মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ইউনেস্কো ফেলোশীপে আমেরিকা যাত্রা

আমার মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হবার পর রূপকের অপারেশনের সময় ছুটি বাড়িয়েছিলাম। তোয়াব ভাই একটি শর্তে বাড়তি ছুটির আবেদন মঞ্জুর করেছিলেন যে আমার ইউনেস্কো ফেলোশীপটা এলে আমাকে যেতে হবে, সেটা যখনই হোক না কেন। ঠিক তাই হলো। হঠাৎ করেই ফেলোশীপটা এলো। আমাকে যেতে হবে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে আর সেটা চিঠি হাতে পাবার সপ্তাহ খানেকের মধ্যে। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। প্রচুর কাজ – ভিসার ব্যবস্থা করা, সরকারী অনুমোদন, টিকিট বুক করা ইত্যাদি। আমাকে ছুটোছুটি করতে হলেও কাজগুলো সহজে হলো। তোয়াব ভাই মন্ত্রণালয়ে ফোন করে আমার নো অবজেকশন সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করে দিলেন। সেটা নিয়ে এলাম।

ভিসার জন্যও তিনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিলেন। সেটাও হয়ে গেলো। যদিও সেখানকার অফিসার একটি কথা বলেছিলেন, যাতে আমি কৌতুক অনুভব করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘ইউ আর ভেরী ব্রেভ।’ আমি জানতে চাইলাম কেন তিনি একথা বলছেন? তিনি বললেন, ‘কারণ তুমি একা অতদূর দেশে যাচ্ছো।’ আমি হেসে বলেছিলাম, ‘ফেলোশীপটা শুধু আমাকে দেওয়া হয়েছে, আমার পুরো পরিবারকে নয়।’ তখন তিনি বলেছিলেন, ‘সেটা ঠিক।’ যাহোক। একটা বড় কাজ করতে হলো, মাকে এনে রাখতে হলো, আমি আমার চারমাসের শিশুপুত্রকে রেখে যাচ্ছি। মা এলো ছোটবোন সোমাকে নিয়ে। এরপর আমি গেলাম, টিকেট বুক করতে। যেহেতু সময় কম, আমি খুব সহজ রুট পেলাম না। আমাকে বেশ ঘুরে মিশিগানের ইউনিভার্সিটি শহর ইস্ট ল্যান্সিং’এ পৌঁছতে হবে। আমি চোখের জল ফেলতে ফেলতে প্লেনে উঠলাম, আমার মাত্র চার মাসের বাচ্চাকে রেখে অতদূর দেশে যেতে হচ্ছে। আমার রুটটা ছিলো বিচিত্র। ঢাকা থেকে কলকাতা। সেখানে সারাদিন কাটিয়ে রাতে দিল্লি। সেখান থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট, সেখান থেকে নিউইয়র্ক এবং সবশেষে নিউইয়র্ক থেকে ইস্ট ল্যান্সিং। কলকাতায় বিমানবন্দরের ভেতরে হোটেলে একটি ঘর বুক করে গোসল সেরে খেয়ে ঘুমালাম। তারপর দিল্লিতে কোন সমস্যা হয়নি। ফ্রাঙ্কফুর্ট গিয়ে দিশাহার অবস্থা। বিশাল বিমান বন্দর এবং কেউ ইংরেজী বলে না বা বলতে পারে না কিংবা বলতে চায় না। এদিকে আমাকে তো পরবর্তী ফ্লাইটের গেট খুঁজে বের করতে হবে।

