মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

সংকটকাল

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়টা খুব সমস্যাসঙ্কুল ছিলো। আমরা তো যেমন কাজ করছিলাম, তেমনই করে যাচ্ছিলাম। মাঝে মধ্যে প্রেস ক্লাবে আড্ডা। সহকর্মীদের বাড়িতে আড্ডা। আমি সপ্তাহে একদিন ‘জনপদ’ পত্রিকা অফিসে যেতাম। সেখানে রুবী আপা, কবি রুবী রহমান মেয়েদের পাতা দেখতেন।আমাকে খুব স্নেহ করতেন।আমি সেদিন তাঁকে পাতা সাজাতে সাহায্য করতাম।কখনও লিখতাম। কিছু কবিতাও তখন লিখেছি। তার আগে চট্টগ্রামে আবুল মোমেন সম্পাদিত ‘অচিরা’য়ও কবিতা লিখেছি। এ কথা অনেকেই জানেন না। একদিন হঠাৎ মনে হলো, আমি যা লিখছি, সেগুলো কবিতা হচ্ছে না। তাই সেদিনের পর কবিতা লেখায় ইতি টানলাম। রুবী আপার পরে ফেরদৌস আরা মিনু আপা পাতাটা দেখতেন। তিনি ও তাঁর স্বামী তাজুল ভাইও খুব ভালবাসতেন আমাকে। তখনও ওখানে যেতাম। ওখানেই প্রথম আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে প্রথম দেখি। তাঁর লেখা পড়ে তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। পরে বিলেতে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। এক সঙ্গে কাজও করেছি।

জনপদে আবুল মনসুর ভাইও ছিলেন, যাঁর সঙ্গে ছাত্র জীবন থেকেই সখ্য ছিলো। আর একজন শিল্পী ছিলো, মাহবুব রশিদ। তাকেও লন্ডনে পেয়েছিলাম। সেই সময় আওয়ামী লীগ সরকার এক দলীয় শাসন কায়েম করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই মর্মে সবাইকে প্রায় – বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’এর (বাকশাল) সদস্য করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ততদিনে আমি এয়ার ভাইস মার্শাল এম কে বাশার, আমাদের ছোট ভাইজানের বাড়ি ছেড়ে ্ইয়াঙ উইমেন ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশেনের কর্মজীবী নারীদের হোস্টেলে চলে এসেছি। কারণটা ছিলো দূরত্ব। তেজগাঁ থেকে বংশাল রোড যাওয়াটা বেশ ঝামেলার ছিলো। হোস্টেলটা ছিলো সার্কিট হাউজ রোডে। আর আওয়ামী লীগের মূল অফিসও ছিলো ওখানে। আমরা হোস্টেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম দলটিতে যোগ দেবার জন্য কবি-সাহিত্যিক- বুদ্ধিজীবীরা মিছিল করে যাচ্ছেন। সাংবাদিকরাও বাদ যায়নি। তাই প্রতিটি পত্রিকা অফিসে কয়েকজন এলেন সাংবাদিকদের স্বাক্ষর নিয়ে তাদের সদস্যপদ নিশ্চিত করার জন্য। শুনলাম, তাঁরাও সাংবাদিক।

তাঁদের আগেও কখনো দেখিনি, পরেও দেখিনি। আমি ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে খুব সক্রিয় থাকলেও বিশ্বদ্যিালয় থেকে বেরোবার পর রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। আমার সহকর্মীদের মধ্যে যাঁরা কোন রাজনৈকি দলের সদস্য, তাঁদের সমস্যা কম ছিলো, কারণ পার্টির সিদ্ধান্তই ছিলো তাঁদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমার সঙ্গে যেহেতু কোন দলের সং¯্রব ছিলো না, তাই আমি বেঁকে বসলাম। বললাম, আমি রাজনীতি করি না। আমি স্বাক্ষর করবো না। সহকর্মীদের কেউ কেউ ফিস ফিস করে বললেন, ‘কথা না বাড়িয়ে সই করে দাও। আমি রাজী হলাম না। লোকগুলো বললো, ‘আপনার নাম কি?’ আমি নাম বললাম। তারা বললো, ‘দেখা যাবে।’ তবে দেখার সুযোগ তাঁরা আর পাননি। এর কিছুদিন পর হঠাৎ করেই. যতদূর মনে পড়ে, চারটি কাগজ সরকার হাতে রেখে বাকী সব কাগজ বন্ধ করে দিলো। আমি জনপদে গিয়েছিলাম। সেখানে বসেই জানলাম আমরা সবাই রাতারাতি বেকার হয়ে গেছি। মাসের শেষে অবজার্ভার ভবনে গিয়ে বেসিক বেতন নিয়ে আসতে হবে।

ব্যক্তিগতভাবে আমার তেমন সমস্যা হয়নি, কারণ তখনো বাপের হোটেল ছিলো। কিন্তু সেইসব সাংবাদিকরা খুব বিপদে পড়েছিলেন, যাদের পরিবার-স্ত্রী-পুত্র-সন্তান, মা-বাবা ছিলো। সময়টা ছিলো একটা সংকটকাল। কারো কারো অন্যত্র চাকরি হলো, যাদের সঙ্গে সাংবাদিকতার কোন সম্পর্কও ছিলো না। আমরা বাকীরা মাসের শেষে অবজার্ভার ভবনে জড়ো হতাম। সবার সঙ্গে সবার দেখা হতো। আমি শান্তিনগরে ভারতীয় হাই কমিশনের এক কর্মকর্তার মেয়েকে পড়াতে শুরু করলাম, তাতে যতটুকু সাহায্য হয়। ভদ্রলোককে আমি চ্যাটার্জ্জিদা ডাকতাম। বৌদি খুব স্নেহশীলা ছিলেন। সম্ভবতঃ আমরা তিনমাস বেকার ছিলাম। তারপর আবার কাগজ চালু হলো। দেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবার রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হত্যা করলো একদল সেনা অফিসার। তারপরে আমরা আবার কাজের ক্ষেত্রে ডাক পেলাম।তবে সবাইকে নেওয়া হলো না। কাগজের মালিকরা এই সুযোগে যাচাই-বাছাই করে কর্মীদের ফেরত নিলেন্। আমাদের অনেকের ব্যাপারে মালিকপক্ষের পছন্দ-অপছন্দ, কোনোটাই না থাকায় আমরা কাজে যোগ দিলাম এবং কাজ শুরু করলাম। কিন্তু জীবন আর আগের মতো হলো না। সংকটকাল চলতে থাকলো।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box