মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

জীবনের স্মরণীয় ঘটনা

একথা সত্যি, কেউ যদি জানতে চায় আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কি, তাহলে আমি বলবো, আমার একমাত্র সন্তান রূপকের জন্ম। নভেম্বরের এক শীতের রাতে ও জন্ম নিলো ডঃ সুরাইয়া জাবীনের ক্লিনিকে। ওর জন্ম আমার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আনন্দময় ঘটনা। ওকে দেখতে আত্মীয়-অনাত্মীয় অনেক মানুষ এসেছিলেন। অনেকের আশীর্বাদ পেয়েছিলো আমার ছোট্ট ছেলেটা। কিন্তু সেই আনন্দে খানিকটা বিষাদ মিশে গেলো যখন পরদিন সকালে ডঃ সুরাইয়া জাবীন আমাকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে বললেন, আমার পুত্রের ‘ক্লাব ফীট’ রয়েছে। অর্থাৎ পায়ের পাতা পাশাপাশি সামনের দিকে মুখ করা নয়, পরস্পরের দিকে মুখ করা। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।

চাচা ড: মুহাম্মদ ইউনুসের কোলে রূপক

আমার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি নেমে এলো। তিনি আমাকে সান্ত¦না দিয়ে বললেন, অপারেশন করলে সেরে যাবে। পরে জেনেছিলাম, তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় চাচার অধীনে কাজ করেছেন। তিনি প্রথম বড় চাচাকে বলছিলেন, একথা তিনি যেন আমাকে বলেন, বড় চাচা বলেছেন তাঁর পক্ষে এ খবর আমাকে দেওয়া কোনো মতে সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত ডঃ সুরাইয়া জাবিন আমাকে এ খবর দেন এবং জানান কোথায় কোন্ ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এরপর আমার অন্য এক লড়াই শুরু হলো। রূপকের তিনদিন বয়সে ওকে অর্থোপেডিক ড. তালুকদারের চেম্বারে নিয়ে গেলাম। সঙ্গে জাহাঙ্গীর ছাড়াও আমার ফুফাতো বোন মিনু আপা গেলেন। ডাক্তার সব দেখে বললেন, প্রথমে ওর পায়ে তেল মালিশ করতে হবে, পাটা একটু বেঁকিয়ে, সামনের দিকে টেনে। তার দশদিন পর নিয়ে গেলে তিনি প্লাস্টার করে দেবেন। সেটাই করা হলো। দশদিন পর, ওর তেরো দিন বয়স থেকে শুরু হলো প্লাস্টার করা। ওর পা বেঁকিয়ে তিনি প্লাস্টার করেছিলেন, ও খুব কেঁদেছিলো। আমি সেটা দেখতে পারিনি। পাশের ঘরে বসে কেঁদেছিলাম।

ডাক্তার বলেছিলেন, ‘আপনি এত কাঁদছেন কেন? দেখবেন, আপনার ছেলে বড় হয়ে ফুটবল খেলবে।’ তাতে কি মায়ের মন শান্ত হয়? এরপর রূপকের দেড় মাস বয়সে ওর প্রথম দু’পায়ে মেজর অপারেশন হলো ঢাকাস্থ পঙ্গু হাসপাতালে। আবার এক বছর আবার অপারেশন হয়েছিলো। তখনো ঐ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা জার্মাণ সার্জন ড. গার্স্ট ছিলেন। তিনি তখন সার্জারী করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর হাতে তৈরী সার্জনরা যখন অপারেশন করতেন, তিনি উপস্থিত থাকতেন। রূপকের ক্ষেত্রেও সেটা হলো। জাহাঙ্গীর, ওর সব ছোট ভাই মইনু আর আমি গিয়েছিলাম। সার্জারী হয়ে গেলে তাঁরা বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। ওর পায়ে প্লাস্টার ছিলো। বাড়ি যাবার পর রূপকের সেজ জ্যাঠা ড. মুহাম্মদ ইব্রাহিম এসে আমাদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘তুমি একা সামলাতে পারবে না।’ পরে বুঝেছিলাম, কথাটা ঠিক। রূপকের জ্বর এলো। কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো প্লাস্টার ভেদ করে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে। আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম। তখন সবার ঘরে ঘরে টেলিফোন থাকতো না। সেজভাইয়ের ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টারের পাশের বাড়িতে ফিজিক্সের শিক্ষক থাকতেন তাঁর বাড়ি থেকে ডাক্তারকে ফোন করা হলো। তিনি বললেন, প্লাস্টারে ওর রক্তের দাগের চারপাশে পেন্সিল দিয়ে দাগ দিয়ে রাখতে। রক্ত যদি সে দাগ ছাড়িয়ে যায়, তাহলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেটা ঘটেনি। কিন্তু রূপক সারারাত কেঁদেছে আর সেজভাই কোলে করে’ পায়চারী করেছেন।

রূপক

কখনো মইনু কোলে করে’ পায়চারী করে’ ওর কান্না থামিয়েছে। সেজ ভাই বলেছিলেন, ‘তুমি ক্লান্ত। তুমি ঘুমাও।’ আমি আধো ঘুম, আধো জাগরণে রাত কাটিয়েছিলাম। তারপর বেশ কিছুদিন সেজভাইয়ের বাড়িতে ভাই আর ভাবীর যত্নে থাকার পর বাড়ি ফিরেছিলাম। যথা সময়ে রূপককে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে প্লাস্টার কাটিয়ে নতুন প্লাস্টার লাগিয়ে আনতাম। মইনু যেতো সঙ্গে। এভাবে বেশ কিছুদিন প্লাস্টার রাখার পর ওকে ঐ হাসপাতালের ওয়ার্কশপ থেকে লোহার জুতা তৈরী করে পরানো হলো। আমরা ভাবতাম, জুতাটা ভারী। কিন্তু সেটা নিয়েই ও দিব্যি পা দাপাদাপি করতো, খেলতো। ওই লোহার জুতো খোলার পর ওর জন্য বেবী ওয়াকার কেনা হলো। ও হেঁটেছিলো প্রায় দেড় বছর বয়সে। আমার সেদিনের আনন্দের কথা ব্যক্ত করতে পারবো না। ডাক্তারের কথাই সত্যি হয়েছিলো। লন্ডনে যখন স্কুলে যেতো, তখন বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল, টেনিস খেলতো।

লন্ডনে আমাদের জিপি হিসেবে যে ডাক্তার ছিলেন, তিনি একজন চমৎকার ইহুদি মহিলা, ড. ভিভিয়েন ম্যানহাইম। তাঁকে রূপকের পায়ের কথা খুলে বলাতে তিনি সঙ্গে সঙ্গে কাগজ টেনে বললেন, ‘তোমাকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল শিশু হাসপাতালে রেফার করে দিচ্ছি।’ তাঁর চিঠি অনুযায়ী গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসাপাতালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলাম। সেখানে ডাক্তাররা পরীক্ষা করে আমাকে বললেন, ওর সার্জারী কোথায় হয়েছে। আমি যখন জানালাম, বাংলাদেশে। তখন তাঁরা বললেন, ‘দে ডিড অ্যান এক্সেলেন্ট জব।’ শুনে খুব ভাল লেগেছিলো। পরে তাঁরা বলেছিলেন, যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে সেটা ওর ১৬ বছর বয়স হবার আগেই হবে। সেই অনুযায়ী প্রতি বছর ওকে চেক আপের জন্য সেই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত তাঁরা বলেছিলেন, ‘আর কোনো সমস্যা হবে না। তবে তোমার ছেলে কোনো বড় অ্যাথলেট হবে না।’ আমি বলেছিলাম, ‘আমি কোনো বড় অ্যাথলেট চাইও না। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষই চাই।’ সেটাই হয়েছিলো।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box