মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি

আগেই বলেছি আমাদের হোস্টেল ছিলো রেজিস্ট্রার বিল্ডিং’এর পাহাড়ের পাদদেশে। ঐ পাহাড়ের ওপরই রেজিস্ট্রার বিল্ডিং’এর পাশে একটি ক্যান্টিনের মত ছিলো। সেখানে হ্যাংগিং বারান্দার মত ছিলো। সন্ধ্যার সময় কাবাব ও পরোটা ভাজা হতো। আমরাা ছাদ বসে আড্ডাসহযোগে সেগুলো খেতে যেতাম। ঐ পাহাড় থেকে একটা চমৎকার সিঁড়ি নেমে গেছে অন্য পাশে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল আছে। তার সামনের রাস্তা বেয়েই আমরা ক্লাসে যেতাম। রিক্সা ছিলো। যতদূর মনে পড়ে বাসও ছিলো। কিন্তু আমরা দল বেঁধে হেঁটেই যেতাম। বর্ষাকালে একটু অসুবিধা হতো, তখন হয়ত রিক্সা নিতে হতো। আমাদের আর্টস ফ্যাকাল্টির পিছনেই পাহাড়। বেশী বৃষ্টি হলে সেখান থেকে ঢল নামতো। বারান্দায় ¯্রােত বয়ে যেতো। আমরা অনেকে স্পঞ্জের স্যা-েল পরে ক্লাস করতে যেতাম। ক্লাস খুব ভাল লাগতো, স্যাররা এত ভাল পড়াতেন! মনে আছে আনিসুজ্জামান স্যার বিদ্যাসাগরের ওপর ক্লাস শেষ করে সেই শ্রেণীকক্ষেই অন্য একটি ক্লাস নিতেন, যে বিষয়টা আমার ছিলো না, কিন্তু আমি ও আমার মত আরো কয়েকজন বসেই থাকতাম শুধু স্যারের লেকচার শোনার জন্য। মনে আছে ভূঁইয়া ইকবাল ভাই একবার বলেছিলেন, ‘তোমরা সূঁই হারালেও আনিস স্যারকে বলো কেন?’ আমি বলেছিলাম, ‘আপনারা কেউই আমাদের কথা মন দিয়ে শুনে সমস্যার সমাধান করেন না, কিন্তু স্যার করেন, তাই।’ স্যার ক্যাম্পাসের ভেতরেই থাকতেন। আমি মাঝে মাঝে যেতাম তাঁর বাড়িতে।

ভাল লাগতো ভাবীর ¯েœহময় সাহচর্য্য, ছোট্ট দুই কন্যা রুচি ও শুচির সঙ্গে সময় কাটাতে। আনন্দ তখনো হয়নি কিংবা খুবই ছোট ছিলো। আমাদের বিভাগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রিহার্সালও হতো স্যারের বাড়িতে। বন্ধু অনীশ ছিলো আমাদের গানের দলের মুখ্য গায়ক, হার্মোনিয়ম ওর দখলেই থাকতো। আমি গেলে কখনো কখনো স্যার আর ভাবী দু’জনেই বলতেন থেকে যেতে। ইতস্ততঃ করতাম, যেহেতু হাউজ টিউটরকে বলে আসিনি। স্যার অভয় দিয়ে বলতেন, তিনি জানিয়ে দেবেন। হায়াত মামুদ স্যার শহরে থাকতেন। তাঁর বাড়িও গিয়েছি কয়েকবার। একবার স্যার যেতে বললেন একটা কাজে। যাবার পর বললেন, আমি তাঁর কিছু কবিতার ডিকটেশন নিতে পারবো কিনা। আমি তো এক কথায় রাজী। তিনি এত ¯েœহ করতেন যে, তাঁর কোনো কাজ করে দেয়াটা ভাগ্য বলে মনে হতো। পরে সেই কবিতাগুলো তাঁর ‘দূষিত প্ররোচনা’ নামের কবিতাগ্রন্থে স্থান পায় আর ভূমিকায় স্যার আমার সেই সামান্য কাজটুকুর জন্য ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে এত কথা লিখেছিলেন যে, আমি লজ্জাই পেয়েছিলাম। হায়াত স্যরের ক্লাসও খুব প্রিয় ছিলো আমাদের। একদিন মনে পড়ে, স্যার ক্লাসে আসার পরই আমরা দূরাগত বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেলাম। পাহাড়ী বৃষ্টি কাছে আসার আগেই তার শব্দ শোনা যায়। হায়াত স্যার বললেন, ‘এসব কাব্য কি পড়ানো যায়? আমি কবিতা পড়ি, তোমরা শোনো।’ আমরা স্যারের আবুত্তি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনেছিলাম। পরে হায়াত স্যার মস্কো চলে গেলে তাঁর জায়গায় এলেন হেনা স্যার – আবু হেনা মুস্তাফা কামাল। আর একজন অসাধারন শিক্ষক। মনে হতো স্যার অভিধান খুঁজে শব্দচয়ন করে কথা বলছেন, কিন্তু সেটা ছিলো তাঁর সহজাত। হেনা স্যার খুব ভাল গান গাইতেন আর গান গাইতে ভাল বাসতেন।

মাঝে মাঝে আমরা ধরলে স্যার গান শোনাতেন। অনেক পরে আমি যখন লন্ডনে বিবিসি’তে কাজ করি, তখন সেখানে স্যারের লেখা, সুর দেওয়া ও গাওয়া একটি গান খুঁজে পেয়েছিলাম। তখন স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমি সেই গানটি একটি ক্যাসেটে ভরে স্যারের পুত্র পীনুকে পাঠিয়েছিলাম। কারণ সেটার মূল্য আমাদের কাছে যা, ভাবী ও ছেলেমেয়েদের কাছে তার চেয়ে অনেক বেশী। পীনু জানিয়েছিলো, সেটা পেয়ে তারা সবাই খুব খুশি হয়েছিলো। বলেছিলো, সেটার মূল্য সত্যি ওদের কাছে অনেক বড় ছিলো। হায়াত স্যারের ¯েœহের ছায়া থেকে এখনো বঞ্চিত হইনি। আজ এত বছরেও সে সম্পর্ক অটুট আছে, শুধু স্যার নন, তাঁর পুরো পরিবারের সঙ্গেই। আর আনিস স্যার পরবর্তী জীবনে আমার খুব দুঃসময়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে স¯েœহে আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিলেন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে। শিক্ষকদের কাছে ছাত্রী হিসেবে যেমন অনেক পেয়েছি, সেরকম জীবনের পরবর্তী পর্যায়েও সহায়তা ও পথনির্দেশ পেয়েছি, যা আমার জীবনকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments