মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

খুলনায় ফেরা

ডিসেম্বরের যুদ্ধে আমরা আতঙ্কের চেয়ে উত্তেজনা বেশী অনুভব করেছি। এদিকে পাকিস্তানীরা হেলিকপ্টারে করে ঢাকা শহরের বুকে বোমা ফেলাতে অনেক বাড়িঘর ধ্বংস হয়। সেখান থেকে আমাদের বেশ কিছু আত্মীয় চাচার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। বাড়িভর্তি মানুষ। কাজের লোক নেই। আমরাই সব করছি। কিছুদিন আগে পানির অভাব দেখা দিলে একটা টিউবওয়েল বসানো হয়েছিলো উঠোনে। প্রতিদিন আমি, পিউ আর হয়তো অন্য কেউ সেখানে বাসন ধুতাম। এভাবে চলছিলো। চোদ্দ তারিখ সেই আকাশ যুদ্ধ তীব্রতর হলো। বোমার আওয়াজের মধ্যে হঠাৎ শোনা গেলো একটা বিড়ালের বাচ্চার কুঁই কুঁই কান্না। খুঁজেপেতে খাটের তলায় তাকে পাওয়া গেল – ছোট্ট কালো কুচকুচে একটা বিড়ালের বাচ্চা। সমস্ত গায়ে একটাও অন্য রঙের লোম ছিলো না – ঠিক যেন একটা ক্ষুদে ব্ল্যাক প্যান্থার। চোখ দু’টো সবুজ আর সোনালীর মিশেল। সবার একটু মন খারাপ হলো এই জনপ্রিয় ধারণা থেকে যে, কালো বিড়াল দেখা অশুভ। মা তা-ও ওকে দুধ খেতে দিলো। দু’দিন ও খাটের তলা আর ঐ ঘর থেকে বেরোলো না। আর দু’দিন পরই দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো। তখন সেই বিড়ালের বাচ্চার আদর আর কে দেখে! নাম রাখা হলো নিশি। আব্বাকে ফিরে গিয়ে কাজে যোগ দিতে হলো। আব্বা একটা বার্জে চড়ে নদীপথে খুলনা ফিরে গেলো। একটা ব্যাগে কয়েকটা ফুটো করে নিশিকে তার মধ্যে ভরে সঙ্গে নিয়ে গেলো। আব্বা বলে গেলো পরে এসে আমাদের নিয়ে যাবে।

