মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

পাকশীতে আমরা

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

পাবনার স্মৃতি  

তখন সবে স্বাধীনতা এসেছে। দেশভাগের বেদনা উপমহাদেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ইংরেজরা চলে গেছে। তাদের তৈরী মফস্বল শহরগুলো তখনো সেরকমই ছিলো, যেরকম তারা রেখে গিয়েছিলো। পরে পরিণত বয়সে বিলেতে বসবাসের সময় দেখেছি সেখানকার ছোট ছোট শহরগুলোর চেহারা পঞ্চাশ কি ষাটের দশকের আমাদের মফস্বল শহরের মত একই রকম। ভারী ছিমছাম, পরিষ্কর-পরিচ্ছন্ন, শান্ত, নিরিবিলি। সেখানকার জীবন নিস্তরঙ্গই হয়তো ছিলো। আমরা ছোটরা সেটা বুঝতে পারতাম না। আমাদের সময় আনন্দে কাটতো। আমার বড় চাচা সিভিল সার্জন থাকায় নানা শহরে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে। চাচা যখন বগুড়া ছিলেন, তখন সেখানকার স্মৃতি খুব স্পষ্ট নয়। বেশ ছোট ছিলাম। আমার যমজ চাচাতো ভাইরা সবে উপুড় হতে শিখেছে। বাড়িটা ছিলো বড়, টানা লম্বা। পাশে নদী, করতোয়া। বাড়িতে গরু ছিলো। বাছুর জন্মের পরই টলমল করে উঠে দাঁড়াচ্ছে দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। এর বেশী কিছু মনে নেই। কিন্তু পাবনার কথা মোটামুটি মনে আছে। সেখানেও বাড়ি থেকে ক’পা এগোলেই নদী ছিলো, ইছামতী। তবে শীতকালে নদীর সেই শাখাটা শুকিয়ে যেতো। তার ওপর লোহার পুল ছিলো। আমরা তখন পুলের ওপর দিয়ে না গিয়ে নিচ দিয়ে হেঁটে নদী পার হতাম।
আমি চন্দ্রঘোনায় ইংরেজী মিডিয়াম স্কুলে লেখাপড়া শুরু করার পর পাবনা গিয়ে বাংলা লিখতে-পড়তে শিখলাম। আমার যমজ চাচাতো ভাই মিঠুল ও টুটুলের সঙ্গে একই স্কুলে আর একই ক্লাসে ভর্তি হলাম। আমরা হেঁটেই স্কুলে যেতাম। জেলখানা পার হতাম। একটা মড়াকাটা ঘরও পেরোতাম। আমার ভাইরা সেটাতে ঢুকতো, কিন্তু আমি ভয় পেতাম। আমার দুই বোন রিনি ও পিউ অন্য স্কুলে পড়তো। সেই স্কুলে সুচিত্রা সেন পড়তেন। ওদের স্কুলে গিয়ে গ্রুপ ছবিতে তাঁকে দেখেছি। রিনি পিউর সঙ্গে আমি টাউন হলে গান শিখতে যেতাম। সেই টাউন হলেই অনেক নাটক দেখেছি – মেজদি, শাহজাহান, পরিণীতা। সেই বয়সে থেকেই নাটকের প্রতি আকর্ষণ তৈরী হয়। বড় চাচার এক পিয়ন ছিলেন, হারিস মিয়া।

পিউর সঙ্গে আমি

তিনি আমাদের সিনেমার কাহিনী বলতেন, সেটাও আমাদের খুব পছন্দ ছিলো। খুব বেশী সিনেমা যে দেখতাম, তা নয়। তখন আমরা বেশ ছোট। তবে একবারের একটা মজার ঘটনর কথা মনে আছে। সেই সময় মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ছিলো অটুট। তাই কাজের লোকজনের হাতে আমাদের ছেড়ে দিয়ে আব্বা, মা, চাচা, চাচী ঢাকা গেলেন। যাবার আগে আমাদের সিনেমা দেখার টাকা দিয়ে বলে গেলেন, শহরে ‘চন্দ্রলেখা’ বলে জেমিনী সার্কাসের দৃশ্য সম্বলিত একটা ছবি এসেছে, সেটা দেখতে।

