মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

স্মৃতিতে সংবাদ

সংবাদে কাজ করার স্মৃতি মধুর ছিলো। সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা এবং কাজ শেখার অদম্য ইচ্ছ; কারণ ততদিনে ঠিক করে ফেলেছি সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে নেবো। আমরা ডেস্কে তিনটি মেয়ে ছিলাম – আমি, নিনি ও জলি। রিপোর্টিং’এ ছিলেন বেবী আপা , বেবী মওদুদ। সেই সময় নারী সাংবাদিক হিসেবে সংবাদে আমরাই দলে ভারী ছিলাম। গোটা দেশে তখন আমরা সম্ভবতঃ সাত কি আটজন নারীসাংবাদিক ছিলাম। মনে পড়ে তার বেশ কিছুদিন পরে, কলকাতা থেকে বিখ্যাত সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ ঢাকা এসে আমাদের কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নেন। তিনি আমাদের দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তখন কলকাতায় সাংবাদিকতায় কোন নারী নেই। কিছুদিন আগে এক টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে শুনলাম তরুণ সাংবাদিকরা অভিযোগ করছেন, তাঁদের কেন ‘নারী সাংবাদিক’ বলা হবে।

আমরা সত্তরের দশকে যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন কিন্তু আমাদের কেউ নারী সাংবাদিক বলতো না, শুধু সাংবাদিকই বলতো। আজকাল সংবাদপত্র-সাময়িকী-টেলিভিশন-রেডিও’তে প্রচুর মেয়ে কাজ করে, যা দেখে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু তাঁদের অনেকের মুখেই শুনেছি, তাঁরা পুরুষ সহকর্মী বা উর্ধ্বতন কর্ত্তৃপক্ষের হেনস্থার শিকার হন, যার মধ্যে যৌন হেনস্থাও আছে। অথচ আমরা সে ব্যাপারে খুব ভাগ্যবান বলতে হবে। সেরকম কিছুরই মুখোমুখি আমরা হইনি। সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছি, কাজ শেখার সুযোগ পেয়েছি। তবে কোন কোন পুরুষ সহকর্মী মেয়েদের সাংবাদিকতায় আসাটা পছন্দ করেননি। তাঁরা অন্যভাবে সেটা প্রকাশ করেছেন। যেমন আমি যখন নতুন ঢুকেছি, তখনো তেমন কিছু শিখে উঠতে পারিনি, সেই সময় একজন শিফট-ইন-চার্জ এমন সব বিষয় আমাকে করতে দিতেন, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান ছিলো খুবই সীমিত। কিন্তু সহকর্মীদের সাহায্যে সে বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি। এরই সূত্রে আর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়।

সন্তোষ গুপ্ত

আগেই বলেছি, প্রথমদিকে আমার শিফট্ ছিলো সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা। প্রতিদিন কাজে এসে দেখতাম, বার্তা সম্পাদক সন্তোষ গুপ্ত বসে মন দিয়ে কাজ করছেন। সেটা নিয়ে ভাবিনি। একদিন আলোকচিত্রী রশিদ তালুকদার ঢুকে বললেন, ‘কি ব্যাপার দাদা (তিনি কখনো ঠাট্টা করে দাদাকে দদ্রæ বলতেন), আজকাল সাত সকালে আসছেন!’ সন্তোষদা খুব বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার অনেক কাজ থাকে, তোমার তাতে কি অসুবিধা হয়েছে?’ পরে এক সহকর্মী বললেন, যাতে আমারকে কেউ অসুবিধায় না ফেলে বা কোন কথা না শোনায়, সেজন্য দাদা সক্কালবেলা এসে পাহারা দিতেন। দাদা কখনো একথা স্বীকার করেননি, কিন্তু আমার মনে এই ঘটনা গভীর রেখাপাত করে। আজও সেকথা ভাবলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তার বহু বছর পর, আমি লন্ডনে থাকতে একদিন জার্মানী থেকে একটি মেয়ের ফোন পেলাম, সে বললো, ‘পিসি, আমার নাম অদিতি।’ বললাম, ‘তুমি কি সন্তোষ’দার মেয়ে?’ ও একটু অবাক হয়ে বললো, ‘কি করে বুঝলেন?’ বললাম, ‘আমাকে পিসি ডাকলে আর নাম বললে অদিতি…।’ আমি কথা শেষ করার আগেই ও বললো, ‘আমার নাম আপনি রেখেছিলেন। মা বলেছে।’ খুব ভাল লেগেছিলো। ততদিনে সন্তোষদা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সুদূর অতীত থেকে তাঁর ¯েœহস্পর্শ সেদিন সেই দূরভাষ যন্ত্রে পেয়েছিলাম। দাদার কাছ থেকে যে আন্তরিকতা আর ¯েœহ পেয়েছিলাম, সেসব ভোলা যায় না।

সন্তোষদা খুব সিগারেট খেতেন। এটা নিয়ে তাঁর সঙ্গে তর্ক হতো। কথা শুনতেন না। আমি যখন সংবাদ ছেড়ে দিই, তখন দাদাকে বলেছিলাম, ‘আপনার সঙ্গে আমার বাইরে তো দেখা হবেই, একই পেশায় আছি যখন। আমার সামনে আপনি সেগারেট খাবেন না।’ উনি রাজী হয়ে গিয়েছিলেন। এর বেশ পরে, তখন আমি সাপ্তাহিক হলিডে’তে কাজ করি। কখনো কখনো কোন সাংবাদিক সম্মেলনে দেখা হয়ে যেতো। দেখলেই ছদ্মরাগে বলে উঠতেন, ‘তুমি আবার আইছো কেন?’ কিন্তু তিনি শর্ত ভাঙ্গেননি। আমার সামনে সিগারেট খেতেন না। আমার জীবনে এরকম কিছু মানুষের দেখা পেয়েছিলাম, যাঁরা আজ আর নেই। কিন্তু তাঁদের অভাব জীবনের এই সায়াহ্নে এসে খুব অনুভব করি।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box