মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

ঢাকায় প্রত্যবর্তন ও নতুন কর্মজীবন শুরু

চট্টগ্রামে আমার সময়, শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ি মিলিয়ে যত আনন্দেই কাটুক না কেন তার মেয়াদ ছিলো মাত্র এক বছর। জাহাঙ্গীরের সেখানে ভাল লাগছিলো না অথবা অন্য কোন কারণে সে ঢাকা ফিরে যেতে চাইছিলো। ফলে আমরা ঢাকা ফিরে গেলাম। আব্বা একটু ক্ষুন্ন হলেন, কিন্তু আমার কিছু করার ছিলো না। ঢাকায় সেন্ট্রাল রোডে আমাদের সেই ম্যাচ বক্সের মত বাড়িটা এক বন্ধুকে দেওয়া হয়েছিলো, সে আমরা ফেরা মাত্র বাড়িটা ছেড়ে দিলো। আমরা আবার সেখানে সংসার পাতলাম। পাশের বাড়িতে থাকতেন সাহিত্যিক আব্দার রশিদ। চমৎকার নির্বিরোধী মানুষ ছিলেন। সংসার সমুদ্রে হাবু-ডুবু খাওয়া আমি, তাঁর স্ত্রী, খালাম্মার কাছে অনেক কিছু শিখেছিলাম। তাঁদের ছেলে কাঁকনও খুব ভাল ছেলে ছিলো। একবার আমার মামস্ হলে কেউ আমার কাছে আসতো না, একমাত্র কাঁকন এসে বসে গল্প করতো। বারণ করলেও শোনেনি। সেই বাড়িতে প্রতি রবিবার বন্ধুদের তুমুল আড্ডা বসতো আর অনেকেই দুপুরে খেয়ে যেতো। আমি সদ্য রান্না শিখে তাদের খাইয়েছি।

নির্মল সেন

জাহাঙ্গীর আমাকে প্রখ্যাত সাংবাদিক তোয়াব খান ও আহমেদ হুমায়ুনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলো। বলেছিলো, তার দু’জন প্রিয় মানুষের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেবে। আমার ভাগ্য যে পরবর্তী সময়ে দু’জনের অগাধ স্নেহ পেয়েছিলাম। সম্ভবতঃ সেটা আমার নিজের কারণেই, জাহাঙ্গীরের স্ত্রী হিসেবে নয়। দৈনিক বাংলায় আরো বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলো – জহুরুল হক, খন্দকার আলী আশরাফ, মঞ্জুরু আহমেদ, তারা ভাই, নির্মল সেন। আমার স্কুলের সহপাঠিনী বিজলী বা বিজুর স্বামী তওফিক আজিজ খান ছিলেন দৈনিক বাংলার জেনারেল ম্যানেজার। সাংবাদিক জগতের অনেকের সঙ্গে তখন আলাপ হয়। পরে চাকরিসূত্রে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হয় বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটউিটে কাজ করার সময়। ঢাকা ফিরে আসার পর মূল সমস্যা দেখা দিলো আমার চাকরি। দৈনিক সংবাদের চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম, সেটা তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না।

লেখকের সঙ্গে তোয়াব খান

আমি সরকারী প্রেস ইনফর্মেশন ডিপার্টমেন্ট এবং বছরখানেক আগে স্থাপিত বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটে চাকরির চেষ্টা করলাম। চাকরি দু’জায়গায় হয়েছিলো, কিন্তু আমি যোগ দিই বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট বা পি আই বি’তে। তখন প্রেস ইনফর্মেশন ডিপার্টমেন্ট’এর প্রধান ছিলেন এনামুল হক, তিনি আবার আমার ফুফাতো ভাই সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেমের বন্ধু। হাশেম ভাইর বোন বলে ওর বন্ধুদের অনেকের স্নেহ পেয়েছিলাম, এনামুল হক তাঁদের অন্যতম। তিনি আবার আমাদের দেশ অর্থাৎ ফরিদপুরের মানুষ। তিনি আমাকে তাঁর টীমে নিতে আগ্রহী থাকলেও আমার সরকারী চাকরিতে আগ্রহ ছিলো না। তাই আমি পিআইবি’তে যোগ দিলাম। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আব্দুল ওয়াহাব, আমার প্রিয় শিক্ষক ড.আনিসুজ্জামানের শ্বশুর, আমাদের বেবী ভাবীর বাবা। বিখ্যাত সাংবাদিক ছিলেন এক সময়। লন্ডন টাইমস, নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর মত কাগজে কাজ করেছেন। পিআইবির পরিচালক ছিলেন তোয়াব খান ও লুৎফর রহমান। আমি প্রথম নারী কর্মী হিসেবে যোগ দিলাম। তবে যে সহযেগিতা তাঁদের সকলের কাছে পেয়েছি এবং কাজ শিখতে পেরেছি, তার জন্য আমি আজীবন তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ থেকেছি।

আমার চাকরি পাকা হবার সময় অবশ্য কিছু সমস্যা হয়েছিলো। পিআইবি’র বোর্ডের চেয়ারপারসন যিনি ছিলেন, তিনি বিখ্যাত ব্যক্তি; যে কোন কারণে হোক, তিনি আমার নিযুক্তি পছন্দ করেননি। বোর্ডের অন্যতম সদস্য ছিলেন নির্মল সেন ও গিয়াস কামাল চৌধুরী। পরে গিয়াস ভাইর কাছে শুনেছি আমার নিযুক্তি রক্ষার জন্য প্রাণপণে লড়ে গিয়েছেন নির্মলদা। গিয়াস ভাইর ভাষায়, নির্মলদাকে এত রেগে যেতে তিনি আগে কখনো দেখেননি। বেকার সাংবাদিক হিসেবে আমার নিযুক্তির যুক্তি যখন চেয়ারপারসন শুনছিলেন না, তখন নাকি নির্মলদা বলেছিলেন, শুধু বেকার সাংবাদিক নয়, নারী কোটা যোগ করলে কাজটা আমারই হওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত আমার চাকরি পাকা হলো। পরে ওয়াহাব সাহেব অবসর নিলে তোয়াব ভাই মহাপরিচালক হলেন এবং তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পেলাম যা আমার জন্য একটা পরম প্রাপ্তি বলে আমি মনে করি।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box