মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

কর্মজীবনে পদার্পণ

লেখাপড়া শেষ। আগেই ভেবে রেখেিেছলাম, চাকরি করবো। কিন্তু কি করবো ভাবিনি। লেখালিখি করতাম বেশ অল্পবয়স থেকে। নানা পত্রিকায় গল্প ছাপা হবার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রে কিছু ফিচারও ছাপা হয়েছে। আমার ফুফাতো ভাই সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেমের কাছে গেলাম একদিন। গল্পে-আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম। হাশেমভাই বললো, ‘এবার কি করবি, ভেবেছিস কিছু?’ বললাম, ‘চাকরি করতে চাই। কিন্তু কোথায় কিভাবে চাকরি খুঁজবো ভাবিনি।’ হাশেমভাই বললো, ‘সাংবাদিকতা করবি?’ সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, সেটা তো বেশ হয়! বললাম, ‘পেলে করতে পারি।’ হাশেমভাই ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিংবদন্তিতুল্য সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরীর কাছে পাঠালো। হাশেমভাইর সব বন্ধুরাই আব্বা অর্থাৎ হাশেমভাইর ‘ছোটমামা’কে চিনতেন। জহুর হোসেন চৌধুরীর

সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি সামান্য অসুস্থ ছিলেন। তাঁর শয্যাপাশে দেখা করার সুযোগ ঘটলো। তিনি বললেন, ‘দৈনিক বাংলায় চাকরি করবে?’ আমি বললাম, ‘ওরা মেয়েদের নেবে না।’ সেখানে আমার কিছু যাওয়া-আসা থাকায় এই ধারণা হয়েছিলো, যদিও সেখানে তখন হাসিনা আশরাফ ও কণিকা মাহফুজ কাজ করছিলেন। জহুরভাই ধমক দিয়ে বললেন, ‘সেটা তোমার দেখার দরকার নেই।’ তারপর একটু ভেবে বললেন, ‘দৈনিক সংবাদ’এ করবে?’ মাথা নেড়ে সায় দেবার পর তিনি সেই সময়ের নির্বাহী সম্পাদক বজলুর রহমানকে একটি চিঠি লিখে বললেন, দেখা করতে। জহুরভাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে দৈনিক সংবাদ’এ গিয়ে বজলুর রহমানের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি সাক্ষাৎকার নেবার নামে একটি কথাই শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘রাতের পালায় কাজ করতে পারবে?’ বললাম, ‘পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করলে পারবো।’ আমার চাকরি হয়ে গেলো।

জহুর হোসেন চৌধুরী

আমাকে ডেস্কে সাব এডিটর হিসেবে যোগ দিতে বলা হলো। ডিউটির সময় সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা। যেদিন জয়েন করতে গেলাম সেদিন আমাকে লম্বা ডেস্কে আরো কয়েকজনের সঙ্গে বসতে বলা হলো। তারপর টেলিপ্রিন্টারে আসা একটি খবর অনুবাদ করতে বলা হলো। কাজটা তত কঠিন মনে হয়নি। কারণ আব্বার কল্যাণে প্রচুর বাংলা ও ইংরেজি বই পড়ার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। তবে সংবাদপত্রের ভাষাটা শিখতে হয়েছে। সহকর্মীদের অনেকে খুব সাহায্য করেছেন। সহকর্মী হিসেবে একটি মেয়েকেও পেলাম, রওশন আরা জলি। পরে রেফারেন্স বিভাগ থেকে নাসিমুন নাহার নিনি এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এছাড়া ছিলেন মনোজ বড়–য়া, স্বপন দত্ত, বাসুদেব ধর, আতাউর রহমান। শিফট-ইন-চার্জ ছিলেন মোজাম্মেল হোসেন মন্টু, কাজী আনোয়ার, আরো একজন, যাঁর নাম এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না। মনে রাখতে হবে সময়টা ১৯৭৪ সাল, আজ থেকে চার দশকের বেশী সময় আগের কথা। বার্তা সম্পাদক ছিলেন আর একজন বিখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত, যাঁর কাছে অপার  স্নেহ পেয়েছি। আর একজনের স্নেহধন্য হবার সৌভাগ্য অর্জন করি, তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় রণেশ দাশগুপ্ত। তিনি সম্পাদকীয় বিভাগে ছিলেন।

দৈনিক সংবাদ তখন বংশাল রোডে একতলা একটি বাড়িতে ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদ অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়, পাঠকদের সবারই প্রায় সেটা জানা। মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিলো না। এমনকি শৌচালয়ও তেমন ভালো ছিলো না। কিন্তু বিষয়টা মেয়েদের জন্য চ্যালেঞ্জের মতো ছিলো আর আমরা আনন্দেই কাজ করেছি। অধিকাংশ সহকর্মীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। অফিসে আসা-যাওয়ায় সমস্যা হতো কিছুটা। নবাবপুর রোড একমুখী থাকাতে গুলিস্তান থেকে আসার সময় হেঁটে আসতে হতো। আমি ততদিনে থাকতে শুরু করেছি পারিবারিক বন্ধু এয়ার ভাইস মার্শাল এমকে বাশারের তেজগাঁ এয়ার ফোর্স অফিসারস্ মেসে তাঁর বাসভবনে। তাঁকে ডাকতাম ছোট ভাইজান। তাঁর স্ত্রী, দুই কন্যা ও শিশু পুত্রের সঙ্গে সময়টা ভালো কেটেছিলো। তাঁদের প্রসঙ্গ পরে লিখছি। তেজগাঁ থেকে বংশাল রোড, দূরত্ব নেহায়েত কম নয়। সেখান থেকে বাস বা রিক্সায় এসে গুলিস্তানে নেমে হেঁটে যেতাম অফিসে। কিন্তু সব ব্যাপারটাই ছিলো উৎসাহ ও আনন্দের। মনে রাখতে হবে, সে সময় ঢাকায় এত বীভৎস ট্রাফিক জ্যাম ছিলো না। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা ছিলো। সেজন্য ব্যাপারটা সময়সাপেক্ষ হলেও বিরক্তিকর ছিলো না।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box