রিণির সঙ্গে আমি

এদিকে আমরা তো হিন্দি বুঝি না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ‘চন্দ্রশেখর’ নামে একটা বাংলা ছবিও চলছে। আমরা বেশ ঘটা করে সেটা দেখতে গেলাম। বলাবাহুল্য বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনী বোঝার বয়স আমাদের কারো হয়নি। ফলে সিনেমা দেখার আনন্দ মাঠে মারা গেলো। আমরা তখন খুব রেডিও শুনতাম। আমরা তিন বোন – রিনি, পিউ আর আমি আকাশবাণী রেডিও’র নাটক শুনতে খুব ভালবাসতাম। অন্যদিন দুপুরে না ঘুমালেও শুক্রবার দুপুরে ঘুমাতাম. যাতে আমারদেও নাটক শুনতে দেওয়া হয়। আকাশবাণীতে আর যে অনুষ্ঠান আমাদের খুব পছন্দ ছিলো, সেটা হলো গান শেখাবার আসর। পঙ্কজ মল্লিক গান শেখাতেন আর যে গানই তিনি শেখাতেন, আমরা সেটাই শিখতাম। তিনি একবার ভারতের জাতীয় সঙ্গীত শেখাচ্ছিলেন, আমরা সেটাও শিখেছিলাম -‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে।’ সেটা যে অন্য দেশের জাতীয় সঙ্গীত, সে বোধ হবার বয়স তো তখন আমাদের হয়নি। পাবনাতই প্রথম বাংলা বই পড়েছিলাম, ‘আজব দেশে এলিস’। অনুবাদ গ্রন্থ। তার আগে কমিক পড়তাম।
আমাদের সময় খুব আনন্দে কাটতো। আমরা পাঁচ ভাইবোন (বড় তিনজন ঢাকায় লেখাপড়া করতো) একসঙ্গে খেলতাম, বেড়াতাম, টিউবওয়েলে গোসল করতাম। বাড়িতে অনেকগুলো গরু ছিলো – সোনালী, মঙ্গলী, বুধি। লাল রঙের দোতলা বাড়িটায় অনেকগুলো ঘর ছিলো। সব ঘর কাজে লাগত না। তাই আমরা খেলার জন্য গোটা একটা ঘর পেয়েছিলাম। সিভিল সার্জেনের বাড়ি বলে বেশ বড় লন ছিলো। পাড়ার অনেকেই সেখানে খেলতে আসতো। সে সময়ের বন্ধুদের মধ্যে মঞ্জুর এবং তার বোন জেসমিনকে মনে আছে। পরে বড় হয়েও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আব্বা যখন চট্টগ্রামে মারা যায়, তখন ওরা সেখানে ছিলো। মঞ্জু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলো। পরে ও ফরেন সার্ভিসে যোগ দেয়। চাচাকে কর্মসূত্রে ্খানে-ওখানে যেতে হতো আর আমরা সঙ্গে জুটে যেতাম। পাকশীতে যেতাম। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখতে খুব ভাল লাগতো। একবার হেমায়েতপুরের পাগলা গারদে গিয়েছিলাম। আমরা অবশ্য বাইরে নদীর পাড়ে ছিলাম, ভেতরে ঢুকেছিলাম বলে মনে পড়ে না। সেখানে জীবনে প্রথম সী-প্লেন দেখেছিলাম। প্লেনকে আকাশে উড়তে দেখেছি, সেটা যে নদীতে নেমে আসতে পারে জেনে আমাদের বিস্ময়ের সীমা ছিলো না।
বড় হবার পর শৈশবের বেশ কিছু জায়গায় গিয়ে এত হতাশ হয়েছি যে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পাবনা যাইনি। আমার সেই সুন্দর, ছিমছাম, শান্ত, নিরিবিলি শহরের স্মৃতিটা বুকের মধ্যে সযতেœ লালন করতে চাই।

ছবি: লেখক সৌজন্যে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]