মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

পরিবর্তনের কাল

আগেই বলেছি, সংকটকাল চলতে থাকলো। জীবন আর আগের মত হলো না। বাকশালে যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেক সাংবাদিক যেমন ছিলেন, তেমনি যোগ দেননি, সেরকমও অনেকে ছিলেন। আগেই বলেছি, যাঁরা সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য, দলের সিদ্ধান্তই তাঁদের সিদ্ধান্ত। তবে তাঁরা ছাড়াও কেউ কেউ যোগ দিয়েছিলেন, যাঁদের সঙ্গে কোন রাজনৈতিক দলের কোন সংশ্রব ছিলো না। যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন, কেউ কেউ স্বেচ্ছায় দিলেও সবাই স্বেচ্ছায় যোগ দেননি। তাঁদের পরিবার-পরিজন, সংসারের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিলো। তাঁদের দোষ দেইনা, তাঁদের অপারগতা বুঝেছিলাম।

আমার মত মুক্ত বিহঙ্গ ক’জনই বা ছিলো! তবে যাঁরা বাকশালে যোগ দেননি, তাঁদের মধ্যে আমরা মাত্র দু’টি মেয়ে ছিলাম – আমি ও পূর্বদেশের নার্গিস রফিকা বানু। আমরা তাই চিহ্নিত ছিলাম। সেই সময় আমার কামাল লোহানী, আমাদের প্রিয় লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ হলো। মন্টুদা একদিন বললেন, লোহানী ভাই আমার সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছেন। আমি একটু লজ্জাই পেয়েছিলাম। আমি তো তেমন কেউ নই।তারপর গেলাম। সেদিন সেখানে মেনন ভাই, রাশেদ খান মেননও ছিলেন। মেনন ভাইকে স্কুলে পড়ার সময় থেকে চিনি। আমরা কাছাকাছি পাড়ায় থাকতাম। তাঁর স্ত্রী বিউটি আপা আর তাঁর শ্যালিকা কাজল আপা আমাদের আজিমপুর গার্লস স্কুলেই পড়তেন। লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে খুব ভাল লেগেছিলো। তাঁর সঙ্গে পরে আরো ঘনিষ্ঠতা হয়, আমরা এক সঙ্গে বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটে কাজও করেছি। সেকথা পরে বলবো। আকবর হায়দার রনো, আমাদের প্রিয় রনো ভাইয়ের ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ নামের গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে আমাদের নাম উল্লেখ করা আছে।

এদিকে দৈনিক সংবাদে অবশ্য আমরা সুখে-দুখে পরস্পরকে জড়িয়েই ছিলাম। এই সময়ে সাংবাদিক জগতের অনেক দিকপালের সঙ্গে আলাপ ও ঘনিষ্ঠতা হলো। তাঁদের মধ্যে নাম করতে হয় নির্মল সেন, আহমেদ হুমায়ুন, তোয়াব খানের নাম। আমার জীবনে শেষোক্ত দু’জন মানুষের অবদান এত বেশী যে, তাঁদের ধন্যবাদ জানানোও সম্ভব নয়, কারণ তাতে কতটুকু আর বলা হয়! তবে তাঁদের কথা বলার আগে সংবাদের কিছু মানুষের কথা বলা দরকার। মালিক-সম্পাদক আহমেদুল কবিরের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা ছিলো। তবে সেটা কেমন, বুঝিয়ে বলতে পারবো না। আব্বাকে তিনি ‘নানা’ ডাকতেন আর আমরা তাঁকে উল্লেখ করতাম ‘মনুচাচা’ বলে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলা বা তাঁকে সেই সম্বোধনে ডাকার সুযোগ সংবাদে কাজ করার সময় পাইনি, তার অনেক পরে লন্ডনে তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, তখন পেয়েছিলাম। আমি তাঁর কাগজে কাজ করার সময় তিনি আমাকে চিনতেন বলে আমার কখনো মনে হয়নি। আব্বা ততদিনে ফরেস্ট বিভাগ ছেড়ে খুলনা নিউজপ্রিন্টের সেলস ম্যানেজার হয়েছিলেন। তাঁর কাজেই তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্র দফতরে যেতেন, সেরকম দৈনিক সংবাদেও যেতেন। মনুচাচা তাঁকে যথেষ্ট সমাদর করতেন।

আমি একদিন সন্তোষদাকে বলেছিলাম, তিনি আব্বাকে এত সমাদর করেন আর আমাকে চেনেনই না! দাদা বলেছিলেন, ‘তোমাকে না হলেও তাঁর চলবে। কিন্তু তোমার আব্বার সঙ্গে আত্মীয়তা ছাড়াও তাঁকে তাঁর দরকার।’ আব্বাকে নির্বাহী সম্পাদক বজলুর রহমান, আমাদের বজলু ভাইও খুব পছন্দ করতেন। সেকথা তিনি অনেক পরে লন্ডনে আমাকে বলেছিলেন। সন্তোষদা ছাড়া আমাদের বাকী সব কথাবার্তা তাঁর সঙ্গেই হতো। মনুচাচা মালিক-সম্পাদক হিসেবে দূরের মানুষই ছিলেন। সেই সময় আমার ব্যক্তিগত জীবনেও বড়সড় পরিবর্তন এলো। আমি বিয়ে করলাম। আমি ওয়াইডব্লিউসিএ কর্মজীবী হস্টেল ছেড়ে সংসার পাতলাম সেন্ট্রাল রোডের একটি ম্যাচ বাক্সের মত ছোট্ট বাড়িতে। সেই বাড়িতেই আমার একমাত্র সন্তান, আমার পুত্র রূপক জন্মেছিলো। সে আরো পরের কথা। ইতোমধ্যে আব্বা খুলনা নিউজপ্রিন্ট থেকে অবসর নিলেন। মনুচাচা তাঁকে তাঁর চা ব্যবসা সংক্রান্ত চট্টগ্রাম অফিসের দায়িত্ব দিলেন। ঘটনা চক্রে আমার শ্বশুরবাড়িও চট্টগ্রামে ছিলো এবং আমার শ্বশুর ও আব্বার বাড়ি কাছাকছি ছিলো – পাঁচলাইশ আর কাতালগঞ্জ। বিয়ের কিছুদিন পর আমার স্বামী মুহাম্মদ জাহাংগীর ঠিক করলো, আমরা চট্টগ্রাম চলে যাবো। আমি সাংবদিকতা উপভোগ করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে যেতে হলো। আমরা চট্টগ্রামবাসী হলাম।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box