মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

বিচিত্রার সঙ্গে যোগাযোগ

কলাবাগানে আমার প্রতিবেশীদের কথা একটু বলি। তিনটি পরিবার ছিলো, বাঙালি ও রুশ মিশ্রিত দম্পতি। স্বামীরা বাংলাদেশী আর স্ত্রীরা রুশ। চমৎকার তিন তরুণী। আমার ঠিক পাশেই থাকতো রতন আর আনিয়া সঙ্গে ওদেও শিশুপুত্র তাপস। রতনের বড়ভাই মাণিকভাই আমাদের বন্ধু ছিলেন। তাপস ছিলো আমার পুত্র রূপকের খেলার সাথী। অন্য দু’টি ফ্ল্যাটের একটিতে ছিলো মোহাম্মদ আলি আর ওর স্ত্রী তামারা। অন্য ফ্ল্যাটের দম্পতি নাম ভুলে গেছি। ওদের সঙ্গে আমার গভীর সখ্য হয়েছিলো। মেয়েগুলো আমাকে খুব ভালবাসতো। একবার আমার তীব্র মাথা ব্যথা শুরু হলো আর সেটা প্রায় তিনদিন স্থায়ী হলো। তখন আমার মাইগ্রেইন ছিলো। আমি ঘর অন্ধকার করে শুয়ে ছিলাম।

আনিয়া ,তাপস,রূপক আর লেখক

আনিয়া এসে ওর দেশ থেকে আনা একটি ওষুধ দিয়ে গেলো, যা খেয়ে আমার মাথা ব্যথা ম্যাজিকের মত সেরে গেলো। ও আমার সঙ্গে কাঁচা বাজারে যেতো আর বাজারে যেতে খুব ভালবাসতো। পরে একদিন বলেছিলো, ওদের দেশে এমন টাটকা শাক-সব্জী-মাছ পাওয়া যায় না। ও আর তামারা আমার কাছে বাংলা পড়তো। তামারা বলতো, ‘আমি বাংলা শিখে একদিন তোমার বই পড়বো।’ আমি ওদের নানা কিছু রেঁধে খাওয়াতাম। ওরা তিনজন মিলে ঠিক করলো ওদের দেশের খাবার আমাদের খাওয়াবে। সারাদিন খেটে মেয়েগুলো রান্না করলো। কিন্তু আমাদের মশলা-খাওয়া জিভে সে খাবার বড্ড নিরস লেগেছিলো। সেটা অবশ্য ওদের বলিনি। অনেক পরে লন্ডনে তামারার সঙ্গে যোগাযোগ হলে ও আমাকে বলেছিলো, তখন ও বেশ ভাল বাংলা পড়তে পারে আর আমার লেখা বইও পড়েছে।

লন্ডনে আমি এক সময় যে কাউন্সিলে কাজ করতাম, তামারা সেখানে বাংলা ও রুশ ভাষায় দোভাষীর কাজ করতো। ওর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তখন ও একক মা হিসেবে মেয়েদের মানুষ করছে। আনিয়া আর রতন আমেরিকায় চলে গিয়েছিলো। পরে রতন মারা যায়। আমি আমেরিকা গেলে আনিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিলো। আর দেখা হয়নি। তবে ওদেও কথা খুব মনে পড়ে। সে সময় আমি দৈনিক বাংলা লিখছিলাম ও আর দৈনিক দেশে খ-কালীন কাজ করছিলাম। এরপর সাপ্তাহিক বিচিত্রার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। বিচিত্রার সঙ্গে আসলে বেশ আগেই সামান্য যোগাযোগ হয়েছিলো, যখন কবি ফজল শাহাবুদ্দিন সম্পাদক ছিলেন। আমার স্কুলের সহপাঠিনী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আজমিরী ওয়ারেস সেখানে কাজ করতো। আমি মাঝে মাঝে ওর কাছে যেতাম। ফজল ভাইর সঙ্গে তখন আলাপ, তবে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে আরো পরে।

