মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

শৈশবের খুলনায় আবার
এক.
ষাটের দশকেই ঢাকা ছাড়লাম। আব্বা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের ফরেস্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিলেন। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষার টেস্ট দিয়ে খুলনা গেলাম। পরে এসে পরীক্ষা দিয়ে আবার ফিরে গেলাম। তারপর সেখানে কেটে গেছে এক যুগ। খুলনার যাবার পথটা ছিলো সবচেয়ে সুন্দর। তখন রকেট নামে প্যাডেল স্টীমার চলতো ঢাকা ও খুলনার মধ্যে। দীর্ঘ হলেও সে যাত্রা খুব আনন্দময় ছিলো। কত গ্রাম, জনপদ, গঞ্জ পার হতে হতো। কত খাল-বিল-শাখানদী। বুড়িগঙ্গা দিয়ে যাত্রা শুরু করে রূপসা নদীতে তার সমাপ্তি। পথে মেঘনা ও মধুমতী। তখন রকেট ছাড়তো নারায়ণগঞ্জ থেকে। আমি তো চোখের পানিতে ভাসতে ভাসতে যাত্রা শুরু করি, কারণ এতদিনের প্রিয় শহর, বন্ধু-বান্ধব, চাচাতো ভাইবোন সবাইতে ছেড়ে যেতে হলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই মন ভাল হয়ে গেলো। পথে দু’টি বড় শহর পড়ে – চাঁদপুর ও বরিশাল। আমার নানাবাড়িও সেই পথেই। যাত্রাশেষে খুলনার রূপসা ঘাটে নামলাম। আব্বার কর্মস্থল থেকে একটি ছোট লঞ্চ এলো আমাদের নিয়ে যেতে। ব্যস্ত রূপসার পর ভৈরব নদীতে ঢুকে নিউজপ্রিন্টের ঘাট। ঘাটের সঙ্গেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা ছোট অফিস ছিলো। আব্বার সহকর্মীরা আম্মাকে অনুরোধ করলেন এক কাপ চা খেয়ে যেতে। আমরা নেমে বসলাম। আব্বা, আম্মা আমি আর আমার ছোট বোন তন্দ্রা ওরফে তনু। চা মুখে দিয়েই আম্মা আস্তে করে বললেন, ‘এরা কি চায়ে নুন দেয় নাকি?’ একজন শুনতে পেয়ে জানালেন মিলের পানি একটু নোনা। একটু নয়, তখন আমাদের কাছে খুবই নোন্তা লেগেছিলো। পরে সয়ে গিয়েছিলো। এক সময় এমন এলো যে, পানির এই নোন্তা ভাবটা আর টের পেতাম না।
সেখান থেকে বাসায় গেলাম। বাংলো ধরনের বাড়ি। বাড়ির নম্বর ১৯। সামনে কিছুটা জায়গা, নানা রকম ফুলগাছ লাগানো আর পেছনে অনেকটা, বলা যায় বিরাট উঠোন। সেখানে জামরুল, চালতাসহ অনেক রকম ফলের গাছ। বড় বড় গাছ থাকায় শান্ত, ¯িœগ্ধ একটা পরিবেশ ছিলো সেখানে। বাড়িগুলো কানাডীয়দের তৈরী। মিলটা তারাই বানিয়েছিলো। ভৈরব নদীর তীরে প্রচুর গাছপালা, সুইমিং পুল, ক্লাব আর ছিলো বাসস্থান। ওভাল শেপের পাকা রাস্তার দু’পাশে সিনিয়র কলোনীর বাংলোগুলো। সুইমিং পুলের উল্টোদিকে দোতলা ফ্ল্যাটবাড়ি, তার পাশে ও পেছনে আরো অনেক বাড়ি। দেয়ালের অন্য পাশে জুনিয়র কলোনী। পাশে হাসপাতাল। আরো খানিকটা গেলে মিল আর বেরোবার গেট। এলাকার নাম খালিশপুর। খুলনা শহর থেকে খানিকটা দূরে। বাসস্থানের মধ্যে খানিকটা বিভাজন ছিলো। সিনিয়র-জুনিয়র ভাগ ছিলো। কিন্তু আব্বা-আম্মার কারণে সেটা আমাদের মনে ঢোকেনি। আমরা সব জায়গায় গিয়েছি, সবার সঙ্গে মিশেছি। তবে কারো কারো মনে এই বিভেদ হয়ত থেকে গিয়েছিলো। (চলবে)

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]