মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঘুরে বেড়ানো আমেরিকা…

রিনির বাড়িতে পৌছে হাল্কা মনে আড্ডা, খাওয়া, ছোট্ট পলার সঙ্গে সময় কাটিয়ে ভালোই লাগছিলো। রিনি আর হাফিজ দুলাভাই আগে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন আমাকে নিয়ে একটু বেড়াবেন। অনেকদিনের সাধ ছিলো নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখবো। সেখানেই প্রথমে গেলাম। পথটা একটু লম্বা ছিলো। সেখানে পৌঁছে পথের ক্লান্তি ভুলে গেলাম। কী অসাধারন দৃশ্য। অঝোরে ঝরে চলেছে নায়াগ্রার প্রপাত, অজ¯্র ফেনিল জলরাশিতে সূর্যের আলো পড়ে রঙধনু ফুটে উঠছে। নিচে গহ্বরে মেইড অব দি মিস্ট নামে ছোট্ট লঞ্চ পর্যটকদের নিয়ে ঘুরছে। প্রপাতের পাদদেশের কাছাকাছি যাচ্ছে। দুলাভাই রাজী না হওয়াতে আমাদের সেটায় চড়া হলো না। তবে পাড়ে দাঁড়িয়ে যা দেখলাম তাতেই মন ভরে গেলো। আমরা আমেরিকান সাইডে একটা মোটেলে রাতে থাকলাম। পরদিন সীমারেখা পেরিয়ে কানাডার দিকে যাবার কথা। আমি একটু দ্বিধান্বিত ছিলাম। আমার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা থাকলেও কানাডার ভিসা নেই। দুলাভাই বললেন, ‘চলো না, বর্ডারে গিয়ে দেখা যাক।’ উল্লেখ্য, এই জলপ্রপাতটি দু’টি দেশের সীমান্তে অবস্থিত।

আমরা সীমান্তে গিয়ে হাজির হলাম। রিনি বললো, ‘তুই আগে যা। তোকে ঢুকতে না দিলে আমরা ফিরে যাবো।’ আমি সীমান্তের অফিসারের কাছে গিয়ে অনেক দ্বিধা নিয়ে আমার পাসপোর্ট এগিয়ে দিলাম। লোকটি উল্টে পাল্টে দেখে একগালে হেসে বললো, ‘সো ইউ আর এ জার্নালিস্ট?’ আমার পাসপোর্টটি জার্নালিস্ট পাসপোর্ট ছিলো। আমি মাথা নাড়লাম। সে ছাপ মেরে বললো, ‘ইউ ক্যান গো।’ পরে বহুবার বহু দেশে গিয়েছি, কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে সব জায়গায় সম্মান পাইনি, বরং কোথাও কোথাও ঝামেলায় পড়েছি। তাই এ ঘটনাটা আজ এত বছর পরও মনে আছে। কানাডার দিকে গিয়ে দেখি, জলপ্রপাত দু’দেশের মাঝখানে থাকলেও আমেরিকার দিক থেকে বেশী অংশ ও সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। তবে কানাডার দিকে পানিটা যেখান থেকে পড়ছে, সে জায়গাটা দর্শকদের দেখার জন্য ঘিরে রাখায় এত কাছে আছে যে মনে হবে, হাত বাড়ালেই পানি ছোঁয়া যাবে। যাহোক, সেই প্রথম আমার নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখা। এর পরে আরো একাধিকবার গিয়েছি। তবে প্রথম দেখার মর্মই আলাদা।

আমরা পরদিন নায়াগ্রা থেকে বেরিয়ে নিউ ইয়র্কের পথে যাত্রা করলাম। দুলাভাইর নিউ ইয়র্ক শহর বেশী পছন্দ না, তাই আমরা নিউ ইয়র্ক ঢুকে সেখানে কোনো হোটেল-মোটেল না খুঁজে, ঢোকার আগে পথে একটি মোটেলে রাত কাটালাম। পরদিন নিউ ইয়র্ক গিয়ে সারদিন দ্রষ্টব্য সবই দেখলাম – এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, টুইন টাওয়ার (১৯৮০ সালে সেটা বহাল তবিয়তে দণ্ডায়মান ছিলো), স্ট্যাটেন আইল্যান্ড, স্ট্যাচু অব লিবার্টি তবে আর কি কি দেখেছিলাম, এতদিন পর সব মনে নেই। সেখান থেকে আমরা সন্ধ্যার মুখে ফিলাডেলফিয়া যাত্রা করালাম। সেখানে উচ্চশিক্ষারত রিনির খালাতো বোন, জারিন হুদা বা চাঁপা আছে। আমরা সবাই (রিনিরা, চাঁপারা আর আমরা) বলতে গেলে এক সঙ্গে বড় হয়েছি। তাই আমাদের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ, আপন ভাইবোনের মত। আমরা ফিলাডেলফিয়া শহর ঘুরলাম। পুরনো শহর বলে আমার খুব ভাল লেগেছিলো। লিবার্টি বেল দেখলাম। তাতে একটি ফাটলের দাগ আছে। শুনলাম সেটা বিখ্যাত ফাটল।

স্বাধীনতার প্রতীক এই ঘন্টাটি যুক্তরাজ্য থেকে তৈরী হয়ে আসে। কিন্তু সেটার ধাতু এত ভঙ্গুর ছিলো যে, সেটা যখন ১৭৫২ সালে ফিলাডেলফিয়া এসে পৌঁছায়, তখন প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে এটি বাজাতে গিয়ে এই ফাটলটি সৃষ্টি হয়। এটিকে আরো দু’বার ঢালাই করা হয়। শেষবার ৭০ শতাংশ তামা, ২৫ শতাংশ টিন আর সামান্য কিছু অন্যান্য ধাতু মিশিয়ে করা হয়। এই ঘন্টা শেষবার বেজেছিলো ১৮৪৬ সালে। আগে এই ঘন্টাধ্বণি শুনে আইনসভার সদস্যরা সভায় আসতেন। এটা বাজিয়ে জনগণকে জনসভার জন্যও ডাকা হতো। ১৭৭৬ সালের ৮ই জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের সময়ও এই লিবার্টি বেল বেজেছিলো। সেটা দেখে খুব ভালো লেগেছিলো। ঐতিহাসিক যে কোনো কিছু আমাকে সবসময় টানে।

চাঁপার ছোট্ট ফ্ল্যাটে আমাকে আর পলাকে রেখে রিনি আর দুলাভাই চলে গেলেন। পলা সম্ভবতঃ সেই প্রথম মাকে ছেড়ে ছিলো। কিন্তু ও দুই খালার সান্নিধ্যে ঠিকই ছিলো। পরদিন আমাদের দু’জনকে ঘোরালো চাঁপা, এটা-সেটা দেখালো। তারপর আমাদের দু’জনকে বাসে তুলে দিলো। আমরা ফিরে গেলাম ম্যারিল্যান্ডে রিনির বাড়িতে। আমার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর সমাপ্ত হলো। এরপর আমাকে আমার ইউনেস্কো ফেলোশীপের শেষ ভাগটি সমাপ্ত করার জন্য ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার উদ্দেশে যাত্রা করতে হলো।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box