তখন এক ভারতীয় ভদ্রলোক আমার অসহায় চেহারা দেখে এগিয়ে এসে ইংরেজীতে জানতে চাইলেন আমার সমস্যা কি? আমি তাঁকে খুলে বলাতে তিনি আমাকে নিয়ে একটি কাউন্টারে গিয়ে অতি কষ্টে জেনে নিলেন আমার কোন গেট। জেনে তাঁকে খুব আশ্বস্ত দেখালো। তিনি আমাকে এক দক্ষিণ ভারতীয় মহিলার কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘তুমি ওর সঙ্গে যাও। উনিও নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন।’ মহিলা দক্ষিণ ভারতীয় বলেই ইংরেজীতে কথা বলছিলেন। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাঁর সঙ্গে অনেকটা হেঁটে আমাদের গেটে গেলাম। নিউইয়র্কে খুব একটা অসুবিধা হয়নি, সেখানে সবাই ইংরেজী বলে। একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হলো। সে যাবে ল্যান্সিং’এ, ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে। আমাদের একটি গোল মত আলাদা টার্মিনালে যেতে হলো। সেটার নাম প্যান অ্যাম বিল্ডিং। অবশেষে আমি যখন ইস্ট ল্যান্সিং’এ পৌঁছলাম, তখন আমি প্রায় আধ মরা। আমাকে নিতে এসেছিলেন আমার সুপারভাইজার, জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষক। আজ আর তাঁর পদবী মনে নেই। নাম জেন। আমেরিকায় নাম ধরে ডাকার চল ছিলো, তাঁকে ডক্টর অমুক না বলে নাম ধরে ডাকতে বললেন। মধ্যবয়সী চমৎকার সেই মহিলা আমার জন্য গরম কোট নিয়ে এসেছিলেন। সেটা মার্চ মাসের শেষ হলেও মিশিগানে বেশ ঠা-া। তখনো বরফ গলেনি। তিনি আমাকে পোস্ট গ্রাজুয়েট ছাত্রাবাসে পৌঁছে দিয়ে বললেন, পরদিন সকালে জার্নালিজম বিভাগে যেতে। পরে তিনি সবাইকে গল্প করতেন যে, আমি যখন প্লেন থেকে নেমেছিলাম, তখন আমি প্রায় আধ-মরা ছিলাম। যে ডরমিটরি বা ডর্মে আমি ছিলাম, সেখানে ছেলে ও মেয়েরা পাশাপাশি থাকতো। শুধু কমন বাথরুম ছিলো পাশাপাশি দু’টি ঘরের জন্য একটিই।

তবে সেখানে সিঙ্গল সেক্স ছাত্র বা ছাত্রীরা থাকতো। আমার ঘরে দেখলাম একটি সিঙ্গাপুরের মেয়ে আছে। তবে শুনলাম সে কিছুদিন পর চলে যাবে। তার ব্যাপারে আমার অদ্ভূত ও তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো। আমি কোথা থেকে এসেছি জানতে চাইলে আমি বললাম, বাংলাদেশ। সে কখনো বাংলাদেশের নাম শোনেনি বোঝা গেলো। তখন সে জানতে চাইলো, ‘ইজ ইট পার্ট অব নেপাল?’ আমার প্রচ- রাগ হলেও অচেনা মানুষের সঙ্গে তো খারাপ ব্যবহার করা যায় না। তাকে বোঝালাম বাংলাদেশ কোথায়। পরে সে আমাকে আরো অনেক বিরক্তি উৎপাদনকারী প্রশ্ন করেছিলো, যেমন আমাদের দেশে পাকা দালান বা পাকা রাস্তা আছে নাকি অথবা সেখানে সবাই জুতো পায়ে দেয় কিনা। পরে জেনেছিলাম, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি বা সংক্ষেপে এমএসইউ (গঝট)’তে কয়েকজন নেপালী আছে, যার মধ্যে দুইবোন খুবই জনপ্রিয় – যতদূর মনে পড়ে তাদের নাম ছিলো শালিনী ও নলিনী। যাইহোক সিঙ্গাপুরী মেয়েটিকে বেশীদিন সহ্য করতে হলো না। সে কোথায় যেন চলে গেলো। একটি কৃষ্ণাঙ্গী মেয়ে এলো, সে খুব ভাল ছিলো। তবে আমাদের মধ্যে খুব একটা বন্ধুত্ব হয়নি। রুমমেট হিসেবে সে ভাল ছিলো। বন্ধুত্ব হয়েছিলো অন্য কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের কথা পরবর্তীতে বলবো।

ছবি: গুগল

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box