আজমিরী বা মীরু আর ফজল ভাইর মধ্যে প্রেম ও তার পরবর্তীতে বিয়ে হলো। বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও ওরা খুব সুখী ছিলো। অনেক পরে আমি বিচিত্রায় ঢুকি শাহাদত ভাইর অনুরোধে খ-কালীন কাজ করার জন্য। সেখানে আমার কিছু বন্ধু ছিলো – শাহরিয়ার কবির, চিন্ময় মুৎসুদ্দি, মাহফুজউল্লাহ। আমি প্রথমে এটা-সেটা লিখতাম। তারপর শাহাদত ভাই টেলিভিশন পর্যালোচনা লিখতে বললেন। সেই কলামটা আচমকা খুব জনপ্রিয় হয়ে গেলো, যদিও আমি টেলিভিশন কর্মী ও কিছু কিছু সংবাদ পাঠক ও প্রযোজকের অপ্রিয় হয়ে উঠলাম। আমি যখন যা দেখতাম, সেটা সম্পর্কে নোট লিখে রেখে সপ্তাহান্তে লিখতাম। কারো প্রতি বিরাগ বা ভালবাসা থেকে কখনো লিখিনি। তবে একটু নির্মম ছিলাম স্বীকার করছি আর সেটার প্রয়োজন ছিলো। সে সময়ের বেশ কিছু ঘটনা বেশ কৌতুকবহ। একবার আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে সেনা বাহিনীর একজন উর্ধ্বতন অফিসারের দেখা হলে তিনি আমার লেখার প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘এটা নিশ্চয় কোনো পুরুষের লেখা, নারীর নাম নিয়ে লিখছেন।’ নারীর লেখা হতে পারে না বলেই হয়ত তাঁদের ধারণা ছিলো।

আমার সহকর্মী হেসে বলেছিলেন, ‘না তিনি একজন নারী।’ ঊর্মি রাহমান নামে একজন সংবাদ পাঠিকা ছিলেন, যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনি বিচিত্রায় চিঠি লিখলেন যে, আমি যেন আমার নাম বদলে রাখি, কারণ আমার লেখার কারণে তাঁর অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু বিচিত্রা টিম উনার কথা রাখেননি। একজন সিনিয়র প্রযোজক তাঁর নাটকের সমালোচনা করায় অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে আমাকে ‘স্কিৎজোফ্রেনিক’ বলেছিলেন। পরে তিনি আমার ‘বংশ পরিচয়’ আবিষ্কার করে আমাকে ডেকে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তখন আমার ফুফাতো ভাই সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেমকে সবাই এক ডাকে চিনতো। তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, আমলা, লেখক, রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রী । এই প্রসঙ্গে আর একটি মজার ঘটনা হলো, বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্ঠিত ও সুগায়ক অনেক বছর পর বিবিসি’তে একটি দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠান করার জন্য দুই বাংলার অন্য শিল্পীদের সঙ্গে লন্ডন যান।

আমি তখন সেখানে কর্মরত। তাঁর সঙ্গে দেখা হতে তিনি বললেন, একবার তাঁর একটি গানের অনুষ্ঠানের সমালোচনা করেছিলাম। তিনি খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। পরে আবার একবার তিনি ‘শান্ত নদীটি/পটে আঁকা ছবিটি’ গাইবার পর খুব প্রশংসা করেছিলাম, তখন মন ভাল হয়। তাঁকে বলেছিলাম, ‘আমি যখন যা দেখতাম, সেই মুহুর্তের ওপর ভিত্তি করেই লিখতাম। কারো প্রতি বিদ্বেষবশত: কখনো কিছু লিখিনি। তিনি স্বীকার করেন, পরে তিনি সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। বিচিত্রার আরো গল্প আছে, যা আগামীতে বলবো।

ছবি: লেখক আর গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]la.com


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box