মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

জীবনের প্রথম বিপর্যয়

ঢাকার জীবন আর নতুন চাকরি ভালোই চলছিলো। আব্বা মাঝে মাঝে কাজে ঢাকা আসতেন। বড়চাচার বাসায় উঠতেন। সেরকম একবার এলেন, যাবার আগে দেখা করতে এলেন আমার

সেন্ট্রাল রোডের ম্যাচ বক্স বাড়িতে। পনির কিনেছিলেন, আব্বার প্রিয় ঢাকার পনির যা চট্টগ্রামে পাওয়া যায় না। দেখা করতে এসে বললেন, ‘একটা ছুরি দে, তোকে অর্ধেকটা দিয়ে যাই।’ বললাম, ‘আমরা তো এখানে পনির পাই। তুমি পুরোটা নিয়ে যাও।’ শুনলেন না। ছুরি দিলাম। পনির কাটতে গিয়ে ছুরিটা ভেঙ্গে গেলো। আব্বা বিমর্ষ হয়ে বললেন, ‘তোর ছুরিটা ভেঙ্গে গেলো।’ বললাম, ‘তাতে কি? আমি আর একটা ছুরি কিনে নেবো।’ আব্বা চলে গেলেন। অফিসের গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন, তাতেই যাত্রা করলেন। পরদিন খবর পেলাম, আব্বার স্ট্রোক হয়েছে, হাসপাতালে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ছুটে গেলাম। আমার চাকরির মাত্র কয়েক মাস হওয়া সত্ত্বেও ছুটি পেতে অসুবিধা হলো না। আব্বাকে কখনো এভাবে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছিলেন।

রোজ গিয়ে আব্বার কাছে বসতাম, কথা বলতাম। ছোটবেলা থেকেই আব্বার সঙ্গেই বেশী কথা হতো। আব্বা প্রথম ধাক্কা সামলে উঠলেও অবস্থা খুব বেশী ভালো ছিলো না। অনেকেই আসতো দেখতে। শৈশবের বন্ধু মঞ্জুর রহিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। ও সস্ত্রীক আসতো। ওর মা, যাঁকে আমরা চাচী ডাকতাম, তিনিও আসতেন। বেশ কিছুদিন ছিলেন আব্বা হাসপাতালে। আরো একটু ভালো হলে বললেন, ‘তোর নতুন চাকরি, তুই বরং চলে যা। বড়দা আসবে বলেছে, তাঁর সঙ্গে নাহয় আবার

আমার আব্বা

আসিস।’ ‘বড়দা’ মানে বড়চাচা, আব্বার একমাত্র ভাই। আমিও সেকথা মেনে ঢাকা ফিরে গেলাম। রোজ ফোনে খবর নিতাম। আব্বা আরো ভাল হয়ে বাসায় ফিরে গেলেন। তারপর একদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি হুমায়ুন ভাই (আহমেদ হুমায়ুন) বসে আছেন। তখন আমাদের দুপুর ২টায় ছুটি হতো।

বন্ধুদের কেউ কেউ আছে। হুমায়ুন ভাই কখনো আমাদের বাড়ি আসেননি। আমাকে অবাক দেখে হুমায়ুন ভাই বললেন, ‘এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম একবার ঢুকি।’ মনের খটকা কাটছিলো না। কিছুক্ষণ পরে বোঝা গেলো, আব্বা আর নেই। দ্বিতীয়বার স্ট্রোক হওয়াতে হাসপাতালে নেবার পরই তিনি চলে গেছেন। যখন অ্যাম্বুলেন্স এসেছিলো তাঁকে নিতে, তিনি আমার আট বছর বয়সী ছোট বোন সোমাকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে ছিলেন। আমরা তিন বোন ছিলাম আব্বার চোখের তারা। আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম, কারা এসেছিলো জানি না। ফুফাতো ভাই, হাশেমভাই (সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেম) আর বড়চাচা এসে আমাকে বুকে টেনে নেয়াতে তাঁদের কথাই শুধু মনে আছে। দু’জনেই কাঁপছিলেন, তাতে বুঝেছিলাম, তাঁরাও কাঁদছেন। প্রথম একটা অদ্ভুত কথা মনে হলা, আব্বাকে কত কথা বলার ছিলো, বলা হলো না।

সবসময় মনে হতো আব্বা তো আছেন, বলবো পরে। কিন্তু জীবনে কবে কখন যে কী হয়, কেউ বলতে পারে না। কথাগুলো কেন বলিনি, যদিও খুব সাধারন কথা, সেজন্য দু:খ আরো উথলে উঠলো। সেদিন রাতেই আমরা চট্টগ্রাম যাত্রা করলাম। জাহাঙ্গীর ছাড়াও আমরা সমবয়সী চাচাতো বোন, আমার শৈশবের সাথী পিউ গেলো। রাতের ট্রেন,সারারাত ঘুমাইনি। কেঁদেছি। সকালে যখন পৌছলাম, তখন বাসায় ঢুকতেই ছোটবোন সোমা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললো, ‘আপা, আমার আব্বা কোথায়?’ বাক্যহারা আমি জবাব দিতে পারলাম না। বড়চা

চা সেদিনই বিমানে এলেন। আমাকে দেখে কেঁদে বললেন, ‘ওতো আমার চেয়ে অনেক ছোট, ও কেন আগে চলে গেলো?’ আব্বাকে সমাধিস্থ করে বাসায় ফিরে বড় চাচা বললেন, আব্বাকে নাকি একদম দাদুর মত লাগছিলো। আমরা যেদিন পৌঁছলাম, সেদিনই গরীবুল্লাহ শাহের দরগায় আব্বাকে সমাধিস্থ করা হলো। কবর দেবার বন্দোবস্ত এরং পরবর্তী যেসব কাজকর্ম, সমস্ত বন্দোবস্ত করেছিলেন আমার শ্বশুর। এরপর ঘোরের মত কয়েকটা দিন কেটে গেলো। মইনু রোজ আসতো।

বেশ রাত পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থাকতো। আমার দুই বোন তনু-সোমা আর মা রাতে শুতে গেলে আমি বারন্দায় একা একা কাঁদতাম। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠতো। দিনে কাঁদতে পারতাম না বোন দু’টির কথা ভেবে। আমাকে কাঁদতে দেখলে ওরাও কাঁদতো। কোন কোনদিন, মইনু আমার পাশে নি:শব্দে বসে থাকতো। বড় চাচা চলে গেলেন, পিউও। হাশেমভাই এলেন। এক দুপুরে চা নিয়ে ডিভানে আধ শোওয়া হাশেমভাইকে দিতে গিয়ে দেখি ওর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। আব্বা আর হাশেমভাই, হাশেমভাইয়ের ভাষায়, যমজ ভাইয়ের মত বড় হয়েছে। আমরা দাদু মাতৃহারা পুত্র আর মাতৃহারা নাতিকে তাঁর কাছে নিয়ে গিয়ে মানুষ করেন। আব্বার মৃত্যু আমাদের পরিবারের জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিলো আর আমার জন্য ছিলো জীবনের প্রথম বিপর্যয় যা আমি কখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

ছবি: লেখক ও গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box