মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

সংস্কৃতিবান শহর কুমিল্লা 

কিছুদিন আগে কুমিল্লা গিয়েছিলাম। কলকাতা থেকে আমাদের এক বন্ধু দম্পতি ঢাকা গিয়েছিলেন। তাঁদের ময়নামতি দেখাবো বলে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে এত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছি যে, সে কথা বলে বোঝানো যাবে না। ময়নামতির শালবন হয়েছে পিকনিক স্পট, যেখানে তারস্বরে হিন্দি গান বাজছে। জাদুঘরের পাশে একটা মসজিদ হয়েছে, তার দান বাক্স নিয়ে একজন বসে আছেন বৌদ্ধ বিহারের মুখটাতে। পরে শহরে গিয়ে মনটা আরো দমে গেলো। এত ঘিঞ্জি শহরটা হয়ে গেছে। অথচ আমার শৈশবের বেশ বড় একটা সময় সেখানে কেটেছে। ভারী সুন্দর আর নিরাপদ শহর ছিলো।
আমার বড়চাচা সিভিল সার্জেন থাকায় সে সময় অনেক শহরে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কুমিল্লায় সেভাবেই থাকা। সেটা ষাটের দশকের একবারে গোড়ার দিকে। আমি সেখানে বছরখানেক স্কুলেও পড়েছি। আমি পড়েছি শৈলরানী পৌর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। বাড়ির কাছেই ছিলো স্কুল। হেঁটে যেতাম। আমার দুই চাচাতো বোন রিনি আর পিউ ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে পড়তো। সেখানে জায়গা না থাকায় আমি শৈলরানীতে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলটা ভালই লাগতো। অনেক পুরনো স্কুল। প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে। সেখানে সরস্বতী পূজা করেছিলাম আর খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। প্রতিটি শহরের পাশেই একটা নদী পেয়েছি। কুমিল্লায় আছে গোমতী নদী। ময়নামতীর বৌদ্ধ স্তূপ আর শালবন বিহার খুব কাছেই, তবে সেটা শৈশবের স্মৃতিতে ততটা স্পষ্ট নয়। কুমিল্লা শহরে একটা অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং পুরনো লাইব্রেরী আছে, রামমালা পাঠাগার। সেটাও কলেজে পড়ার সময় এক্সকারশনে গিয়ে দেখে মোহিত হয়েছিলাম। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই অনুপম লাইব্রেরী এক সময় বিখ্যাত স্কুল ঈশ্বর পাঠশালার গ্রন্থাগার ছিলো। সেখানে অনেক অমূল্য পাণ্ডুলিপি ছিলো, আশা করবো এখনো আছে। কুমিল্লায় সে সময় অনেকগুলো দীঘি ও পুকুর ছিলো। সেগুলোর নাম অন্য জেলার লোকরাও জানতো। সব মিলিয়ে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিম-ল ছিলো খুবই সমৃদ্ধ। আমাদের শৈশবে অনেক ঘরোয়া গানের আসরে গিয়েছি। শুনেছি এখনো সেখানে সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজিত হয়।
কুমিল্লায় তখন আমাদের এক ফুফুও থাকতেন। আসলে একজন নয়, তিনজন ছিলেন। বিলকিস ফুফুর ছোট দুই বোন রিনা আর বীনাও তাঁর সঙ্গে থাকতেন। তাঁরা দু’জন তখন লেখাপড়া করেন। বীনা ফুফুকে আমরা বুড়িফুফু বলে ডাকতাম। তিন ফুফুর আদরে আমাদের সময় সে বাড়িতে খুব আনন্দে কাটতো। ততদিনে আমাদের বেশ সিনেমা দেখার নেশা হয়ে গেছে। আমরা প্রায় প্রতি রবিবার মর্নিং শো দেখতে যেতাম। পাঠকদের নিশ্চয় জানা আছে সে সময় সাপ্তাহিক ছুটি ছিলো রবিবার। যতদূর মনে পড়ে সিভিল সার্জনের ছেলেমেয়ে বলে আমাদের টিকেট লাগতো না। সবসময় যে চাচা-চাচীকে বলে যেতাম, তা নয়। ফুফুর বাড়ি যাবার নাম করেও গিয়েছি। তখন হলিউডের খুব ভাল ভাল ছবি আসতো। আমরা বব হোপ, গ্রেগরী পেক, ডরিস ডে প্রমুখের ছবি দেখেছি। একটা ছবির নাম মনে আছে ‘প্যারিস হোয়েন ইট সিজলস্’।
বাড়িতে একটা ভয়ঙ্কর কুকুর ছিলো, মানে আমরা তাকে খুব ভয় পেতাম। কিন্তু আমাদের যমজ ছোট ভাইরা ভয় পেতো না। সানী নামের সেই সরাইল কুকুর একবার ভাইদের একজনকে কামড়ে দিয়েছিলো। দিনে সানীকে বেঁধে রাখলেও রাতে ছেড়ে দেওয়া হতো আর আমরা পারতঃপক্ষে বারান্দায় যেতাম না। কুমিল্লায় থাকার সময়ও বড় চাচার সফরসঙ্গী হয়েছি অনেকবার। আমরা ঝড়ের পর গ্রামাঞ্চলে গিয়েছিলাম। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তখন বুঝতাম না। আমরা বেড়াবার আনন্দই শুধু উপভোগ করেছি। চাচীর এক বান্ধবী ছিলেন প্রতীতি দত্ত, আমরা মাসীমা ডাকতাম। তিনি বাংলার একজন বিখ্যাত রাজনীতিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্রবধু। সেই ধীরেন দত্ত যিনি পাকিস্তান সংসদে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী তুলেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। অনেক পরে জেনেছি প্রতীতি মাসীমা বিখ্যাত ও প্রতিভাবান চিত্রনির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের যমজ বোন। খুবই  স্নেহ রবণ ছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি চলে গেলেন। আমাদের শৈশবের একটা মনে রাখার মত ঘটনার কথা বলি, যা আমাদের অনেক আনন্দ দিয়েছিলো এবং সেই সময় বলেই সেটা সম্ভব হয়েছিলো। একবার আমাকে আর আমার যমজ চাচাতো ভাই মিঠুল আর টুটুলকে একা ট্রেনে তুলে দেওয়া হলো ঢাকার উদ্দেশে যাত্রার জন্য। আমি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি আর ওরা দু’জন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। আমরা যথেষ্টই ছোট। মা-আব্বা ঢাকায় থাকতো। আব্বা স্টেশন থেকে আমাদের নিয়ে যাবে। এখন কোন মা-বাবা কিংবা অভিভাবক হয়তো সেটা ভাবতে পারবেন না। আমাদের তিনজনকে দেওয়া হয়েছিল পাঁচ টাকা। আমাদের কাছে সেটা অনেক টাকা। আমরা মনের আনন্দে সেদ্ধ ডিম, চানাচুওর ও আরো কিসব যেন খেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা মনে না থাকলেও সেই যাত্রার আনন্দ এখনো, এত বছর পরও মনে আছে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]