মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঢাকার বাড়ি  
পর্ব ২
তেজগাঁ থেকে আমরা চলে গেলাম অরফ্যানেজ রোডের একটা বাড়িতে। দোতলায় বড়িওয়ালার পরিবার থাকতো, সম্ভবতঃ নাম ছিলো রসুল সাহেব। এক তলায় একটা অংশে আমরা ভাড়া থাকতাম, অন্য অংশে এক তরুণ দম্পতি থাকতো। তাদের একটা ছোট বাচ্চা ছিলো। তারা মাঝে মাঝে রমনা পার্কে বেড়াতে গেলে আমাকে নিয়ে যেতো। অরফ্যানেজ রোডে থাকা নিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা এখানে বলি। বেঙ্গল থেকে প্রকাশিত আমার গ্রন্থ ‘আত্মকথনে সময় ও সৃজনকথা’র জন্য অর্থনীতিবিদ ও মার্ক্সীয় রাজনীতিক, যিনি ভারত সরকারের মূখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, রাজ্য সভার সদস্য এবং রাজ্যের এক সময়ের অর্থমন্ত্রী ছিলেন, সেই শ্রদ্ধেয় অশোক মিত্রের একটি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। ঘটনাটা তাঁর অসাধারন স্মৃতিশক্তি নিয়ে। ঢাকায় তাঁর বেড়ে ওঠার কথা বলতে গিয়ে তিনি এক পর্যায়ে বললেন, তাঁর বাবা অরফ্যানেজ রোডে বাড়ি করলে তাঁরা সেখানে উঠে যান। আমি মুখ ফস্কে বলে ফেললাম, ‘আমরাও এক সময় অরফ্যানেজ রোডে থাকতাম।’ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘কত নম্বর বাড়ি?’ আমার তো সেসব মনে নেই। অথচ ঢাকার আরমানিটোলার কোন্ গলির কত নম্বর বাড়ি কিংবা অরফ্যানেজ রোডের কত নম্বর বাড়ি, সব তাঁর পরিষ্কার মনে আছে। যাহোক, আমি ততদিনে আজিমপুর উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। হেঁটে স্কুলে যাই। একাই যাই। বই পড়ার নেশা ধরে গেছে। স্কুল থেকে ফিরে খেতে বসেও বই থাকে সঙ্গে। এই বাড়িটার কাছেই থাকতেন বিখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মুসা। তাঁকে চাচা ডাকতাম। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মায়ের খুব ঘনিষ্ঠতা ছিলো। তাঁর দুই মেয়ে রুমা-ঝুমা তখন বেশ ছোট। সবছোট বোন তখনো জন্মায়নি। ভাইটার কথাও ভাল করে মনে পড়ছে না। আর একজন থাকতেন হেনা খালাম্মা – হেনা কবির। তাঁদের বাড়িতে পাকিস্তান টীমের ক্রিকেটারদের খুব আসা-যাওয়া ছিলো। তাঁর বাড়ি খেলতে যেতাম, কিন্তু ক্রিকেটাররাও বেশ বড় একটা আকর্ষণ ছিলো।
অরফ্যানেজ রোড থেকে আমরা গেলাম গ্রীন রোডের ভূতের গলিতে। সে বাড়ির কথা আগেও লিখেছি। সেটাও ছিলো টিনের চাল আর বেড়ার দেয়াল। বারান্দা আর সামনে উঠোন ছিলো। তারপরে বেশ বড় খোলা জায়গা। আমরা সেখানে পিকনিকও করেছি। কাছেই ছিলো বাংলাদেশের আর এক বিখ্যাত ব্যক্তি মুনীর চৌধুরীদের বাড়ি। আমরা স্টেট বাস ধরে স্কুলে যেতাম। সেখানেও সময় খুব আনন্দে কেটেছে। ছায়ানটে আব্বা ভর্তি করে দিয়েছিলো। সেখানে গান শিখেছি সানজীদা খাতুন, জাহেদুর রহিম, সোহরাব হোসেন প্রমুখের কাছে। কিছুদিন পর একটি মেয়ে ভর্তি হলো, প্রথম দিনই তার গান শুনে আমরা মুগ্ধ হলাম। তার নাম ইফফাত আরা দেওয়ান। সে সময় একবার বলধা গার্ডেনে শরৎ উৎসব হলো ভোরে। দীঘিতে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে গান হলো ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে’। কেয়া পাতার বদলে কাগজের নৌকা। সেখানে ইফফাত গেয়েছিলো ‘তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে’। এখনো সেটা কানে লেগে আছে।
এই বাড়ি থেকে আমরা গেলাম আজিমপুর কলোনীর শেষ মাথায়, লালবাগের সীমান্তে। একটু দূরে ওয়েস্ট এন্ড স্কুল। সেখানে একটা গলি আছে বিষ্ণুচরণ দাস স্ট্রিট। বড়চাচা সেখানে বাড়ি করেছিলেন। একতলা হয়ে গিয়েছিলো। দোতলা হচ্ছিলো। আমরা সেই একতলায় কিছুদিন ছিলাম। সে বাড়িতে অনেক স্মৃতি, বিশেষ করে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতি,। সে কথা আর একদিন বলবো। ঐ বাড়ির পর তারই কাছে একটা ছোট বাড়িতে ছিলাম। পাশেই ছিলো একটা ডে কেয়ার সেন্টার। এই বাড়িটা থেকে আমরা খুলনা চলে গিয়েছিলাম, আমার এসএসসি পরীক্ষার টেস্ট দিয়ে। পরে এসে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। চাচার বাড়ি কাছে হওয়ায় প্রচুর সময় সেখানে ভাইবোনদের সঙ্গে কাটতো। আব্বা কাজে যাবার আগে একবার তার ‘বড়দা’কে না দেখে বেরোতে পারতো না। আর সেই বয়সে যেটা হয়, বন্ধুরাই ছিলো জীবন। অনেকেই কাছাকাছি আজিমপুর কলোনী, লালবাগে থাকতো। সেখানে থেকেও হেঁটে স্কুলে যেতাম। এগুলো ছিলো নিজেদের বাসা। এছাড়া আজিমপুর কলোনীর নানা ফ্ল্রাটে থেকেছি বড়মামার বাসায়। একবার তো পাশাপাশি দু’টি ফ্ল্যাটে বড় মামা আর বিলকিস ফুফুরা থাকতো। আজিমপুর কলোনীর মাঠে খেলেছি। কয়েতবেল, বাদাম ভাজা, পেয়ারা, হাওয়া মিঠাই কিনে খেয়েছি।
সব মিলিয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায়, বিভিন্ন বাড়িতে আমার শৈশব-কৈশোর ভালই কেটেছিলো।
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]