মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

সুন্দরবনে..

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

‘ঐ দ্যাখ, ওটাকে বলে মদনটাক। জলচর পাখি।’ বেশ বড়। সারসের মত খানিকটা দেখতে। আমার তখন আব্বার কাছে প্রকৃতির পাঠ নেওয়া চলছে। লঞ্চের ডেক’এ দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য্য দেখছি। ছলাৎ ছলাৎ করে নদীর পানি এসে ধাক্কা মারছে লঞ্চের গায়ে। নিস্তব্ধ চরাচর। আমরা সুন্দরবনে।
লঞ্চের গায়ে খট করে কি লাগলো। ছুটে ডেক’এ গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, পানির ওপর দিয়ে শুধুধূসর-সাদা কি দেখা গেলো। আব্বা বললো, ‘ওটা হাঙর ছিলো। তুই যা দেখলি, সেটা ওর ফিন্।’
আর একবার একঝাঁক চিত্রল হরিণকে ডাঙা দিয়ে ছুটে যেতে দেখলাম।একটা সাপকে একবার গাছে লতিয়ে ঝুলে থাকতে দেখলাম। নদীর পানির সামান্য নিচের স্তরে এঁকেবেঁকে যেতেও দেখেছি একটা সাপকে। নদীতে কত রকমের মাছ। রেখা, চিত্রা, রুচা, জেলী ফিশ, নাম না জানা আরো অনেক মাছ।
আর কতশত বিচিত্র নামের নদী। শৈশবে এবং তারুণ্যে, এই দুই সময় সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ থেকে নদীর সঙ্গে আমার ভালবাসার জন্ম। কত শত নদী আর তাদের কি বিচিত্র সব নাম – আউড়া শিপসা, জাফা, হংসরাজ, আড় পাঙ্গাশিয়া, মালঞ্চ, যমুনা, বুড়ি গোয়ালিনী, রায়মঙ্গল, পশুর। সেই গভীর বনে কে যে এসব নাম রেখেছিলো কে জানে।
কোন্ বয়স থেকে স্মৃতি মনে গেঁথে যায়, আমি জানি না।আমার মনে হয় আমার আড়াই বছর বয়সের স্মৃতির কথা আমি বলতে পারি। তখন আমরা সুন্দরবনে হাউজবোটে থাকি। আব্বা গভর্ণমেন্ট ফরেস্টের রেঞ্জ অফিসার। দেরাদূন ফরেস্ট ইন্সটিটিউট থেকে পাশ করে ডুয়ার্সের নাগরাকাট, গয়েরকাটা ইত্যাদি এলাকায় কাজ করেন। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসে এদিকের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে কাজ করতে থাকেন। তখন আমি হাউজবোটের জানালা দিয়ে চামচ, ছুরি, কাঁটা নদীতে ফেলে দিতাম। এটা আম্মার কাছে শোনা। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি সে ছবি দেখতে পাই আর ভাবি অত কম বয়সের স্মৃতি আমার মনে আছে।
বড় হয়ে আবার সুন্দরবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হলো। তখন আমরা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলে থাকি। যাদের সাহায্যে সে সময় পাকিস্তানের একমাত্র নিউজপ্রিন্ট মিলটি তৈরী, সেই কানাডীয়ানরা চলে যাবার পর আব্বা সেখানকার প্রথম বাঙালি ফরেস্ট ম্যানেজার। আব্বাকে মাসে এক বা একাধিকবার সুন্দরবন যেতে হতো। আমি সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি। ছুটি হলে আমিও চলে যেতাম। হয়ত সঙ্গে থাকতো ঢাকা থেকে আসা কোন অতিথি। তখনই সুন্দরবনে একদিন এক বৃদ্ধ মাঝি দেখা করতে এলেন। আমি ছোট থাকতে আব্বা যখন সুন্দরবনে থাকতো, তখন তাঁদের পরিচয়। আমাকে দেখে বললেন, ‘স্যার, আপনার অন্য মেয়েটা কোথায়?’ তখন জানলাম, আমার চাচাতো বোন পিউ ছোটবেলায় সুন্দরবনের সেই হাউজবোটে আমাদের সঙ্গে এসে কিছুদিন ছিলো। বৃদ্ধ মাঝি ভেবেছেন, আমরা যমজ। পিউ যখন এসে ছিলো, তখন আমার বয়স আড়াই বছর আর পিউর তিন। এটা ভাবলে অবাক লাগে অত ছোট বাচ্চাকে তখন দেওর-জায়ের কাছে ছেড়ে দিতে দ্বিধা করেননি চাচা-চাচী, তার ওপর জায়গাটা শহুরর কোন এলাকা নয়, গভীর বন। আজকালকার দিনে সেটা সম্ভব কিনা জানি না। বড় হয়ে আমি আর পিউ আলোচনা করেছি কেন অত ছোট বয়সে ও আমাদের সঙ্গে চলে এসেছিলো! আমি বলেছিলাম, ‘আমরা চলে যাবার সময় নিশ্চয়ই তুই কান্না জুড়ে দিয়েছিলি।’ ও মেনে নেয় যে সেটাই হবে হয়তো।
শৈশবে সুন্দরবনের নামের মাহাত্ম্য বুঝিনি। বড় হয়ে বুঝেছি। সুন্দরবনের সৌন্দর্য্য বর্ণনা করলেও পুরোটা বোঝানো যায় না। নিজের চোখে দেখতে হয়। কত রকম গাছ – কেওড়া, গেউয়া, সুন্দরী, গোলপাতা। লম্বা লম্বা পাতার গাছের নাম কে গোলপাতা রেখেছিলো, জানি না। গোটা বনে গাছের সারির মাথাগুলো সমান। মনে হবে কাঁটা মেহেদীর বেড়ার মত কেউ একটা কাঁচি দিয়ে মাথাগুলো যেন সমান করেছেঁটে রেখেছে। নদীর দু’পাশের বন যেন কোন শাড়ির পাড়। রাতে আকাশ ভরা তারার মেলায় সেই শাড়িকেই মনে হয় চুমকি বসানো বাহারী শাড়ি। এত নিস্তব্ধ থাকে রাতগুলো – গা ছমছম করা নির্জনতা নয়। কেমন যেন শান্ত সমাহিত রূপ। সুন্দরী গাছের নিচে যতদূর জোয়ারের পানি ওঠে, সেখানে কোন পাতা জন্মায় না। সেটাও মনে হয় কেউ যত্ন করে ছেঁটে দিয়েছে। এসব গাছের ফাঁকে গোড়ায় মাটিতে রয়েছে শূলা বা ব্রিদিং রুটস। মাটি ফুড়ে নিঃশ্বাস, আসলে অক্সিজেন নেবার জন্য মাথা তুলে দিয়েছে সেসব শিকড়।
আজ এত বছর পর আমার মনে হয়, আমার সৌভাগ্য আমি সুন্দরবনকে এত কাছ থেকে দেখেছিলাম। আজ তাই যখন শুনি সুন্দরবনের ওপর আঘাত আসতে চলেছে, তখন প্রাণ কেঁদে ওঠে।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]