মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

কিস্সা খানি বাজার

 

ঊর্মি রহমান

পশ্চিম পাকিস্তান সফর
এক.
আমাকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে চেনে, তারা হয়ত এই শিরোনাম দেখে ভ্রু কোঁচকাবে।কিন্তু পাকিস্তানের প্রতি আমার বিরাগ এত তীব্র যে আমি পাকিস্তানের কোন পণ্য কিনি না, ব্যবহার করি না। বিলেতে থাকতে দেখেছি অন্যরা কিনছে, কিন্তু আমি কখনও কিনিনি। আমি সচেতনভাবে পাকিস্তানের সমস্ত কিছু পরিহার করি। একবার এমিরেটস’এর ফ্লাইটে লন্ডন থেকে ঢাকা যাবার সময় আমাদের প্লেন করাচী হয়ে ঢাকা গিয়েছিলো। আগে জানতাম না। পাকিস্তানের মাটি ছুঁতে হলো বলে ট্রাভেল এজেন্টের ওপর খুব বিরক্ত হয়েছিলাম এবং লন্ডন ফিরে তাকে বকেও ছিলাম। কিন্তু আজ আমি যে সফরের কথা বলতে বসেছি, সেটা সেই সময়ের কথা, যখন আমরাও পাকিস্তানী ছিলাম অর্থাৎ বাংলাদেশ হবার আগের কথা। সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেম, আমার ফুফাতো ভাই, আমাদের পরিবারের সবার প্রিয় হাশেম ভাইর পোস্টিং ছিলো রাওয়ালপিন্ডিতে। ও তখন পাকিস্তান কাউন্সিলের প্রধান ছিলো। হাশেমভাই তার ছোটমামা, মানে আমার আব্বা, যার সঙ্গে সে যমজ ভাইয়ের মত বড় হয়েছে (দু’জনেই শৈশবে মাতৃহারা হয়ে আমার দাদুর কাছে মানুষ হয়েছে), তাকে বললো, আমাকে তার কাছে বেড়াতে পাঠাতে। সেটা ১৯৭০ সাল। আমি গেলাম। প্রথম একা প্লেনে চড়ে কোথাও যাওয়া। এখন মনে হয়, ভাগ্যিস গিয়েছিলাম, নাহলে বেশ কিছু ঐতিহাসিক জায়গা দেখার সুযোগ পেতাম না। তক্ষশীলা, খাইবার পাস, পেশোয়ারের কিস্সাখানি বাজার ইত্যাদি। হাশেমভাই ব্যস্ত থাকতো কাজে। একবার ওর বন্ধু বাতেন ভাই যাচ্ছিলেন তক্ষশীলা, আমি তাঁর সঙ্গে চলে গেলাম। সেটা রাওয়ালপিন্ডি জেলাতেই, পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেই সময় অত্যন্ত বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো আর এখন সেটা উল্লেখযোগ্য প্রতœতাত্বিক নিদর্শন। তক্ষশীলা মৌর্য ও কুশান শাসন আমল পযন্ত কার্যকর ছিলো। এটা গান্ধারা রাজত্বে অবস্থিত। প্রায় ২৭০০ বছর আগের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৪টির বেশী বিষয়ে শিক্ষাদান করা হতো। আমাকে সবসময়ই প্রাচীন ঐতিহ্য টানে। ফলে সেটা আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে। রাওয়ালপিন্ডিতে সোগরা ফুফুও থাকতেন, আব্বার মামাতো বোন। হাশেম ভাই ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে ঘুরে, আড্ডায়

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়

বেশ সময় কাটছিলো। এর মধ্যে আব্বার এক সহপাঠী পেশোয়ার থেকে ফোন করে বললেন পেশোয়ারে তাঁর কাছে বেড়াতে যেতে। তিনি আব্বার সঙ্গে দেরাদূন ফরেস্ট ইহ্নটিটিউটে পড়তেন আর তখন পেশোয়ারে ফরেস্ট ইন্সটিটিউটের একজন পরিচালক। হাশেমভাই আমাকে একটি ট্রেনে তুলে দিলো, সেই প্রথম ট্রেনের চেয়ার কারেও চড়া। আব্বার বন্ধু ভদ্রলোক আমাকে নামিয়ে নেবেন, কিন্তু আমরা কেউই কাউকে চিনি না, কখনও দেখিনি। হাশেমভাই তাঁকে বললো, ওই ট্রেন থেকে শাড়ি পরা মেয়ে আর কেউ নামবে বলে মনে হয় না। বলাবাহুল্য কিছু বয়স্ক পাকিস্তানী মহিলা শাড়ি পরলেও কম বয়সীরা পরে না। ঠিকই দেখা গেলো ওই ভদ্রলোক আমাকে চিনে বের করে তাঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন। তাঁর দুই মেয়ের সঙ্গে

কিস্সা কাহিনী বাজার

আলাপ হলো। ওরা ইংরেজি বলে, কিন্তু তাঁর স্ত্রী বলেন না। পাঞ্জাবী, পশতু ছাড়া উর্দু বলেন। আমি তার কোনটাই পারি না। মেয়েরা দোভাষীর কাজ করলো। প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো আমি ভাত খাই না রুটি খাই। ভাত বলাতে তিনি মাথা নেড়ে চলে গেলেন। তারপর রোজই পোলাও রান্না করতে লাগলেন। আমাকে বলতে হলো, পোলাও নয়, সেদ্ধ ভাত চাই। তিনি একগাল হেসে বললেন, ‘ও, উব্লা চাওল?’ তারপর থেকে অবশ্য ভাত পেয়েছিলাম। কিন্তু চা খাওয়াটাও ঝামেলার ছিলো। ওরা পাঞ্জাবী চা বানায়, যেখানে পানির কোন ব্যাপার নেই, দুধের মধ্যে চা পাতা দিয়ে সেটা বানানো হয়। তবে সেটা নিয়ে আপত্তি না করে সত্যিকার অথে সেইর্ ‘দুধ-চা’ খেয়ে নিলাম। তবে সেই চাচা ও তাঁর মেয়েরা আমাকে অনেক ঘুরিয়েছিলো। প্রথমে তো পেশোয়ারের বিখ্যাত কিস্সাখানি বাজার দেখলাম। এই বাজার খুব বিখ্যাত। মূলতঃ প্রাচীনকালে এখানে বণিকরা পণ্য বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে গল্পও বলতেন। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশরা সেখানে এক হত্যাকা- চালায়। বর্তমানের পাঠকদের জন্য আর একটি বিষয় মনে রাখার মত হতে পারে, সেটা হলো, এই এলাকায় ভারতের বিখ্যাত অভিনেতা দিলীপকুমার আর রাজকাপুর জন্মেছেন। শাহরুখ খানের বাড়িও সেখানেই এবং তাঁর পরিবারের কিছু সদস্য এখনো সেখানে থাকেন। তবে আমার ভালো লেগেছিলো বাজারের প্রাচীন চেহারার কিছুটা তখনও ছিলো আর এটা খুব জমজমাট বাজার। পেশোয়ারে আব্বার বন্ধু ও তাঁর কন্যারা আমাকে আরো অনেক জায়গা ঘুরিয়েছিলেন। সে সব গল্প আগামীতে বলবো।

ছবি:গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments