মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

যুক্তরাষ্ট্রে জরুরী সফর

আমার ইউনেস্কো ফেলোশীপে যেসব কাজকর্ম ছিলো, তার মধ্যে কিছু সংবাদপত্র অফিসে সফরও ছিলো। আর সুপারভাইজার জেন সব ব্যবস্থা করে আমার বিমান টিকেট আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমাকে যেতে হবে ওয়াশিংটন ডিসি ও শিকাগো শহরে। জেন থাকার ব্যবস্থার কথা জানতে চাইলে আমি জানিয়েছিলাম ম্যারিল্যান্ড আমার কাজিন থাকে, সেখান থেকে আমি ওয়াশিংটনে যেতে পারবো আর শিকাগোতে বন্ধু আছে। আসলে সেখানে থাকতো পূর্ণিমা, রিনির বন্ধু, যার কথা আগেও লিখেছি। তিনি কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমানের বোন পরে এক লঞ্চ দুর্ঘটনায় পরিবারের আরো দশজন সদস্যের সঙ্গে তাঁর মৃত্যু হয়। পাঠকদের অনেকে হয়তো সেসময় সংবাদপত্রে এই ঘটনার কথা পড়েছেন। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় কিছুদিন পূর্ণিমা আর ওর স্বামী খায়রুল আনাম ভাইয়ের বাড়িতে ছিলাম, যেকথা আগেই লিখেছি। আমাকে রিনি ওয়াশিংটনের বিমান বন্দর থেকে তুলে নিয়ে গেলো। যথা সময়ে আমি একদিন আরো কয়েকজনের সঙ্গে গেলাম ওয়াশিংটন পোস্ট সংবাদপত্র অফিসে। কিভাবে কাজ হয়, কিভাবে কাগজ ছাপা হয়, বিশদে সেসব দেখলাম। তার কিছুদিন আগে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারীর ঘটনা ঘটে গেছে, যা নিয়ে হলিউডে ছবিও তৈরী হয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের তরুণ সাংবাদিক কার্ল বার্নস্টেইন তার অন্যতম নায়ক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বব উডওয়ার্ড। স্বাভাবিকভাবেই আমরা সবাই বার্নস্টেইনকে দেখতে চাইলাম। শুনলাম সেদিন তিনি অফিসে আসেননি। হতাশ হলাম।তবে আমাদেরকে তাঁর ডেস্ক দেখিয়ে দেওয়া হলো। যাহোক, এরপর আমার গন্তব্য ছিলো আমেরিকান প্রেস ইন্সটিটিউট। একদিন ট্রেন ধরে ওয়াশিংটন ডিসিতে নেমে ট্যাক্সি ধরে এয়ারপোর্টের কাছে আমেরিকান প্রেস ইন্সটিটিউটে গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে ডিরেক্টরের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তাঁদের কর্মকা- দেখলাম, কিছু আলোচনা শেষে ফিরে গেলাম। শহরে পৌঁছে ভাবলাম কিছু খেয়ে ট্রেন ধরি। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর ভাবছি কি খাবো, হঠাৎ কে যেন ছুটে এসে আমাকে টেনে ধরলো। এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে কে হতে পারে ভাবতে গিয়ে দেখি টুটুল, আমার এক ফুফুর ভাশুরের ছেলে। ওকে খুব ভাল করে চিনি। ওকে ওখানে দেখে তো অবাক। এই দূরদেশে ওর সঙ্গে এভাবে দেখা হওয়াটা অভাবনীয়। ও একটি ক্যাফেতে বসে ছিলো এক বন্ধুর সঙ্গে। আমিও ওদের সঙ্গে যোগ দিলাম। খাওয়া ও আড্ডা, দু’টোই হলো। সফর শেষে ইস্ট ল্যান্সিং ফিরে কয়েকদিন পর গেলাম শিকাগো। সেখানে পূর্ণিমা আর আনাম ভাই ওদের ছোট্ট মেয়ে সেঁজুতিকে নিয়ে বিমান বন্দর থেকে আমাকে তুলে নিলেন। ওরাও শহরতলীতে থাকে। একদিন যথারীতি ট্রেন ধরে শহরে গিয়ে শিকাগো ট্রিবিউন পত্রিকা অফিসে গেলাম। সেখানেও নির্ধরিত যাওয়া। কিছু আলোচনা শেষে আবার ট্রেন ধরে পূর্ণিমাদের ওখানে ফিরলাম।

শিকাগোতে কাজ শেষ। কিন্তু এতদূর এসে একটু না বেড়িয়ে তো যাওয়া যায় না। পূর্ণিমা আর আনাম ভাইও ছাড়তে রাজী হলেন না। একদিন লেক মিশিগানের পাড়ে গেলাম। সেটাকে ঠিক লেক বা হৃদ মনে হয় না। মনে হয় সমুদ্র। খুব সুন্দর আর বিশাল। আর একদিন গেলাম সিয়ার্স টাওয়ারে। সে সময় সেটা ছিলো বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন, যার নক্সা করেছেন একজন বাংলাদেশী স্থপতি, এফ আর খান। আমার ট্যূর শেষ হলো। কাজ ও বেড়ানো শেষে আবার ফিরে গেলাম মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি বা এমএসইউ’তে।তবে এই ট্যূরে জেনের সঙ্গে আলোচনা, কিছু ক্লাসে গিয়ে বসা আর লাইব্রেরিতে কাজ করা। ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান একজন পূর্ব ইউরোপের মানুষ ছিলেন সে সময়। মধ্যবয়সী। আমার প্রতি তাঁর স্নেহ বর্ষিত হলো। আমাকে প্রচুর সময় দিলেন। আমি ফিরে যাবার আগে একদিন লাঞ্চ খাওয়ালেন। আমার আড়াই মাস শেষ হয়ে এলো। আমার পরবর্তী গন্তব্য ম্যানিলায় অবস্থিত প্রেস ফাউন্ডেশন অব এশিয়া বা পিএফএ। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খানিকটা না বেড়িয়ে তো চলে যাওয়া সম্ভব নয়। তল্পি-তল্পা গুটিয়ে, সবার কাছে বিদায় নিয়ে রিনির কাছে চলে গেলাম। জেন আমাকে বিদায় দেবার সময় বললেন, ‘এসো তোমাকে একটি বেয়ার হাগ (ইবধৎ ঐঁম) দিই,’ বলে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমরা আবেগপ্রবণ জাতি। আমার চোখ বিছল ছল করে উঠলো। আমাকে রোহন, কৈলাশ, গৌতমরা এয়ারপোর্টে ছাড়তে এলো। ওদের সবাইকে ছেড়ে যেতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো। কিন্তু রিনির কাছে পৌঁছে সব ভুলেও গেলাম।

ছবি:গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box