মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

চট্টগ্রামে অন্য জীবন

হোস্টেলে যাবার আগে চট্টগ্রাম শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে যাতায়াত করতাম। যতদূর মনে পড়ে শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দূরত্ব ছিলো কুড়ি মাইল। বাসে নারীর সমানাধিকার ছিলো, অর্থাৎ তারা কোনো সুবিধা পেতো না। কেউ তাদের জন্য আসন ছেড়ে দিতো না। ফলে আমাদেরও ছেলেদের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হতো। একদিন আমি দরজার কাছে হাতল ধরে এই পথ পাড়ি দিয়েছিলাম আর আমার হাতের তালুতে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছিলো। কিন্তু এ নিয়ে আমরা কখনো কোনো প্রতিবাদ করিনি। এ প্রসঙ্গে পরবর্তী জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। যখন দৈনিক সংবাদে চাকরি করি, তখন কাজ শেষে আমরা কয়েকজন সহকর্মী নবাবপুর রোড দিয়ে হেঁটে গুলিস্তানে গিয়ে বাস ধরতাম। আমি থাকতাম তেজগাঁ এয়ারফোর্স অফিসারস্ মেসের ভেতরে আমাদের পারিবারিক বন্ধু এয়ার ভাইস মার্শাল এম কে বাশারের বাড়ি। আমার সহকর্মীরা সহজে বাসে উঠতে পারতো না, আমি ঠিক উঠে যেতাম।

একদিন সহকর্মী মন্টুদা (মোজাম্মেল হোসেন) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমরা বাসে উঠতে পারি না। আপনি কি করে উঠে যান?’ বলেছিলাম, ‘এটা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত।’ যাহোক, ক্লাস আর আড্ডা চলছিলো, ছুটির দিন শহরে চলে যেতাম। কখনো ব্যাচমেট লুসির বাড়ি তো কখনো সহপাঠিনী অমিতার বাড়ি। অমিতার মা আমাকে রান্নাঘরে তাঁর মেয়ের পাশে আসন পেতে বসিয়ে খুব যত্ন করে খাওয়াতেন। হায়াত স্যারের শ্যালিকা রুনুদের বাড়িও একবার গিয়ে রাত কাটিয়ে এসেছিলাম। মোমেনভাইদের বাড়ি তো অহরহ যেতাম। সেখানেও খালাম্মা খুব আদর করে খাওয়াতেন। মোমেন ভাই আর মনসুর ভাই খুব বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের কাছে স স্নেহ প্রশ্রয় পেয়েছি।

মনসুর ভাই ও তাঁর স্ত্রী নাজলী লায়লা মনসুরের সঙ্গে এখনো বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট আছে। চট্টগ্রামে অনেকের ধারণা ছিলো আমি মোমেন ভাইদের সম্পর্কীয়া বোন হই। তবে তাঁদের বাবা শ্রদ্ধেয় আবুল ফজলকে একটু ভয়ও পেতাম। তিনি তখন আমাদের উপাচার্য। এক সময় আমাদের ব্যাচের ছেলেরা পরীক্ষা পিছানোর জন্য আন্দোলন করছিলো। আমাকে দেখলেই উপাচার্য জানতে চাইতেন, ‘তোমরা পরীক্ষা দেবে না?’ এক ছুটির দিন দুপুরে তাঁদের বাড়িতে খেতে বসে একটি আইটেম দেখলাম ঝোলের মধ্যে ছোট ছোট চিংড়ি। আমি সেটা পাতে নেবার পর টের পেলাম সেটা চিংড়ির শুঁটকি। আমি শুঁটকি খাই না। কিন্তু মোমেন ভাইদের বাবা টেবিলে থাকায় ভয়ে বলতে পারিনি শুঁটকি খাই না আর ফেলেও দিতে পারিনি। জীবনে ঐ একদিনই শুঁটকি খেয়েছিলাম। ক্যাম্পাসে লেখাপড়া ও আড্ডা তো ছিলোই, এ ছাড়া ছিলো শহরে নানা কারণে যাওয়া। বন্ধুদের কেউ কেউ তখন সবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছেন, মনসুর ভাই ছাড়াও আব্দুল মান্নান, শেখ জহির প্রমুখ ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে নানা আড্ডা ও বেড়ানো ছিলো। তবে সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালেয় বা সংক্ষেপে চবি’র অর্থনীতি বিভাগের প্রধান সদ্য যুক্তরাষ্ট্র ফেরত ড. মুহাম্মদ ইউনুস ক্যাম্পাস সংলগ্ন গ্রামে নানা রকম কাজ শুরু করেন, যার অনুপ্রেরণায় পরবর্তীতে গ্রামীণ ব্যাঙ্ক তৈরী হয়। তিনি ছাত্রদের ও গ্রামবাসীকে নিয়ে ক্ষেতে নেমে ইরি ধান বুনতেন। ছাত্রীদের নিয়ে গ্রামে ঘরে ঘরে হাঁস-মুরগীকে ইঞ্জেকশন দেওয়া ও বয়স্ক শিক্ষার অভিযান চালাতেন। সেই দলে আমিও ছিলাম। বেশ আনন্দেই কাটছিলো আমাদের সময়। ঢাকায় ফিল্ম সোসাইটী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। চট্টগ্রামেও ছিলো চিটাগাং ফিল্ম সোসাইটী বা চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র সংসদ। বন্ধুদের সবাই ছিলো। শো থাকলেই শহরে চলে যেতাম। কত ভাল ভাল ছবি যে তখন দেখেছি, বলে বোঝাতে পারবো না। মনে আছে, যেদিন ব্যাটলশিপ পোটেমকিন দেখানো হলো, সেদিন দর্শকদের জায়গা দেওয়া যাচ্ছিলো না। অবশেষে আসন শেষ হয়ে গেলে সবাই মাঝখানের ধাপে, মেঝেতে বসে পড়লো কিংবা পিছনে দেয়ালে হেলান দিয়ে ছবি দেখেছিলো। সেসব দিনের আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। এখনো মনে পড়লে বুঝতে পারি কত সুন্দর সময় কেটেছিলো।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments