মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

আমাদের রণেশ’দা

সংবাদে কাজ করার সূত্রেই আমার সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত। শুধূ সেজন্যই নয়, সেখানে কাজ শিখেছি, বয়োজ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের স্নেহ এবং সমবয়সী সহকর্মীদের বন্ধুত্বপূর্ণ সাহচর্য্য পেয়েছি। এই পত্রিকার সূত্রেই অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। কাছে থেকে দেখতে পেয়েছি রণেশ’দা, রণেশ দাশগুপ্তের মত মানুষকে। আমার দেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন রণেশ’দা। সব মিলিয়ে এখনো দৈনিক সংবাদের প্রতি আলাদা রকমের পক্ষপাতিত্ব ও ভালবাসা রয়ে গেছে আমার মনে। আজ এত বছর পরও যখন সংবাদের আমাদের সময়ের কারো সঙ্গে দেখা হয়, তখন মনেই হয়না মাঝখানে এতগুলো বছর পার করে দিয়েছি আমরা। কয়েক বছর আগে যখন ঢাকা গেলাম, তখন স্নেহভাজন পারভীন সুলতানা ঝুমা জানালো, সংবাদের সাংবাদিকদের একটা পুনর্মিলন গোছের কিছু একটা হচ্ছে। নিনি এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। আমাকে যেতে হবে। আমি সানন্দে রাজী হয়ে গেলাম। মাঝখানে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। বয়সও বেড়েছে। সবাইকে একবারে চিনতেও পারিনি। বাসুদেব’দা এসে পরিচয় দিলেন।

একটু লজ্জা পেলাম একবারে চিনতে পারিনি বলে, কিন্তু সেটা ছাপিয়ে গেল ভাল লাগায়। মনোজ’দা আর আতাউর ভাই দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করতেন, তখন আমি লন্ডন থেকে নিয়মিত

রণেশ দাশগুপ্ত

লিখতাম। দেশে ফিরলে তাঁদের সঙ্গেও দেখা হতো। স্মৃতি রোমন্থন পরে আরো করা যাবে। এখন সেসব রেখে রণেশ’দার কথা বলি। রণেশ’দা বসতেন সম্পাদকীয় বিভাগে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা ও আলাপ। তাঁকে দেখামাত্র গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এসেছিলো। কিন্তু তাঁর ব্যবহার ছিলো সহজ ও আন্তরিক। তাঁর কাছে বসে গল্প করতে পেরেছি নানা বিষয়ে। একদিন তিনি আমাকে একটা সেমিনারে যেতে ও সেটা কভার করতে বললেন। আমি বললাম, ‘আমি তো কখনো এ ধরণের কিছু করিনি।’ আমি যেতে ও সেমিনার শুনতে পারি, কিন্তু সেটা রিপোর্ট আকারে কিভাবে সাজাবো, সেটা তো জানতাম না। তিনি একটু হেসে বললেন, ‘তুমি লিখে আমাকে দেখিও।’ সেভাবে প্রথম তাঁর উৎসাহে রিপোর্টিং শিখলাম। কিন্তু যখনই সুযোগ পেয়েছি, তাঁকে রিপোর্ট বা ফিচার দেখিয়ে নিতাম। রণেশ’দাকে কখনো বিরক্ত হননি। যত্ন নিয়েই দেখাতেন এবং কিভাবে লিখলে আরো ভাল হবে, সেটা দেখিয়ে দিতেন। এরপর প্রচুর ফিচার করেছি শুধু সংবাদের জন্যই। রণেশ’দাকে সবাই ভালবাসতো, কর্ত্তৃপক্ষের যেসব মানুষকে বাকী সাংবাদিক ও কর্মীরা পছন্দ করতেন না, তাঁরাও তাঁকে উপেক্ষা করতে পারতো না। সংবাদের তখন বেতন ছিলো যৎসামান্য আর সেটা দেবার কথা সাত তারিখ হলেও প্রায়শঃই সে তারিখ পেরিয়ে যেতো। আমরাও তখন বেশ জঙ্গী হয়ে উঠতাম।

একবার অ্যাকাউন্টস বিভাগ থেকে বলে পাঠালো, যারা খুব ‘নীডি’, সেদিন শুধু তাদের বেতন দেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে জবাব গেল, ‘নীডি’ না হলে সেখানে কেউ কাজ করতে আসতো না। আর একবার বলা হলো, সেদিন শুধু মেয়েদের বেতন দেওয়া হবে। আমরা মেয়েরা সে প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলাম। ঈদের বোনাসের ক্ষেত্রেও একই রকমের টাল-বাহানা হতো। একবার সবাই রেগে গিয়ে সংবাদের উঠোনে সভা করলো। অনেকেই বক্তব্য রাখলো। কিন্তু শেষে রণেশ’দা যখন বলতে শুরু করলেন, ঠিক তখনি মালিকের গাড়ি ঢুকলো পত্রিকা অফিসের উঠোনে। এরপর আর কিছু বলার প্রয়োজন হয়নি। সেদিনই আমাদের বোনাস ঘোষণা করা হয়। রণেশ’দা রাজনীতির মানুষ ছিলেন, কিন্তু মৃদুভাষী ছিলেন। নরমভাবে কথা বলতেন। তাঁকে ভাল না বেসে পারা যেতো না। এরপর দেশের রাজনীতিতে অনেক টালমাটাল অবস্থা হলো। দেশে এক দলীয় শাসন প্রবর্তিত হলো, সব কাগজ বন্ধ হয়ে গেলো, আমরা রাতারাতি বেকার হয়ে পড়লাম। পরে কাগজ আবার চালু হলো। আমরা সবাই না হলেও অনেকে সংবাদে ফেরত গেলাম। কিন্তু রণেশ’দা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন। তিনি কলকাতা চলে গেলেন। সেখানেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটালেন। আমি যখন পরে বৈবাহিক সূত্রে কলকাতা থাকতে এলাম. তখন জানলাম আমাদের এক বন্ধুর বাড়ির কাছেই তিনি থাকতেন। কিন্তু ততদিনে রণেশ’দা চিরতরে হারিয়ে গেছেন। তাঁর মত মানুষ আমি খুব কম, কিংবা বলা যায় দেখিনিও। তিনি বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিতে পারতেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে কত তরুণ, কত মানুষ সমৃদ্ধ হতে পারতো। কিন্তু দূর্ভাগ্য আমাদের, আমাদের দেশের যে তাঁকে আমরা হারালাম। তিনি পুরোপুরি হারিয়ে যাবার আগেই আমাদের ছেড়ে গেলেন। তাঁকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি আর তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি বলে নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিই।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box