মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

কাজের দুনিয়ার নানা গল্প

আমি বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটে যোগ দিয়েছিলাম পিআইবি প্রতিষ্ঠার বছর খানেক পরে। সেই সময় সেখানে কর্মী সংখ্যা খুব কম ছিলো। মহপরিচালক ছিলেন ওয়াহাব সাহেব, তোয়াব ভাই, লুৎফর ভাই ছাড়াও আরো দু’তিনজন ছিলেন। আমি ছিলাম একমাত্র নারী কর্মী। এখনকার মত এত বড় দালানও ছিলো না। তখন একটা দোতলা বাড়ি ছিলো। ভেতরে বেশ জায়গা ছিলো। সেখানে কিছু সব্জী আর ফুল গাছ লাগানো হয়। গ্যারাজের ওপর ছোট দু’টি ঘর ছিলো। পরে একটা ঘরে লাইব্রেরী করা হয় আর অন্য ঘরে আমি বসতাম। তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে আমি না না জায়গায় ঘুরেছি বই সংগ্রহের জন্য, যেমন ফোর্ড ফাইন্ডেশন ও অন্যান্য বিভিন্ন সংস্থায় গিয়েছি। সাংবাদিকতা সংক্রান্ত বই প্রচুর জোগাড় করেছিলাম আমরা। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা এই লাইব্রেরী ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছিলো বলে আমার মনে হয়। অনেক পরে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে রাখা হয় সাত্তার নামে এক তরুণকে।

ডঃ হারম্যান সান্তাক্রুজ

আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিকে পিআইবিতে যোগ দেয় সীমা মোসলেম আর শাহানা রহমান। সীমকে আগেই চিনতাম, মফিদুল (হক)ভাইয়ের সঙ্গে ওর বিয়েতে আমি উপস্থিত ছিলাম। শাহানার সঙ্গে পিআইবিতে আলাপ; কিন্তু আমাদের তিনজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে যা আজও অটুট আছে। যখন আমি ওখানে একমাত্র নারীকর্মী ছিলাম তখন জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত এবং সিনিয়র আন্তঃআঞ্চলিক উপদেষ্টা ডঃ হারম্যান সান্তাক্রুজ ঢাকা এলেন। তাঁর আদি দেশ চিলি, তবে জাতিসংঘের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। উদ্দেশ্য ছিলো একটি ডেভলপমেন্ট ইনফর্মেশন নেটওয়ার্ক (ডিন) গড়ে তোলা। সরকারের তথ্য দফতর ছাড়াও পিআইবি’র সঙ্গেও তিনি কিছু কাজ করেন। তোয়াব ভাইর নির্দেশে নিরীক্ষা পত্রিকার জন্য তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। কেন যেন তিনি আমাকে খুব পছন্দ করেছিলেন, বলতেন আমি তাঁর ‘গ্র্যান্ড ডটার’। তাঁর সাক্ষাৎকার নেবার ঘটনাটাও বেশ মজার ছিলো। তোয়াব ভাই একদিন বললেন, ‘কাল সকালে তথ্য সচিবের ঘরে তাঁর সভা আছে, সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করে যেমন করে হোক একটি সময় ঠিক করতে হবে।’ আমি গেলাম। তখনও সভা চলছে।

সভা শেষে দরজা খুলে প্রথমেই বেরুলেন প্রিন্সিপাল ইনফর্মেশন অফিসার এনামুল হক। তিনি হাশেম ভাইয়ের বন্ধু, আমাকে ভাল করে চেনেন। জানতে চাইলেন কি ব্যাপার? বললাম আমি ডঃ সান্তাক্রুজের সাক্ষাৎকার নেবার জন্য সময় ঠিক করতে চাই। তিনি বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই। আমরা বিকালে নদীবক্ষে বোট ট্রিপে যাচ্ছি। তুমি চলে এসো। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেবো।’ বিকালে নোট প্যাড-কলম-টেপ রেকর্ডার নিয়ে গেলাম। আমি ধরে নিয়েছিলাম বোট ট্রিপ মানে লঞ্চ ভ্রমণ। নদীর ঘাটে গিয়ে দেখি, একবারে ছইওয়ালা নৌকা। উঠলাম। নৌকার দুলুনির মধ্যে নোট প্যাড আর টেপ রেকর্ডার সামলে সেদিন সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। পরে জেনেছিলাম পিআইবি কয়েকটা ফেলোশীপ পাবে, যেগুলো তাঁর সুপারিশে হবে। আমার একটি ইউনেস্কো ফেলোশীপ তাঁর সুপারিশে হয়েছিলো এবং অন্য দু’জন সহকর্মীর আগে আমারটাই এসেছিলো। পিআইবি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং’এর ব্যবস্থা করতো কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য, একথা আগেই বলেছি। এটা শুধু যে ঢাকায় হতো, তা নয়। ঢাকার বাইরেও হতো। এরকমই একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য আমরা চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে আমি বিমানে গিয়েছিলাম। লুৎফর ভাই আর অন্য কয়েকজন যন্ত্রপাতি নিয়ে গাড়িতে গিয়েছিলেন। কথা ছিলো ফেরার সময় আমি তাঁদের সঙ্গে গাড়িতে ফিরবো। পরে তোয়াব ভাইর স্ত্রী ও দুই কন্যা তানী আর এষাও গিয়েছিলো বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। আমি শ্বশুরবাড়িতেই উঠলাম।

আমার শ্বশুর একটু রক্ষণশীল ছিলেন, মেয়েদের চাকরি করা খুব একটা পছন্দ করতেন না। কিন্তু তাঁর উদারতার পরিচয়ও অনেকবার পেয়েছি। প্রতিদিন প্রশিক্ষণ কোর্সের স্থানে নিয়ে যেতে গাড়ি আসতো আর আমি যদি কোনো কারণে দেরী করতাম, তখন তিনিই বলতেন, ‘তাড়াতাড়ি করো। অফিসের গাড়িকে এতক্ষণ বসিয়ে রাখা ঠিক নয়।’ দায়িত্ববোধ সম্পর্কে তিনি নিজে যেমন সচেতন থাকতেন, সেরকম চাইতেন আমরাও যেনো সেটা মেনে চলি। সেই প্রশিক্ষণ কোর্সে চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা অংশ নিয়েছিলেন। প্রশিক্ষক হিসেবে ঢাকা থেকে কেউ কেউ এসেছিলেন, তার মধ্যে একজন শহীদুল হক, শহীদ ভাই। তিনি তখন বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকার সম্পাদক। আগেই বলেছি,তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। কিছুদিন আগে তাঁর হৃদরোগ হয়েছিলো। প্রশিক্ষণ কোর্সে যে মধ্যাহ্ন ভোজ দেওয়া হতো, তা ছিলো বিরিয়ানী বা মুরগীর টুকরো ভাজা , যা তাঁর জন্য একেবারেই ঠিক ছিলো না। আমি তোয়াব ভাইর অনুমতি নিয়ে তাঁর জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করেছিলাম। তিনি যে সেটা জানতেন, তা আমার জানা ছিলো না।

অনেকদিন পর এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, ‘ও যে কি মেয়ে সেটা তোরা জানিস না। জেম অব উইম্যান।’ শুনে একটু অবাক হয়েছিলাম, আমি যা করেছিলাম, তা অন্য যে কেউ করতো। আজ তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করি। তোয়াব ভাই সকালে যখন বেরুতেন, তখন নাকি উনার মেয়ে এষা প্রায়ই বলতো, ‘তুমি গিয়ে ঊর্মি খালাকে পাঠিয়ে দিও।’ আর তোয়াব ভাই ধমক দিয়ে বলতেন, ‘ঊর্মি খালা এখানে কাজ করতে এসেছে, তোদের সঙ্গে বেড়াতে নয়।’ কিন্তু একদিন তিনি আমাকে ছুটি দিয়েছিলেন। আমি ভাবী ও তানী-এষাকে নিয়ে ফয়’জ লেকে বেড়াতে গিয়েছিলাম। চট্টগ্রামে কোর্স চলাকালে আমি আমার সন্তান আসার বার্তা পেলাম। ভাবলাম এই অবস্থায় আমার সড়কপথে ঢাকা যাওয়া ঠিক হবে না। একটু ইতস্তত: করে তোয়াব ভাইকে বললাম। তিনি কোনো কথা না বলে আমার টিকেটও তাঁর সঙ্গে বিমানে কেটে দিয়েছিলেন। এখন ভাবি কতটা ভাগ্য নিয়ে সাংবাদকতায় যোগ দিয়েছিলাম যে তোয়াব ভাই, হুমায়ুন ভাই, রণেশদা, সন্তোষদা. কামাল লোহানী ভাইয়ের মত মানুষের সান্নিধ্যে যেতে ও উনাদের কাজ শিখতে পেরেছিলাম। আমাদের প্রশিক্ষণ কোর্স শেষে আগ্রাবাদ হোটেলে একটি বড় রিসেপশন হলো। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং যতদূর মনে পড়ে কোনো বড় আমলা এসেছিলেন এবং সবাই ইংরেজীতে ভাষণ দেন। তোয়াব ভাই যখন উঠলেন, তখন তিনি প্রথমেই বললেন, ‘যে মাটিতে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের বাংলা ভাষাতে কথা বলা উচিত।’ এবং তিনি সেটাই করলেন আর অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রাহণকারী ও অন্য সাংবাদিকরা উচ্ছ্বসিত হয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলো।

ছবি:গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box