দেশ স্বাধীন হলো, আমরা আমাদের বহু-আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতা পেলাম। প্রথম মুক্তিযেদ্ধা ভাইদের খবর এলো ওদের সঙ্গীদের মারফত, তারপর একে একে ওরা এলো। আমাদের মনে আনন্দ আর ধরে না। আব্বা এলো আমাদের নিতে। আমরা দীর্ঘদিন পর আবার খুলনার পথে যাত্রা করলাম। এবার সড়ক পথে। সেই সময় ঢাকা থেকে খুলনা যেতে পাঁচটা বড়-ছোট নদী পার হতে হতো। এখন তো বেশীরভাগ জায়গায় সেতু হয়ে গেছে। প্রথমটা ছিলো আরিচা ঘাট থেকে যমুনা নদী পার হওয়া, গিয়ে পড়তাম পদ্মায়, আমাদের দেশ ফরিদপুরের ঘাটে। যতদূর মনে পড়ে সেটা ছিলো গোয়ালন্দ কিম্বা নগরকান্দা ঘাট। সেটা ঠিকই ছিলো। তার পরেরগুলোর অধিকাংশ সেতু ভাঙ্গা – হয় পাকসেনা অথবা মুক্তিযোদ্ধারা ভেঙ্গেছে। সেখানে সাময়িক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ছোট ছোট অস্থায়ী ফেরী। কোনোটা আবার দু’টো নৌকার মাঝে পাটাতন বসিয়ে তার ওপর গাড়িগুলো তুলে পারাপার করা হচ্ছিলো। একটাতে আবার দড়ি টেনে টেনে নৌকাকে এপাড় থেকে ওপাড়ে নেওয়া হচ্ছিলো। আমরা অবশ্য তাতে বেশ মজাই পাচ্ছিলাম। যাহোক, খুলনা পৌঁছলাম। বাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো অনেকদিন। পরিষ্কার করে গুছিয়ে নিয়ে আমাদের সংসারযাত্রা আবার শুরু হলো। অনেক দুঃসংবাদও শুনতে হলো। অনেক পরিচিত মানুষ পাকসেনাদের হাতে শহীদ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মায়ের এক পাতানো ভাই ও তাঁর পরিবারের কিছু সদস্য আর আমাদের এক সহপাঠিনীর স্বামীও ছিলেন। জেনেছিলাম, আমাদের দেয়ালের পিছনে নেভাল বেস’এ তাঁদের মত অনেককে নৌকা থেকে নামিয়ে গুলী করে হত্যা করা হয়।
খুলনায় কিছু মিত্রবাহিনীর সেনারা থাকায় তাঁদের মনোরঞ্জনের জন্য নানা রকম বিনোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছিলো। অস্থায়ীভাবে পর্দা টাঙিয়ে সিনেমা দেখানো হতো। সে বছরই মুক্তি পাওয়া ছবি হৃষিকেশ মুকোপাধ্যায়ের ‘আনন্দ’ দেখলাম। নিউজপ্রিন্ট মিলের মিলনায়তনে তাঁদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিলো, সেখানে তিনবোন এসেছিলেন কৃষ্ণা, রুমকি ও ঝুমকি। কৃষ্ণা গান গেয়েছিলেন আর বালিকা রুমকি-ঝুমকি নেচেছিলো। অনেক পরে কৃষ্ণাকে অভিনেত্রী রাণী মুখার্জ্জির মা হিসেবে চিনেছিলাম আর সম্ভবত: রুমকি কিংবা ঝুমকি দেবশ্রী রায় নামে অভিনেত্রী-বিধায়ক হন। ঢাকা থেকে বন্ধু আজমিরী বা মীরু চিঠি লিখলো, ঢাকায় বম্বে থেকে অভিনেতা দম্পতি সুনীল দত্ত ও নার্গিস এসেছিলেন। ওর সঙ্গে নিউ মার্কেটে দেখা হয়েছিলো। ও লিখেছিলো, “সুনীল দত্ত যা হ্যান্ডসাম না, তোকে কি বলবো! আমি তে তাঁকে দেখেই ফিট!” ওর কথা বলার ধরন ছিলো এরকমই। একাত্তর ছিলো আমাদের জন্য দুঃখ ও আনন্দের মিশেলে একটি স্মরণীয় বছর।
এদিকে কলেজও শুরু হলো। আমরা ১৯৭১ সালের অনার্সের ব্যাচ। কিন্তু সে বছর পরীক্ষা দেওয়া তো দূরের থাক, আমরা স্কুল-কলেজেও যাইনি। সুতরাং অনার্স পরীক্ষায় বসতে বসতে ১৯৭২ সাল হয়ে গেলো। ততদিনে দেশের অনেক মানুষ শুধু দেশটাকে নয়, নিজেদেরও স্বাধীন বলে মনে করতে শুরু করেছে। চতুর্দিকে দেদার নকল হচ্ছে। আমরা পরীক্ষা দিতে যখন বসলাম, সেখানেও তাই হলো। কেউ কেউ রীতিমত বই খুলে লিখতে শুরু করেছিলো। স্যার-আপারা অসহায়ের মত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। হঠাৎ বাংলার একজন স্যার, যিনি আমাকে খুব ¯েœহ করতেন, তিনি একটা বই এনে আমার সামনে ধপ করে রেখে বললেন, ‘তুমিও বই দেখে লেখো। ওদের অনেকে তোমার চেয়ে খারাপ ছাত্রী হয়েও তোমার চেয়ে ভালো রেজাল্ট করবে, সেটা সহ্য করা যায় না।” আমি বিব্রত হয়ে বলেছিলাম, “স্যার, আমি যা লিখতে পারছি, বই দেখলে সেটাও পারবো না।” এভাবেই আমাদের অনার্স পরীক্ষা শেষ হলো আর সেই সঙ্গে আমার খুলনায় স্থায়ীবাসেরও অবসান ঘটতে চললো।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments