মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঢাকার বাড়ি
ঢাকায় আসার পর আমরা নানা জায়গায় থেকেছি। সেটা সদরঘাট থেকে তেজগাঁ পর্যন্ত বিস্তৃত। তখন তেজগাঁ কিন্তু খুব দূরের একটা জায়গা ছিলো, সেই তুলনায় সদরঘাটকে ততটা দূর ধরা হতো না। আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই পুরনো ঢাকায় থাকতেন। ইসলামপুরের কাজী বাড়ি, খাজে দেওয়ান, হোসেনী দালান, ফুলবাড়িয়া। আমার যতদূর মনে পড়ে বনানী-বারিধারা তো দূরের কথা, গুলশানের অভিজাত আবাসন এলাকা ছিলো না। আরো বেশ পরে গুলশান এলাকায় জঙ্গল ছিলো, সেখানে কেউ কেউ পিকনিক করতে যেতো।
আমাদের সদরঘাটের বাড়িটা খুব মজার ছিলো। কোন এক সময় সেটা কোন জমিদারের বাড়ি ছিলো। আমরা যখন থাকতে গেলাম, তখন সেখানে অনেক ছোট ছোট ফ্ল্যাটের মতো করে অনেকগুলো পরিবার থাকতো। আমাদের ভাগে পড়েছিলো ছাদের কয়েক ধাপ নিচের একটা বেশ বড় ঘর। চিলেকোঠাই বলা যায়। সঙ্গে ছোট্ট রান্নাঘর, বাথরুম। আর গোটা বিশাল ছাদটাও আমাদের ভাগেই ছিলো বলে আমার ধারণা। সেখানে আমি আর আমাদের ছোট কাজের ছেলেটা বিচরণ করতাম। তার কোলে থাকতো আমার পরের বোন তন্দ্রা বা তনু। সেখান থেকে বুড়িগঙ্গা দেখা যেতো। তবে সেই চিলেকোঠায় আসবাবপত্র তোলা হয়েছিল দড়ি দিয়ে বেঁধে ওপর থেকে টেনে। পুরনো সেই দালানের সিঁড়ি ছিলো অপ্রশ্বস্ত। আমাদের সেই বিশাল দালানের নিচে একটি শান্ত টিনের বাড়ি ছিলো। সেই বাড়ির মেয়ে শান্তি ছিলো আমার খেলার সাথী। সন্ধ্যায় আমি ছাদ দিয়ে উঁকি মেরে দেখতাম, শান্তির মা মাথায় আঁচল তুলে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালতেন। শাঁখ বাজতো। সেই সময়টার পরিবেশ খুব ভাল লাগতো। ছাদটা বিশাল হওয়ায় আমার ঘুড়ি ওড়ানোর খুব সুবিধা ছিলো। সংক্রান্তির দিন সেখানে অনেক ঘুড়ি কাটা পড়তো। আব্বা আমাকে দেব সাহিত্য কুটীরের ‘বিশ্ব পরিচয়’ নামের খুব মোটা বই কিনে দিয়েছিলো। সেটা পড়ে ইতিহাসের প্রতি প্রথম আগ্রহ জন্মায়।
এর পরের বাড়িটা ছিলো তেজগাঁর বেগুনবাড়িতে। চারিদিক বেশ ফাঁকা, মাঝে বেশ কিছু বাড়িঘর। পিছনে ক্ষেত, কিসের সেটা মনে নেই। তবে বর্ষায় সেখানে স্রোত বয়ে যেতো আর আমরা মহা আনন্দে ছুটোছুটি করতাম। আমাদের বাড়িটা ছিলো টিনের ছাদ, পাকা মেঝে আর যতদূও মনে পড়ে বেড়ার দেয়াল। উঠোন ছিলো। পাড়ায় সমবয়সী ছেলেমেয়ে থাকায় খেলাধূলা করতাম জমিয়ে। বাড়িগুলোর বেশীরভাগেরই একজন বাড়িওয়ালা। তিনিও সেখানে একটা বাড়িতে থাকতেন। তাঁর মেয়ে আমাদের চেয়ে বড় ছিলো, পড়ত কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুলে। তার সঙ্গে একবার স্কুলেও গিয়েছিলাম। তখন বড়দের স্কুল খুব কৌতূহল জাগাতো। বেগুনবাড়ির বাড়িটায় ঈদের স্মৃতি মনে পড়ে। তখন কিন্তু আমরা চাঁদ দেখতাম। দেখতে পেতাম। চাঁদ দেখা কমিটি ছিলো কিনা জানি না। আকাশে এক ফালি ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ আমরা উপভোগ করেছি। চাঁদ দেখে ছুটে বাড়ি গিয়ে দেখতাম মা ও অন্যরা উঠোনে বসে পেঁয়াজ, রসুন, আদা ইত্যাদি ছিলছে। ঈদের রান্নার প্রস্তুতি। তার পর মাকে ভাল বাসনপত্র বের করতে সাহায্য করতাম। আমার বোন তনু তখন একটি বালকের কোলে কোলে ঘুরতো। তার নাম ছিল কবির, তনুর মুখে কথা ফোটার পর তাকে সে ডাকতো ‘ইবির’। পাড়ার এক ভদ্রলোক আবার তন্দ্রা বা তনুকে ডাকতেন ‘তন্দুর’ বলে। বেচারা এত ছোট ছিলো যে, আপত্তি জানাতে পারত না। আমিও ছোট ছিলাম বলে তন্দুর কি বস্তু জানতাম না।
আমরা তেজগাঁয়ে থাকতাম, কারণ আব্বা তখন চাকরি করতো ফিল্ম ডেভলাপমেন্ট কর্পোরেশন বা এফডিসি’তে। বাড়ি থেকে বেশ কাছেই ছিলো আব্বার অফিস এবং স্টুডিও। আমরা প্রায়ই বিকালে সেখানে বেড়াতে যেতাম। ল্যাবের লোকজন বিভিন্ন ছবির দৃশ্য জুড়ে একটা রীল তৈরী করে রেখেছিলেন, আমাদের জন্য সেটা চালিয়ে দিতেন। সেখানে বাংলা, হিন্দি ও উর্দু ছবির দৃশ্য থাকতো। গান বা অন্য কোন দৃশ্য। ‘বহোত দিন হুয়ে’ নামের রূপকথা গোছের একটা ছবির দৃশ্য ছিল, এটুকু শুধু মনে আছে। সে সময় তৈরী অনেক ছবির শূটিং দেখেছি, যার মধ্যে ‘আসিয়া’, ‘যে নদী মরুপথে’, ‘তান্হা’ নামে একটা উর্দু ছবি। শেষোক্ত ছবির সেট বানানো হয়েছিলো খোলা জায়গায় কাঠের দোতলা টঙ’এর মত ঘর আর তার কাঠের সিঁড়ি। সেটা বেশ মনে আছে। একবার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী নূরজাহান, তাঁর অভিনেতা স্বামী এজাজ, জনপ্রিয় নায়িকা নীলো আর জনপ্রিয় নায়ক রতনকুমার এসেছিলেন। গুলিস্তানে শো ছিলো। এফডিসি’তে রিসেপশন ছিলো। আমাকে বলা হয়েছিলো নূরজাহানকে ফুলের তোড়া দিতে। তিনি আমাকে কোলে টেনে আদর করেছিলেন। তখন জানতাম না তিনি কে। এফডিসি’র প্রশাসনের সঙ্গে তখন নাজির আহমেদ, খায়রুল কবিরের মত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরা জড়িত ছিলেন। নাজির ভাইকে পরিণত বয়সে বিবিসি’তে পেয়োছলাম। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। যাঁরা সে সময় চিত্রনির্মাতা ছিলেন তাঁদের মধ্যে ফতেহ লোহানী, সালাহউদ্দিন, জহির রায়হান প্রমুখ ছিলেন। তখন এত ভাল ভাল ছবি তৈরী হয়েছে, যা বড় হয়ে দেখেছি। মাঝে মাঝে ভাবি, সেই আমলে যখন অনেক কিছুই ছিলো না, তখন যদি এত ভালো ছবি তৈরী হয়ে থাকে, তাহলে এখন কেন কালে-ভদ্রে অল্প কিছু ছবি ছাড়া ভাল ছবি হয় না।

ছবি: গুগল ও প্রাণের বাংলা। 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]