মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখস্মৃতি

চবির বর্তমান ডাইনিং হল

আমাদের সেশনের কথাও একটু বলা দরকার। আমরা ১৯৭১ সালের অনার্সের ব্যাচ। মুক্তিযুদ্ধের কারণে সে বছর আমার মত অসংখ্য ছেলেমেয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বর্জন করেছিলো। তাই আমাদের অনার্স পরীক্ষা হতে হতে ১৯৭২ শেষ হয়ে গেলো আর আমরা এমএ পড়তে গেলাম ১৯৭৩ সালে, পরীক্ষা দিয়ে বেরোলাম ১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে। সেটা গোটা দেশের ছাত্র-ছাত্রীর ভাগ্যেই ঘটেছিলো। যাহোক, আবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কথায় আসি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই ছিলো আলাওল দীঘি, কবি আলাওলের নামের সেই দীঘির কথা মনে পড়লো অন্য একটি প্রসঙ্গে। হলের অনেক কথার মধ্যে সেখানকার খাবারের কথা বাদ পড়ে গেছে। খাবার কেমন ছিলো সেটা না বললেও অনেকে অনুমান করতে পারবেন, কারণ অধিকাংশ হলের খাবারই প্রায় একরকম। আমাদের ডালের বাটির নাম আমরা দিয়েছিলাম আলাওলের দীঘি। তাতে ডাল কম, পানিই বেশী থাকতো। বাকী খাবারও প্রায় সেরকম। অধিকাংশ দিন আমরা পেতাম পোয়া মাছ, কালে ভদ্রে রুই আর কপাল খুব ভাল থাকলে ইলিশ।

আমি বাড়িতে থাকতে রুই মাছ ছুঁতাম না, কিন্তু হলে যেদিন রুই দিতো, সেদিন মনে হতো সেটা ফীস্টের কাছাকাছি, আর ইলিশ দিলে পুরো ফীস্ট! আমি মাছের মাথা খেতে খুব ভালবাসি। তাই যেদিন ইলিশ রান্না হতো, সেদিন আগেই রান্নাঘরে গিয়ে খালা/মাসীদের বলে রাখতাম, খাবার সময় যেন আমাকে ইলিশের মাথা দেওয়া হয় আর সঙ্গীদের বলতাম, ‘তোরা খেয়ে উঠে যা, আমি পরে আসছি।’ তারপর আয়েশ করে মাছের মাথা খেয়ে রুমে যেতাম। তবে সত্যিকার ফীস্টও হতো, সেদিন গোশ্ত থাকতো। হলের প্রভোস্ট ছাড়াও অন্য শিক্ষকদের কেউ কেউ আসতেন। আর হলের খাবারের করুণ দশার কারণে ছুটির দিন শহরে বন্ধুদের বাড়ির আকর্ষণ বড় হয়ে দেখা দিতো। আমাদের এমএ ক্লাসের পিকনিকে আমরা এক রাতের জন্য কক্সবাজার গিয়েছিলাম। সঙ্গে আনিসুজ্জমান স্যার, হেনা স্যার, সদ্য যোগ দেওয়া এবং সদ্য বিবাহিত স্যার আবুল কালাম মঞ্জুর মোর্শেদ। তিনি সস্ত্রীক গিয়েছিলেন। আমরা মেয়েরা স্যার ও ভাবীকে একটা গোটা ঘর ছেড়ে দিয়ে গাদাগাদি করে অন্য ঘরগুলোতে থেকেছিলাম। পিকনিকের নিয়ম অনুযায়ী ছেলেরাই রান্না করেছিলো। খুব আনন্দ করেছিলাম সমুদ্র তীরবর্তী চমৎকার শহর কক্সবাজারে।


চট্টগ্রাম শহরে আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে বেড়াতাম ছুটির দিনে – কখনো কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, চন্দ্রঘোনা কিংবা নিদেন পক্ষে পাতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। পতেঙ্গায় তখন কোনো দোকান পাট ছিলো না, এত ভীড়ভাট্টা ছিলো না। সৈকতও খানিকটা ভাঙ্গা চোরা ছিলো। কিন্তু আমাদের খুব পছন্দের জায়গা ছিলো সেটা। একটা ঘাসে ঢাকা পথ ছিলো, দু’পাশে বাবলা গাছের সারি। আমাদের বেড়ানোর দলটা মোটামুটি বড় ছিলো। মোমেন ভাই, মান্নান ভাই, (শেখ) জহির ভাই, শহীদ ভাই, অমিতদা (চন্দ), আলতাফ ভাই, তপনজ্যোতি বড়ুয়া, দিবাকর বড়ুয়া আর আমি। সে যেন অনেকগুলো ভাই চম্পার একটি বোন। কখনো কখনো মনসুর ভাইও থাকতেন আর আশীষ’দা (চৌধুরী) দলে জুটে গেলে বৌদি আমাদের জন্য লুচি-তরকারী বেঁধে দিতেন। বেড়ানোর জন্য সারদিন সময় না পেলে আমরা ওয়ার সিমেট্রিতে গিয়ে চুপ করে বসে থাকতাম। বড় সুন্দর শান্ত সমাধিক্ষেত্র সেটি। উইপিং উইলো গাছ শোকাহত ভঙ্গীতে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। মান্নান ভাই অমিত’দা কিংবা দিবাকর বড়ুয়াকে বলতেন, ‘মরার পর তো তোমাদের সঙ্গে আমাদের আর দেখা হবে না। কারণ স্বর্গ বা বেহেশত কিংবা নরক বা দোজখ হোক, সে তো আলাদা জায়গা।’ হাসি-আনন্দে বড় মধুর সময় কেটেছিলো।

তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেক ভাল ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত সন্ত্রাসও যেমন ছিলো না, পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলবাদীদের যে দাপট দেখা গিয়েছিলো, সেটাও ছিলো না। কিন্তু সব ভাল জিনিসই এক সময় শেষ হয়। তাই আমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনও শেষ হলো। পরীক্ষা হয়ে গেলো। বন্ধুদের সঙ্গে বিচ্ছেদের বেদনা মেনে নিয়ে এক সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়তে হলো। অনেক বন্ধুর সঙ্গেই স্থায়ী বিচ্ছেদ হলো। তাদের কারো কারো সঙ্গে আর দেখাই হয়নি। দু’জন বন্ধু স্বপ্না আর অণিমার সঙ্গে প্রায় ৩৭ বছর পর কলকাতায় দেখা হলো। সেটাও ফেসবুকের কল্যাণে। একদিন ফেসবুকে দেখি অনামিকা নামে একটি মেয়ে লিখেছে, তার মা ও মায়ের বন্ধু এক মাসী তাদের বন্ধুকে খুঁজছে, যার নাম ঊর্মি রহমান আর তিনি লেখালিখি করতেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছিলাম, আমিই সে। তারপর প্রথম ফোনে, তারপর স্থায়ী বসতির উদ্দেশ্যে কলকাতায় এলে অনামিকার মা অণিমা আর স্বপ্নার সঙ্গে সাক্ষাত হলে কী যে আনন্দ হয়েছিলো সেটা বলে বোঝানো যাবে না। চট্গ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আমার হৃদয়ে ভালবাসার স্থায়ী আসন পেতে রয়েছে।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments