিশ অথবা চল্লিশ বছর আগের কথা। বাঙালি সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়ে এসব বই আর চরিত্রগুলো ছিলো সঙ্গী। এখন যারা চল্লিশ বা পঞ্চাশের কোঠায়, তাঁদের অনেকেই মনে করতে পারবেন ছোট্ট চড়ুইপাখি পুদিকসোনার গল্প, সিভকা-বুরকার জাদু ঘোড়া, নীলচে ফড়িং, বাবায়াগার অদ্ভুতুড়ে কালাজাদুর মন্ত্রের কথা।

কারা লিখেছিলেন সেসব বই? টলস্টয়, পুশকিন, গোর্কি, চেখভ, দস্তয়েভস্কি, গোগোল, তুর্গেনেভ-এর মতো পৃথিবীখ্যাত লেখকরা কলম ধরেছিলেন তখন শিশুদের জন্য। ছিলো মনীষীদের জীবনকথা, বিজ্ঞানের বিচিত্র খবরে বিশ্বপরিচয়ের হাতছানি। রুশ সাহিত্যের এই সব অমূল্য সম্পদ বাঙালি পাঠকের হাতে পৌঁছে যেতো ‘প্রগতি’ বা ‘রাদুগা’র মতো প্রকাশনা সংস্থার হাত ধরে।

১৯৩১ সালে সোভিয়েট ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় প্রকাশন সমিতি পৃথিবীর বিভিন্ন  ভাষায় রাশিয়ার সমাজতন্ত্রী মতবাদের পাশাপাশি সোভিয়েট সাহিত্য অনুবাদ ও প্রচারের জন্য একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম ‘বিদেশি শ্রমজীবীদের প্রকাশন সমিতি’। ১৯৩৯ সালে সংস্থার নতুন নাম হয় ‘বিদেশি ভাষায় সাহিত্য’ প্রকাশনালয়, পঞ্চাশের দশকে সেখানে গড়ে ওঠে স্থায়ী বাংলা বিভাগ। ১৯৬৩ থেকে ‘প্রগতি’ নামেই বাড়তে থাকে প্রকাশনীর জনপ্রিয়তা। এর বাংলা বিভাগে সে সময় অনুবাদক হিসেবে কাজ করতেন ননী ভৌমিক, নীরেন্দ্রনাথ রায়, শুভময় ঘোষ, সমর সেন, বিষ্ণু মুখোপাধ্যায়। ছেলেবেলার সেই বইগুলোর পৃষ্ঠা উল্টালেই এই নামগুলো চোখে পড়তো। ননী ভৌমিকের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’, ‘চলো সোভিয়েত দেশ বেড়িয়ে আসি’র মতো লেখার পাশাপাশি শিশুকিশোর সাহিত্যের অনুবাদ বিখ্যাত হয়েছিলো। আর বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় করতেন সামাজিক বা রাজনৈতিক মতাদর্শমূলক সাহিত্যের অনুবাদ। আলেক্সেই টলস্টয়ের ‘দ্য লেম প্রিন্স’-এর অনুবাদ ‘খোঁড়া রাজকুমার’ খুব জনপ্রিয় হয়। এই তালিকায় ছিলো নিকোলাই অস্ত্রভস্কির বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইস্পাত’।

সত্তরের দশকে বাংলা অনুবাদে রুশ শিশুতোষ বইগুলো দ্রুত বাজার বাড়াতে সক্ষম হয়। তখন বাংলাদেশও স্বাধীন রাষ্ট্র। আগের চাইতে অনেক বেশি সংখ্যক রুশ বই বাংলাদেশের শিশুদের হাতে চলে আসে। তখন বাঙালি পাঠকের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিলো কয়েকটি পত্রপত্রিকাও— ‘সোভিয়েত দেশ’, ‘সোভিয়েত নারী’, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে প্রবন্ধ, রাশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান-বিষয়ক রচনা, কারিগরি শিল্প আর হাতের কাজের বিভাগ থাকতো এগুলিতে।

তবে বাঙলা ভাষায় অনুবাদ হয়ে আসা রুশ শিশু সাহিত্যের বইগুলো ছোটদের জগতকে ভীষণ ভাবে আলোকিত করেছিলো তাতে সন্দেহ নেই।  ১৯৮২ সালে প্রগতি প্রকাশনার একটি শিশু বিভাগ গড়ে ওঠে, নাম ‘রাদুগা’। রুশ ভাষায় যার অর্থ রংধনু। ‘দাদুর দস্তানা’, ‘নাম ছিল তার ইভান’, ‘রুপোলী খুর’, ‘পীত দানবের পুরী’, ‘মোরগছানা’, ‘বাহাদুর পিঁপড়ে’, ‘আলতাজবা’— নামে আর বিষয়বস্তু আর বাঙালি আবহে অনুবাদ করা রঙিন বইগুলো ঘুরতো বাচ্চাদের হাতে হাতে। দেশীয় শিশু সাহিত্যের পাশাপাশি এই বই আর সেখানকার মজার সব চরিত্র বাচ্চাদের মনের মধ্যে স্থায়ী আসন তৈরি করে নেয়। চুক আর গেকের মতো‌ রেলগাড়ি চড়ে বরফের দেশে বাবাকে খুঁজতে যাওয়া, ছোট্ট মেয়ে দারিয়াঙ্কার মতো পোষা বেড়াল লাভালাইকাকে আদর দিয়ে ‘মানুষ’ করা, গরিব চাষির ছেলের হাতে খারাপ জমিদারের শাস্তি, এই সবের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠতো তখন  কৈশোরের ভালমন্দের বোধ। ‘সাগরতীরে’ বইয়ের আলসে ছেলেটা দায়িত্ব নিতে শেখায় আর এফিমকাকার বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় স্বস্তির শ্বাস ফেলত সবাই।আলেকজান্ডার বেলায়েভের উপন্যাস ‘উভচর মানুষ’ তিন দশক আগেও শিশু-কিশোরদের হাতে হাতে ঘুরতে দেখা যেতো।

সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সরকারি অনুদানে নির্ভরশীল এই উজ্জ্বল প্রকাশনাগুলো এক সময় বন্ধ হয়ে গেলো। সেসব বইগুলো পুরনো হয়ে খবরের কাগজওয়ালাদের কাছে বিক্রি হয়ে গেলো। এই শহরের কয়েকটি এলাকার ফুটপাতে এই বইগুলো আজো বিক্রি হতে দেখা যায়। সেই সময়ের মানুষেরা কেউ কেউ ছেলেবেলার সোনালী দিনগুলোর কথা ভেবে কিনে নিয়ে যান স্মৃতিমাখা বই।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

ছবিঃ প্রাণের বাংলা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]