মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

দায়িত্ব পালন

আব্বা চলে যাবার পর হঠাৎই টের পেলাম এখন পুরো পরিবারের দায়িত্ব আমার ওপর। মা, দুই বোন – মেজবোন তন্দ্রা বা তনু সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স পড়তে; ছোট বোন সোমার বয়স সবে আট কি নয়, স্কুলে যাবার বয়স। আমি বাড়ির বড়। সুতরাং সব কিছু আমাকেই করতে হবে। প্রথমে ভাবতে হবে ওরা কোথায় থাকবে। তনু রোকেয়া হলে থাকে, ওকে নিয়ে ভাবছি না। কিন্তু মা আর সোমা? এই সমস্যার সহজ সমাধান করে দিলেন ছোট দাদু সৈয়দ সাদেকুর রহমান, আব্বার ছোট চাচা, যিনি আমাদের দেশের বাড়িতে থাকেন। তাঁর যথেষ্ট বয়স হওয়া সত্ত্বেও ফরিদপুরের সাতৈর গ্রাম থেকে তিনি সুদূর চট্টগ্রামে গিয়ে মা আর সোমাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এর পরের চিন্তা ছিলো ওদের খরচ। আমার চাকরি ছিলো, কিন্তু সাংসারিক দায়িত্বও ছিলো। সেই সময় আমার পাশে দাঁড়ালো আমাদের বড় ভাই বাবুল, বড় চাচার বড় ছেলে বললো, ‘তোর যখনই দরকার, আমার কাছে আসিস।’ ও ব্যবসা শুরু করেছে।

রহমান কেমিক্যাল নামে কারখানা খুলেছে। এদিকে আমার নতুন চাকরির দায়িত্ব রয়েছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা শুরু করলাম। তাতে যতটুকু বাড়তি টাকা আসে! সেরকম সময় দৈনিক বাংলার মহিলা পাতার সম্পাদিকা সাহিত্যিক মাফরুহা চৌধুরী তাঁর পাতায় আমাকে লেখার সুযোগ করে

বড় ভাই বাবুলের সঙ্গে

দেন। আহমেদ হুমায়ুন উত্তর সম্পাদকীয় লেখার সুযোগ করে দেন। তখন খুব বেশী নারী উত্তর সম্পাদকীয় লিখতো না। অনেক পরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী আমার দুই ¯েœহভাজনের হয়ে তাদের উত্তর সম্পাদকীয় ছাপার অনুরোধ জানালে হুমায়ুন ভাই বলেছিলেন, ‘আপনার লেখা ছেপেই তো কত কথা শুনতে হচ্ছে।’ সেই সময় তাঁর সঙ্গে রফা হয়েছিলো, আমার লেখা কম ছেপে তাদেরও সুযোগ যেন তিনি করে দেন। হুমায়ুন ভাই কথা রেখেছিলেন। সেটা বেশ পরের ঘটনা। এর মধ্যে একদিন দৈনিক দেশ থেকে বোরহান আহমেদ ডেকে বললেন, তাঁদের কাগজের মেয়েদের পাতার দায়িত্ব নিতে।

ততদিনে বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটে ওয়াহাব সাহেব অবসর নিলে তোয়াব খান মহাপরিচালক হয়েছেন। তাঁর অনুমতি চাইতে গেলে তিনি বললেন, ‘তুমি ওদের কাছ থেকে বেতন হিসেবে টাকা নিয়ো না। রেভিনিউ স্ট্যাম্পে সই করে লেখার পারিশ্রমিক হিসেবে নিয়ো।’ বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট একটি আধা সরকারী সংস্থা, আমি অন্য একটি কাগজে খ-কালীন কাজ করছি জানলে আমার চাকরিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে, তাই তোয়াব ভাইয়ের এই পরামর্শ। এভাবেই চালাচ্ছিলাম। হাতে টাকা না থাকলে বড়ভাই বাবুল, যাকে আমরা ভাইবোনরা বাবলিং ডাকি, তাকে ফোন করতাম। ও জানতে চাইতো, ‘কত টাকা হলে তোর এখন চলে যাবে?’ আমি হয়ত বলতাম, তিন শ’ টাকা। এখানে মনে রাখতে হবে সত্তর দশকে তিনশ’ টাকায় মোটামুটি অনেক কিছু পাওয়া যেতো। বাবলিং’এর অফিস ছিলো মতিঝিলের আমিন কোর্টে। ওর নির্দেশ অনুযায়ী সেখানে গিয়ে টাকা নিয়ে আসতাম। ও সবসময় থাকতো না, খামে ভরে অন্য কারো কাছে টাকা রেখে যেতো।

সবসময় খাম খুলে দেখতাম, তিনশ’ চাইলে ও পাঁচশ’ দিয়েছে। বড় চাচাও বলেছিলেন, তিনি আছেন আমার পাশে। তাই ভরসা করে মা আর দুই বোনের দায়িত্ব নিতে পেরেছিলাম। সেইসব দিনগুলোর কথা ভাবলে এখন ভয় হয়, ভাবি কেমন করে পেরেছিলাম বাড়ির বড় সন্তান হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে! মাকে গ্রামে নিয়ে যাবার কয়েক মাস পর ছোট দাদু মারা যান। তখন মা ফরিদপুর শহরের কুঠিবাড়ি কমলাপুর এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে চলে এলো। সোমা স্কুলে ভর্তি হলো। গ্রাম থেকে আমাদের দুই চাচাতো বোন শাহজাদি ও মানু এসে মার সঙ্গে থাকতে থাকলো। আমি মাঝে মাঝে যেতাম। তনু ছুটি হলে যেতো। মাকে টাকা পাঠানোর সমস্যা একটা ছিলো। সেটারও সমাধান হয়ে গেলো। আব্বার মামাতো বোন রোকেয় রহমান কবির, যিনি আমাদের কাছে ছিলেন খুকু ফুফু, তিনি তখন সপ্তগ্রাম নারী পুনর্বাসন নামে এনজিও শুরু করেন। তিনি নিয়মিত ঢাকা-ফরিদপুর যাতায়াত করতেন। আমি তাঁর মতিঝিলের অফিসে গিয়ে টাকা দিয়ে আসতাম আর তিনি মাকে দিয়ে দিতেন। এভাবে জীবন চলছিলো। ভবিষ্যত নিয়ে তখন ভাবিনি। প্রতি মুহূর্তের জন্য বাঁচতাম, লড়াই করে। অনেক মানুষের আশীর্বাদের হাত ছিলো আমার মাথার ওপর। তাই পেরেছিলাম আর আজ তাই ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানাই।

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box