মনে পড়ে…

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

শামীম আজাদ

সেই ফাল্গুন।
সেবার ঈশিতা নেই। বিলেতে গেছে তার বাবাকে দেখাশোনা করতে আর আমি এসেছি বারো দিনের ছুটিতে একুশের বই মেলায়।

কত লেখক আর কবি বন্ধুদের যে দেখবো! এমন কি যারা বিদেশে থাকেন তারাও এখন দেশে। ফেরদৌস নাহার, হাসান আব্দুল্লাহ, কাজল ঘোষ, চন্দ্রিমা দত্ত, সাদ কামালী, লুৎফর রহমান রিটন… আমি আগেই আমার সিলভার ঢাকা-ফোন চার্জ দিয়ে রেখেছিলাম। পুরো দেশের ইনডেক্স এটা। আমার মুঠোতে ময়নামতি।

গাড়ি চলছে। আমি কাঁচের কেইজে নিরাপদ থেকে হাত উঁচু করা ঘেমো ট্রাফিক পুলিশ, নিতম্বিনী নারী, পট-বেলী পাইকার সবার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকি আর ফোন করি। জাহাঙ্গীর, অদিতী, সাইফুর, ফেরদৌস। পথের মানুষেরা ভ্রুঁকুচকে ‘কোথায় তোমায় যেন দেখেছি…’ভাবতে ভাবতেই তাদের পেরিয়ে নেক্সট টার্গেট করি। তপ্ত দুপুরে দেশী মানুষের বাগানে যার দিকে চাই তারেই লাগে ভাল। বিশাল বিশাল বিলবোর্ড তানা না না করে মিঞা কি টোরী বাজাতে থাকে।

বনানী চেয়ারম্যান বাড়ির পাকপাখালি রাস্তায় পড়ার পরেই রিটন ফোন ধরে আর আমি আটত্রিশ হয়ে যাই। রিটন…!!! কোথায় তোমার ফিটন? হা হা হা আপা আইসা গেছ! ওর চনমনে গলা টান মেরে আমাকে আশি-নব্বুইর বই মেলায় নিয়ে যায়। কি আড্ডা কি আড্ডা!

তখন বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলায় খাবার দোকান গুলো বসতো মূল মেলার পেছনে। কফি নেই, টিভির সরাসরি প্রচার নেই, লেখকদের বসার কোন জায়গা নেই, অস্থায়ী দোকানগুলো নির্মানে কোন নান্দনিকতা নেই। যেদিকে তাকাই শুধু মূলি বাঁশ। আমরা ভি সি আর থেকে সিডিতে ল্যান্ড করছি। স্টলে স্টলে ভাস্বর, প্রজ্ঞা, শিমুলের কন্ঠে রাহমান ভাই, রফিক ভাই। রেকুর কাঁধে ক্যামেরা। প্লাস্টিক পাতা খাবার দোকানে মাথার উপরের আমগাছ থেকে পোকা পড়ছে চটপটিতে, চিনিতে। সেবক বালক খোলা হাতে লালচে মিনি চা’য়ে ঝপাঝপ লেবু টুকরা ফেলে যাচ্ছে।

আমি, তসলিমা, রিটন, জাওয়াদ বেট ধরেছি এখন থেকে পনর মিনিট লাগাতার কথা বলে যাবো এক শব্দ ও ইংরাজি ব্যবহার না করে। থামলে, তোতলামো করলে,ইংরাজি বললে টেবিলে এক টাকা ফাইন! শেষে এ দিয়েই চটপটি, সিংগারা চা। শব্দজুয়া… প্রতিদিন। একজন উঠলে আরেকজন। আমার ফাইন হলেই বলতাম, ভাই রিটন কোথায় তোমার ফিটন! আমি ভাগবো। ক’বছর এই শব্দজুয়া চল হয়েছিল। টেবিলের চারদিকের দর্শক কবিও খেলুড়েও জুটে যেত লাগাতার। শুধু একজন ম্লান মুখে একটু দূরে বাঁশে হেলান দিয়ে হাসতো আর আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিত।

রুদ্র ওভাবে থাকলেও মোহন নিজেই ঘাসে কাপড় বিছিয়ে স্বৈরাচার নিয়ে কবিতার দোকান দিতো। তখন বাংলা একাডেমির মাঠে সত্যিকারের ঘাস ছিল, তারিক আর সানির কথায় আমাদের ম্যারাথন দৌড় ছিল। হেনা স্যারের তীব্র বাক্য ঘিরে আমুদে কৌতুক ছিল। আতিক ভাই আর সারোয়ার মুর্শেদের চলার ঋজুতা ছিল মেলার সর্বত্র।

-গুড, ঠিক চারটায় শহিদ সার্কেলে চলে আসবা। চ্যানেল আইর লাইভ কিন্তু! মানে সময় মত যেতে হবে। মেলা চলছে দশদিন। সে আমিরুলের প্রযোজনায় প্রতিদিন লাইভ করছে। এবার মেলায় আসছে আমার একজোড়া শিশু গল্প গ্রন্থ। একই থিমে একটা ইংরাজি আরেকটা বাংলা। বুগ্লী দা বার্গেন্ডী চিতা ও বুগ্লী নামের বেগুনী চিতা। ক্যানেডীয় আড়িয়াল পাবলিকেশন থেকে বেরিয়েছে। এর মোড়ক উন্মোচনের জন্য আলী ইমামকে ডেকেছি ঢাকা ক্লাবে, রিটনকেও ডাকলাম। – ঠিকাছে ঠিকাছে। কিন্তু কাল টাইম ঠিক রেখো…

আমি এগার তারিখ পারলাম না। বারো তারিখ ও না। সময় শেষ হলে পথের হাজার মানুষ সাঁতরে তবে হাজির হই। আন লাকি তেরো তারিখে রিটন দিল এক ঝাড়ি। আমি বলতেই পারলাম না এ বিলেতী বিবির মহা হাঁটা এমন কি মিনি ম্যরাথনের  অভিজ্ঞতাও এখানে ফেল। কোন কাজে আসছে না। শাড়ি হিলে সাজুগুঁজু করা মাত্রই গতি খেয়ে ফেলি। আর সেই আর্ট কলেজ থেকে গাড়ি ছেড়ে শুরু করি গুটি গুটি ‘কইন্যা হাঁটা’।

শিক্ষা দিক্ষা হবার পর প্রথম বসন্ত দিনে বাল্য বন্ধু শফি আর স্ত্রীর দেয়া এক জামদানি বাসন্তী শাড়ি, ঘটি হাতা টুকটুকে লাল ব্লাউস আর লাল রেশমি চূড়ি পরে বেলা দুইটা থেকে লাইন দিয়ে ঠিক ডুকে গেলাম একাডেমিতে। গত কয়েক বছর আমার কবিতা বই সবই আগামী প্রকাশনী থেকে বেরুচ্ছে। ভেতরে ঢুকেই দেখি উলটো দিকে সময় এ মিলন টুকটুকে লাল শার্ট পরে অটোগ্রাফ দিতে দিতে পেরেশান। আমি ও দিচ্ছি, তবে দু একটা। লোকের মাথা টপকে আমরা এপাড় ওপাড় চোখাচোখি করে শুভেচ্ছা বিনিময় করি। মাইকে শুনি নজরুল মঞ্চের মোড়ক উন্মচনের ডাক পড়ছে আসাদ ভাই, আনিসের। হঠাৎ ওসমান গনি মানে আগামীর স্বত্তাধিকারী পাশ থেকে কোন একটা টিভির সঙ্গে কথা শেষ করে মোবাইলে কথা বলে বলেন, আপা আপনাকে আর মিলন ভাইকে চ্যানেল আই ডাকছে। আপনারা একজন নাকি প্রেমের কবি আর একজন প্রেমের গল্প হা হা হা।

রিটন আমাদের দুজনকে আগেই ব্রিফ করলো। আমাদের চারদিকে বই হাতে মানুষ ঘিরে আছে ।

লাইট ক্যামেরা সাউন্ড! শুভ বসন্ত! কিন্তু আমরা কি আর রিটনের সঙ্গে পারি! আমাদের লাল পোশাক আর লেখার লালিমা নিয়ে সে এমন সব কথা বলতে লাগলো যে সবাই হাসতে লাগলো। সব চেয়ে জোরে শুনলাম মাযহারের শব্দ। মিলন শার্টের হাতা হাতাতে লাগলো আর আমি আমার নিজের মুখস্ত কবিতা ভুলে বেকুবের মত আমার এই বাসন্তী শাড়ি যে আমার ছেলে বেলার বন্ধু দিয়েছে তা বলতে শুরু করলাম।
বিরাট বনিক সফি ছিল তার নোয়াখালির ইটখোলায়। আমাকে টিভিতে দেখেই ঢাকা থেকে আমাদের বন্ধু শাহজাহানের টেলিফোনে পড়ি মরি দৌড়ে এসে টিভির সামনে এসে দেখেছে। ততক্ষনে ক্যামেরা আমার ওপরে আর নেই।

মিলন আর আমি আমাদের দোকানে ফিরতেই সফির ফোন, আরে শামীম তুঁই দেই আঁর শাড়ি হিনছো! -হিনছি তয় কি অইছে তুঁই খুশি অও ন?
– অইছি। কিন্তু আজাদ ভাই রাগ কইত্ত নো?
-না কইত্তনো হা হা হা ।

ঠিক সে সময়ই হাতে গাঁদা, কানে জবা, চুলে চাঁপা নিয়ে দুই জোড়া যুবক-যুবতী হেঁটে গেল। কারা যেন পেছন থেকে কু…উ কু…উ করে ডেকে উঠালো।

স্মৃতিচিত্র বই মেলা (৩)
১৩।২।১৪
লন্ডন

ছবি: লেখক