মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

সুন্দরবনের কথা কি শেষ হতে চায়! বড় আনন্দের দিন ছিলো সেসব। আমি অনেক সময়ই আব্বার সঙ্গে একা সুন্দরবন যেতাম। কখনো কখনো সঙ্গে আম্মা, আমার ছোট দুই বোন তন্দ্রা ও সোমা থাকতো। অধিকাংশ সময় আর কেউ থাক বা না থাক, আমি থাকতাম।
আমরা খালিশপুরে অবস্থিত খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল থেকে যখন সুন্দরবনের পথে যাত্রা করতাম। একে একে পার হয়ে যেতে হতো ডেল্টা জেটি, ফরেস্ট ঘাট, শিপইয়ার্ড। লবণচোরায় সে সময় মুসলিম লীগ নেতা সবুর খানের বাগানবাড়ি। ভৈরব নদী দিয়ে যাত্রা শুরু করে গিয়ে পড়তাম রূপসা নদীতে, তারপর পশুর নদী। এরপর কত শত নদী, সেকথা আগেই লিখেছি। দু’পাশে শস্যক্ষেত্র। ছোট ছোট গ্রাম। বন্দরের ব্যস্ততা। এরপর বড় বন্দরে পড়তে হতো – মংলা বন্দর। সেখানে নোঙর করে থাকতো সামুদ্রিক বড় জাহাজ। কখনো বা সেসব জাহাজ ধীর গতিতে আসতো নোঙর করার জন্য। একবার আমি আর আব্বা গোসল করে ডেক’এ দাঁড়িয়ে জাহাজ দেখছিলাম। আমরা যে লঞ্চে ছিলাম, সেটা খুব বাহারী। আধুনিক সব ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু সেটা ছিলো ছোট। হঠাৎ একটা বিরাট ঢেউ এসে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেলো। আমাদের তো দ্বিতীয়বার গোসল হয়ে গেলো। সেই সঙ্গে শোবার কেবিনের বিছানাপত্র ভিজে একাকার।
সুন্দরবনে আব্বাদের মানে নিউজপ্রিন্ট মিলের ক্যাম্প ছিলো। যে এলাকায় কাগজের কাঁচামাল হিসেবে গাছ কাটা হতো, সেখানে ক্যাম্প থাকতো। সেই এলাকার কাজ হয়ে গেলে অন্যত্র ক্যাম্প তৈরী হতো। সেই ক্যাম্প’এ বেশ সময় কাটাতাম। আবার এদিক ওদিক ঘুরতাম। কয়েকবারই দুবলার চরে গিয়েছি । সেখানে শুটকি মাছের ক্যাম্প হতো। সেই চরে হাঙরের শুটকি ঝুলতে দেখেছি। কাছেই নীলবাড়িয়ায় হতো নোনা ইলিশের ক্যাম্প। আর একবার নিউজপ্রিন্ট মিলে আমাদের প্রতিবেশী এবং আব্বার সহকর্মীদের পরিবার সঙ্গে ছিলো। সেবার কটকা দ্বীপে গিয়ে রাত কাটিয়েছিলাম।
আর একবার আমার সমবয়সী চাচাতো বোন পিউ, আমাদের সবচেয়ে বড় বোন নীনা আর বড় দুলাভাই মাহমুদ জামালী গিয়েছিলো সুন্দরবন। সেখানে একদিন স্পীড বোটে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। বোটে রাইফেল ছিলো। হঠাৎ দেখতে পেলাম একটা বিশাল কুমির বিরাট একটা হা করে ডাঙায় রোদ পোহাচ্ছে। দুলাভাই বোটম্যানকে বললেন, বোট কাছে নিতে আর তিনি রাইফেল নিয়ে তৈরী হলেন। কিন্তু বোটটা কাছে যেতেই আমি আর পিউ এমন চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিলাম যে, কুমিরটা আড়ামোড়া ভেঙ্গে ঠাশ করে হা বন্ধ করলো, তারপর পানিতে আলোড়ন তুলে নদীতে নেমে গেলো। বলাবাহুল্য দুলাভাইয়ের বকুনী খেতে হয়েছিলো। আর একবার পিউর ছোট যমজ ভাই মিঠুল আর টুটুল সুন্দরবন গিয়ে কুমিরের ডিম নিয়ে গিয়েছিল ঢাকায়। সেটার পরিণতি কী হয়েছিল মনে নেই।
বাঘ দেখিনি, বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছিলাম। নিউজপ্রিন্ট’এর ক্যাম্প’এ ঘুম ভাঙ্গলে মাচাং করা বাড়িঘর-অফিসের নিচে কাদার মধ্যে হরিণ ও বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পেতাম। আব্বা একবার বাঘ মারতে বাধ্য হয়েছিলো। সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে আব্বা কাজ দেখতে একটা সরু খালে ঢুকেছিলো। হঠাৎ দেখে ডাঙায় একটা বাঘ বসে আছে। তখন তাকে না মারলে সে আব্বা ও তাঁর সাথীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। তার ফলে আব্বাকে সেটার ওপর গুলী চালাতে হয়।
তবে সুন্দরবনে সবচেয়ে আনন্দের অভিজ্ঞতা ছিলো ফরেস্ট্রি ডে। সারা বছর যেসব কর্মী প্রায় জনমানবশূন্য, হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে সুন্দরবনের মতো পা-ববর্জিত অঞ্চলে কাটাতেন, তাঁদের বিনোদনের জন্য আয়োজন করা হতো এই ফরেস্ট্রি ডে’র। ঢাকায় কর্পোরেশন হেড অফিস থেকে কর্মকর্তারা আসতেন। আসতেন অতিথিরা। তবে মূলতঃ সেটা ছিল শ্রমিকদের দিন। নানা রকম খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদিরও আয়োজন থাকতো। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ইভেন্ট ছিলো ক্রস কান্ট্রি রেস। শ্বাপদসঙ্কুল সেই বনের মধ্যে দিয়ে বেশ কয়েক মাইল এই দৌড় প্রতিযোগিতা অত সহজ ছিলো না। কিছু দূর দূর রাইফেল হাতে প্রহরীরা সজাগ থাকতেন। তারপরও শূলা বা ব্রিদিং রুটস’এর কারণে দৌড়নো কঠিন ছিলো। কিন্তু তাঁরা যখন সে কাজ সমাপন করে ঝোড়ো কাকের মত চেহারা আর বিজয়ীর হাসি নিয়ে ক্যাম্প’এ পৌঁছতেন, তখন তাদের আনন্দ ভাগ করে নিতেন সমবেত অতিথিবৃন্দ।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]