মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

চট্টগ্রাম বাসের জীবন

চট্টগ্রামে বলতে গেলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের জীবন যাপন শুরু হলো। সেখানে আমি গৃহবধু, বেকার। যৌথ পরিবারে বাস। তবে সেটা খুব যে খারাপ ছিলো, তা নয়। বেশ উপভোগই করেছি সেই জীবন। বাড়ির সদস্যরা আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। সবার আগে বলতে হয় জাহাঙ্গীরের বাবার কথা। অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ, অনেকটা রক্ষণশীল, কিন্তু খুব ¯েœহপ্রবণ। আমার সৌভাগ্য আমি তাঁর অনেকটা ¯েœহের ভাগীদার হতে পেরেছিলাম। তিনি আমাদের থাকার জন্য দোতলার একটি বড় ফ্ল্যাট দিলেন। বারান্দাটাই প্রায় ৪০ ফুট লম্বা। ঘরগুলো বড় বড়। কিন্তু আমাদের তো কোন আসবাবপত্র ছিলো না। সে সব কেনার টাকাও তিনি দিলেন। অল্প কিছু আসবাব কিনলাম। সারাদিন অবশ্য একতলায় বড় ভাবী, বড়দা ও তাঁদের দুই কন্যা স্বাতী ও নাতাশার সঙ্গে কাটতো।

রাতে ঘুমাতে যেতাম দো’তলার ফ্ল্যাটে। জাহাঙ্গীরের বাবা, যাঁকে আমরা আব্বা ডাকতাম, তিনি কাজ থেকে ফিরলে, তাঁর খাবার সময় কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম। তিনি অনেক গল্প করতেন, তাঁদের গ্রামের বাড়ির কথা, সেখানে তিনি কি কি গাছ লাগিয়েছেন, সেসব কথা। রোজ বেরোবার সময় সকালে আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, আমার জন্য কি আনবেন। কিন্তু আমি যা চাইতাম, তাতে তিনি খুব অবাক হতেন। আমি আপেল আঙুর ইত্যাদি কিছুটা দামী ফল খেতে চাইলে হয়ত খুশি হতেন। একবার আমি সফেদা খেতে চাওয়াতে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। বড়ভাবী আমাকে তাঁর আঁচলের তলায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। বড়দাও অত্যন্ত ভাল মানুষ এবং ঘরোয়া ধরণের মানুষ ছিলেন। আমার প্রায় সর্বক্ষণের সাথী ছিলো জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে ছোটভাই মইনু। আমার একটাই কষ্ট ছিলো, আমি ওদের খাবার খেতে পারতাম না। ওরা রোজ শুঁটকি খেতো, আমি শুঁটকি খাই না। চট্টগ্রামের রান্না আমাদের অঞ্চলের চেয়ে অনেকটাই আলাদা ছিলো। মইনু আমার জন্য আচার, সস্ আর ডিম কিনে আনতো, যাতে ডিম সেদ্ধ আর আচার বা সস্ দিয়ে আমি ভাত খেতে পারি। আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকতো জাহাঙ্গীরের পিঠাপিঠি ভাই আজম ও তাঁর পরিবার। তাঁর স্ত্রী নার্গিস আবার ওদের বোনের ননদ। তাঁদের দু’টি বাচ্চা, তৃষা আর জিয়ন। ওরাও বেশ ছোট। স্বাতী আর নাতাশার কথা আগেই বলেছি। স্বাতী তখন স্কুল ফাইনাল দেবে দেবে করছে।

পরিবারের অন্য বাচ্চারা আমাকে ‘ছোটমা’ ডাকলেও স্বাতী ডাকতো ‘ছোটবউ’। এখনো, আজ এত বছর পরও এবং ওদের পরিবার থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পরও ওরা আমাকে সেই ডাকেই চেনে। নাতাশা খুবই ছোট ছিলো। সারাদিন প্রায় আমার কাছে থাকতো। আমি ওকে খাওয়াতাম, একটু-আধটু পড়াতাম। একদিন কাকে যেন গল্প করেছি, নাতাশাকে গল্প বলে খাওয়াতাম আর ওর খাওয়া শেষ হবার আগে গল্প শেষ হলে মুস্কিল হতো। তাই ‘গল্পটা টেনে টেনে লম্বা করতে হতো।’ একথাটা ও শুনছিলো। পরে একদিন বললো, ‘ছোটমা, গল্পটা টেনে টেনে লম্বা করো না।’ মইনু ছাড়াও আমার আর এক সঙ্গী ছিলো স্বাতী। অনেকদিন পরে, স্বাতীর বিয়ের পর আমাকে একটা চিঠি লিখে বলেছিলো, আমি নাকি ওদের জীবনে খোলা হাওয়া নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার এক জা নার্গিস যাঁর ননদ, সেই ছোট আপাও আমার বন্ধুর মত ছিলেন। খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তখন ওঁর তিন মেয়ে ছিলো , বীথি, শান্তা আর কান্তা। আজও ওদের সবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অটুট আছে, বিশেষ করে বাড়ির বাচ্চাদের সঙ্গে – তারা অবশ্য এখন সবাই বড়, পেশাজীবী বা সংসারী। আমি মাঝে মাঝে একটা রিক্সা নিয়ে আব্বা-মায়ের কাছে যেতাম। দু’টি বাড়ি বেশ কাছাকাছি ছিলো। আমার মেজ বোন তনু তখন ঢাকায় পড়ে।

আব্বা-মায়ের কাছে শুধু ছোট বোন সোমা থাকতো। মায়ের হাতের চমৎকার রান্না খেতে খুব ভাল লাগতো। আমাদের পরিবারের সবার কাছে, এমনকি দূরের আত্মীয়দের কাছেও মায়ের রান্নার খুব সুখ্যাতি ছিলো। চট্টগ্রামে আমাদের সংসারে পরিবারের মানুষ ছাড়াও কিছু বন্ধু-বান্ধব আসতো। শৈশবের বন্ধু মঞ্জুর রহিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতো। ও আসতো। আবু করিম ও মোহিতুল আলম আসতা। মোমেন ভাই তো আসতেনই। সেই সময় মোমেন ভাইরা ফুলকি নামে ব্যতিক্রমী একটা স্কুল শুরু করলেন। আমাকে বললেন, সেখানে একদিন ক্লাস নিতে। ক্লাস নেওয়া মানে বাচ্চাদের গল্পে গল্পে সভ্যতার ইতিহাসের কথা বলা। সেটা খুব ভাল লাগতো। ফুলকি তখন ছিলো চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজের ভেতরে। উল্টোদিকে ওয়ার সেমেট্রি’তে। ছাত্র জীবনে মান্নান ভাই, দিবাকর বড়ুয়া, তপনজ্যোতি বড়ূয়া কিংবা অমিত চন্দ’দার সঙ্গে সেখানে গিয়ে বসে থাকতাম। সেটাও খুব ভাল লাগতো। এভাবে বেশ আনন্দেই কাটছিলো চট্টগ্রামের জীবন।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box