মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

চট্টগ্রামের বাড়িতে ঈদসম্মিলনী

একটা সময় ঈদ ছিলো প্রচুর আনন্দের উৎসব। সেটা শৈশবে তো বটেই, যতদিন মা-বাবা বেঁচে ছিলেন, ততদিন এবং চট্টগ্রাম বসবাসের সময়ও ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করেছি। প্রথমত: সমস্ত পরিবার একত্রিত হতেন, সেটা খুব ভাল লাগতো। তবে ঈদের আগে আর একটা আনন্দের বিষয় ছিলো ঈদের বাজার করা। বিশেষ করে পরিবারের ছোটদের ঈদের কাপড় কেনা। আমি, মঈনু আর কয়েকটা বাচ্চা, কখনো কখনো স্বাতী সঙ্গে যেতো। বাচ্চাগুলোকে সামলানো একটা বড় কাজ ছিলো। কিন্তু তাতে যে আনন্দ পেতাম, সেটা এত কাল পরও মনে পড়ে। চট্টগ্রামের নিউমার্কেটের একটা সুন্দর বাংলা নাম হলো- বিপনী বিতান।আমরা সেখানেই যেতাম। তাদের মা-বাবারা নিশ্চিন্ত মনে আমাদের হাতে এ দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন। যা কিনতাম, তাতেই খুশি হতেন। ঈদের বড় একটা আনন্দ ছিলো সবার এক জায়গায় হওয়া এবং আড্ডা দেয়া। আমরা কেউই তেমন বাইরে যেতাম না। আসলে যাবার দরকার হতো না। বাড়িটাই ছিলো আনন্দের হাট।

কোরবানী ঈদের ব্যাপারটা ছিলো একটু অন্য রকম। চট্টগ্রাম বাসীরা, বিশেষ যাঁদের সামর্থ্য ছিলো, তাঁরা একটার বেশী গরু বা ছাগল কোরবানী দিতেন। অন্য পরিবারে কি হতো সেটা কখনো জানা হয়নি। কিন্তু আব্বা যেহেতু ইসলাম ধর্মের অনুশাসন অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন, তাই বাড়ির ভেতরে বেশী গোশত্ আসতো না। যেখানে কোরবানী দেওয়া হতো, সেখান থেকেই গরীব-দুঃখী, পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিলি করা হয়ে যেতো। কিছুটা বাড়িতে আসতো। সেগুলো কুটে-বেছে রাখতাম আমরা, বাড়ির সদস্যরা।এ নিয়ে আমার জীবনে একবার একটা অভিজ্ঞতা হলো।আমি বেশ মজাই পেলাম। দুপুর খাবার সময় হয়ে গেলেও আমি মহা উৎসাহে কাজটা করে চলেছিলাম। শেষ পর্যন্ত বড়দা এসে আমাকে ধমকে তুলে গোসল করতে পাঠালেন। বাড়ির বাইরে সকালেই রান্না হয়ে যেতো, ছোট ছোট গোশতর টুকরা, কলিজা, গুর্দাগুলো। আগের রাতে গ্রামের বাড়ি থেকে ধামা ভর্তি চালের রুটি আসতো। সেই রুটি দিয়ে গোশতের তরকারি খাওয়া হতো।

আসলে সবাই মিলে কিছু করলে যে তার আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায়, সেটা আমাদের শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যে জেনেছিলাম। আরো যখন বড় হলাম, পরিণত বয়সে দেখলাম সবাই কেমন ছাড়া ছাড়া হয়ে গেছে। আন্তরিকতার জায়গা নিয়ে নিয়েছে শুকনো লৌকিকতা। ছোট আপার বাসায় বেশী যেতাম আমি, মঈনু আর স্বাতী। ছোট আপাও আসতেন। আর একটা বড় আনন্দের বিষয় ছিলো ওদের সবার বড় বোন, যাঁকে আমরা বুবু ডাকতাম, তাঁর বাড়ি যাওয়া। সেখানে খাওয়ার এলাহি ধুম পড়ে যেতো। সব কিছুই রান্না হতো। যাবার পর এক প্রস্থ নাস্তা, তারপর খাবার সময় মাছ, ডিমের তরকারি, মুরগি আর গরু বা খাসির মাংস, সবই থাকতো। আমি বেশী খেতে পারতাম না। কিন্তু বুবুর কাছে যাওয়াটা খুব আনন্দের ছিলো। যে কোন কারণেই হোক, তিনি আমাকে খুব ¯েœহ করতেন। অনেক পরে, আমি যখন ঐ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, আমার পুত্র রূপক যেতো ওর দাদাবাড়ি আর ফিরে এসে বলতো, ‘মা, ওঁরা তোমাকে খুব ভালবাসেন। বড় ফুফু বলছিলো, তুমি কেন তাঁর বাড়ি যাও না। চলো একবার আমি আর তুমি এক সঙ্গে যাই।’ গিয়েছিলাম। তিনি তখন খুব অসুস্থ। মঈনু বলেছিলো, ‘হয়ত তোমাকে চিনবেন না। কিছু মনে রাখতে পারেন না। তবু চলো।’ গেলাম। তাকিয়ায় ভর দিয়ে উঠে বসে আমার হাত ধরে কত কথা বললেন। কে বললো চিনবেন না বা সব ভুলে গেছেন? আমার বড় চাচা (জ্যাঠা) যে ডাক্তার, সেটাও মনে আছে।

তাঁর সেই ভালবাসায় আমি এত আপ্লুত হয়েছিলাম। কতখানি ভাগ্য নিয়ে এসেছিলাম আমি যে ঐ বাড়ির প্রায় সবার অকুণ্ঠ ভালবাসা পেয়েছিলাম। এর পরই বুবু মারা যান। তখন মনে হলো, ভাগ্যিস দেখা করেছিলাম! ঠিক এমনটাই ঘটেছিলো বড় ভাবীর সঙ্গে। কয়েক বছর আগে। চট্টগ্রাম গিয়েছি। উঠেছি বন্ধু দম্পতি মনসুর ভাই-নাজলীর বাড়িতে। মঈনু এসে বললো, ‘বড় ভাবী বেশ অসুস্থ। তোমাকে দেখতে চেয়েছেন।’ গেলাম। তাঁরা তখন পৈতৃক বাড়ি ‘নিরিবিলি’তে থাকেন না। বড়দা অন্যত্র বাড়ি করেছেন। মেয়ে নাতাশা স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে পাশের ফ্ল্যাটে থাকে আর অন্য পাশের ফ্ল্যাটে বড়দা ও ভাবী। স্বাতী কানাডায় থাকে, ওদের ভাই শিশুও তাই। ভাবী আমার হাত ধরে কত পুরনো কথা বললেন। আমরা কি করতাম। কত আনন্দে সময় কাটাতাম, সেসব। তার কিছুদিন পর বড় ভাবী চলে গেলেন। আজ এতদিন পরও তাঁদের সেই স্নেহের স্পর্শ অনুভব করি।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box