মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ষাটের দশক খুলনা শহর

খুলনায় আমরা যেখানে থাকতাম, সেই খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল (কেএনএম) ছিল শহরতলী খালিশপুরে। সেখানে ভৈরব নদীর পাড়ে আমাদের মিল ছাড়াও পর পর সারি দিয়ে বেশ কিছু জুটমিল ছিলো। নদীর ওপাড়েও ছিলো স্টার জুট মিল। আমাদের মিলের ঠিক বাইরে ছিলো বিরাট বিহারী কলোনী। খালিশপুরে বেশ কিছু পেশাজীবী এবং অভিজাত মানুষের সুদৃশ্য বাড়িও ছিলো। একদিকে খুলনা, অন্যদিকে যশোরমুখী এগোলে দৌলতপুর, যেখানে ছিলো বিখ্যাত ব্রজলাল বা বিএল কলেজ। আর সেখানে থাকতেন খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক হাসান আজীজুল হক। খালিশপুর থেকে খুলনা শহর কিছুটা দূরে। আমরা রিক্সাতেই যেতাম। খালিশপুর ছাড়ালে বয়রা, সেখানে গার্লস কলেজ, পাবলিক লাইব্রেরী ছিলো। পার হতে হতো নন্দন কানন নামে সুন্দর একটা পার্ক যেখানে গাছ দিয়ে জীব জন্তুর মূর্তি বানানো ছিলো। নিউমার্কেটও ঐ পথেই পড়তো।  আমি কলেজে পড়তে নিয়মিত সেখানে লং প্লে রেকর্ড কিনতে যেতাম। সেখান থেকেই আব্বা আমার জীবনের প্রথম জামদানী শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন, যার দাম, যতদূর মনে পড়ে লেগেছিল পঞ্চাশ টাকা। খুলনা শহরে তখন তিনটা সিনেমা হল ছিলো – পিকচার প্যালেস, সোসাইটী আর উল্লাসিনী। প্রথমটার নাম নাকি অনেক আগে ছিলো নীলা, মায়ের মুখে শোনা। পিকচার প্যালেস আর সোসাইটী ছিলো কাছাকাছি, একটা পার্কের পাশেই, যার নাম স্বাধীনতার পর হয় শহীদ হাদিস পার্ক। আর শেষের সিনেমা হলটা রূপসা নদীর পাড়ে ছিলো। ঐ বয়সে যা হয়, সিনেমা দেখার খুব নেশা ছিলো। পরিবারের সঙ্গে তো দেখতামই। কলেজ পালিয়েও বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখেছি। খুলনা শহরে কিছু আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও বেশ কিছু প্রিয় মানুষ বাস করতো। সবচেয়ে প্রিয় ছিলো দীপা বন্দ্যোপাধ্যায়, বন্ধু ভাস্বরের দিদি। ওর দাদা ভার্গবদা আর ছোটভাই রমুসহ ওদের বাড়িতে প্রচুর আড্ডা হতো। আমার দুই বোন, তনু আর খুলনায় যার জন্ম, সেই সোমাসহ ওদের বাড়ি যেতাম। সেখান থেকে বইয়ের দোকানে, এখানে-ওখানে। দীপা দিদি অসাধারন ভাল গান করেন। পরে আমাদের কবি বন্ধু রফিক কায়সারের বাবা সদর হাসপাতালে যোগ দেবার পর আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির সময় একসঙ্গে খুলনা যেতাম। তখন আমি, ভাস্বর, রফিকসহ ম্যারাথন আড্ডা হতো – হয় ভাস্বরদের বাড়ি নয়তো আমাদের বাড়িতে। ছিলেন মুস্তাফিজ ভাই, সম্ভবতঃ কমার্স কলেজের শিক্ষক ছিলেন, তাঁর স্ত্রী পদ্ম আপা চমৎকার মানুষ ছিলেন। আব্বার সহকর্মী ও আমাদের পরিবারের খুব ভাল বন্ধু সামাদ চাচার শ্বশুড়বাড়িও ছিলো শহরে। তাঁর দুই শালী সাজেদা ও বাবলার সঙ্গেও খুব ভাব ছিলো। ওরা আমার অনুজপ্রতিম বন্ধু ছিলো। আমার সহপাঠিনী জ্যোৎ¯œাদের বাড়িও ছিলো খুলনা শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে। শহরেই ছিলো সন্দীপন নামের গানের স্কুল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। আমি আর তনুও গান শিখতে যেতাম। অসামান্য শিক্ষক ছিলেন সাধন সরকার। তাঁর হাতে বাংলাদেশের বেশ কিছু স্বনামধন্য শিল্পী তৈরী হয়েছিলো। আমার শৈশবের খুলনা শহর তখনো খুব বেশী পাল্টায়নি। পঞ্চবীথির মোড়টা সেরকমই ছিলো। খুব সুন্দর ছিলো খুলনা জেলা স্কুলের এলাকা। যাঁরা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ক্লাস সেভেনের মিঃ ব্লেক’ পড়েছেন, তাঁরা ঐ এলাকার কিছুটা বর্ণনাা পাবেন। শুনেছি এক সময় লেখকও খুলনা জেলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। কলেজে পড়ার সময় খুলনার পথে পথে কতবার মিছিল করেছি, কোন এলাকায় পূর্ব পাািকস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (এপসু), পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভায় যোগ দিতে গিয়েছি। রূপসা ঘাট, যেখানে রকেট এসে থামতো, সে এলাকাও খুব সুন্দর ছিলো। তখন রকেটে করে ঢাকা যাওয়া ছাড়া আরো কিছু উপায় ছিলো ঢাকা যাবার। ট্রেন থাকলেও তাতে খুব বেশী লোক যেতে বলে শুনিনি। আমরা কোচে যেতাম – পাঁচটা ফেরী পার হতে হতো। অথবা যশোর পর্যন্ত গাড়িতে গিয়ে প্লেনে ঢাকা যেতাম। সেভাবে ফিরলে আব্বা যশোর থেকে মিষ্টি কিনতেন। যশোরের মিষ্টি খুব ভালো ছিলো, তবে খুলনার মিষ্টিও ভাল ছিলো। রূপসা নদীর ধার ঘেঁষে বেশ কিছু অভিজাত বাড়িও ছিলো। সব মিলিয়ে খুলনা ছিলো ছিমছাম, ছায়া ঢাকা একটা চমৎকার শহর। অনেকদিন পর, যখন আমি বিলেতপ্রবাসী, বিবিসি’তে কর্মরত, তখন একবার এনজিও’দের ওপর সিরিজ অনুষ্ঠান করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের ছয়টি জেলায় ঘুুরেছিলাম, যার মধ্যে খুলনা অন্যতম। আমার সহকর্মী ও স্বামী সাগরকে তখন বেশ গর্ব করেই বলেছিলাম, ‘খুলনার সব আমি চিনি।’ কিন্তু যখন কোচ থেকে নামলাম, দেখলাম কিছুই চিনতে পারছি না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেককিছুই বদলে যায়। থেকে যায় শুধু মধুর স্মৃতি।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]