মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়। 

খুলনার স্মৃতির বাক্স

আমার জন্ম খুলনায়। আমার মায়ের বাড়িও সেখানে, মানে আমার নানাবাড়ি। জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে সেখানে। শুনেছি শৈশবে আমার ডিপথেরিয়া হয়েছিল। বাঁচার আশা ছিলো না। আব্বা তখন অন্য কোন শহরে কাজে গিয়েছিলেন। খবর যখন পেলেন, তখন ডাক্তার বলেছেন, ২৪ ঘন্টা না কাটলে বলা যাবে না, আমি বাঁচবো কি বাঁচবো না। আব্বা খুব ভোরে এসে পৌঁছে বারান্দায় চুপ করে বসে ছিলেন। ভেবেছিলেন আমি বেঁচে নেই। বড়মামা দেখে আব্বাকে ভেতরে নিয়ে যান। বলাবাহুল্য আমি বেঁচে গিয়েছিলাম। আব্বার শৈশবে আমার দাদী মারা যান। তারপর ফুফু আব্বাকে তাঁর কাছে নিয়ে যান। তার কিছুদিন পর আমার আব্বা ও তাঁর শিশুপুত্র হাশেমকে (সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেম) রেখে তিনিও মারা যান। তারপর আমার দাদু ছেলে ও নাতিকে তাঁর কাছে রেখে মানুষ করেন। তাই আমি যখন জন্মালাম, তখন থেকে আব্বা যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন প্রচুর আদর পেয়েছি। আমার আর দুই বোন তনু , সোমাও পেয়েছে। তবে আমি যতটা পেয়েছি, ততটা হয়তো পায়নি। ওরা অনেক পরে এসেছে। ছোটবেলায় আমি ছিলাম আব্বার চোখের মণি, বড় হবার পর বন্ধু হয়ে উঠি।
জন্মের পর খুব ছোটবেলা আমার খুলনায় থাকতাম। খুলনা শহরটা সে সময় অন্য রকম ছিলো। আমি বলছি পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকের কথা। আমাদের এক দাদু ছিলেন, নেয়ামত দাদু। অকৃতদার। কোন এক দাদীর, অর্থাৎ আব্বার চাচীর ভাই হতেন। খুলনায় তাঁর একটা সুন্দর দোতলা বাড়ি ছিলো। সেটা ছিলো একাধিক রাস্তার মোড়ের ঠিক ওপরে অবস্থিত। সেই মোড়ের নামটা ভারী সুন্দর – পঞ্চবীথির মোড়। নেয়ামত দাদু একাই থাকতেন। কখনো কখনো আমরা। আব্বার সবচেয়ে ছোট ও সবচেয়ে আদরের বোন বুড়ি ফুফু এসে থাকতেন। সে সময়ের বাড়িগুলো যেমন হতো, উঁচু ছাদ, বড় বড় জানালা। সেই জানালায় সারাদিন বসে নিচে রাস্তা দেখতাম। তখন গাড়ি খুব কম ছিলো। রাস্তা দিয়ে রিক্সা, সাইকেল আর পথচারীদেরই চলাচল করতে দেখা যেতো। খুব ছিমছাম শহর ছিলো খুলনা। এক সময় আমরা আলাদা একটা বাড়িতে থাকতাম বলে মনে পড়ে। আমাদের একটা পোষা হরিণ ছিলো। একবার আমরা ঢাকা গিয়েছিলাম। পোষা হরিণটাকে প্রতিবেশীর কাছে রেখে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি হরিণসহ প্রতিবেশী উধাও।
খুলনায় আমাদের কিছু ঘনিষ্ঠ পরিবার ছিলো। তাঁদের সঙ্গে আত্মীয়তা ছিলো কিনা জানি না। কিন্তু তখন জানতাম, তাঁরা আমাদের আত্মীয়। এক পরিবারে দুই বোন ছিলেন – ঝর্ণা আর মীরা। আমি তাঁদের ফুফু ডাকতাম। তাঁরা খুব ভাল নাচতেন। আমার মেজমামার বিয়েতে নানাবাড়ি মোল্লারহাটের গ্রামে তাঁরা গিয়েছিলেন। সেই বিয়েতে প্রচুর আনন্দ হয়েছিলো। আমাদের একটা গ্রামোফোন ছিলো। বিয়ের সময় সেখানে হেমন্ত মুখাপাধ্যায়ের ‘‘পাল্কী চলে’’ গানটা বাজানো হয়েছিলো। আর গ্রাম বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঝর্ণা ফুফু আর মীরা ফুফুর নাচ দেখতাম। সেই বিয়েতে বাড়িতে ভিয়েন বসেছিলো। মুগ্ধ চোখে জিলাপী বানানো দেখেছিলাম। মামীকে নিয়ে যখন পাল্কী এসে পৌঁছেছিলো, তখনো ঐ গানটা বাজছিলো। বকশিশ না পাওয়া পর্যন্ত পাল্কীর বেহারারা মামীকে নামায়নি। গানটাও বেজে চলেছিলো।
খুলনায় আর একটি পরিবার ছিলো। সেই বাড়ির মেয়ে রানু আপা, তাঁর ভাই খোকন ভাইয়া আর তাঁদের অন্য ভাইরা আব্বাকে ‘মামা’ ডাকতেন। পরিণত বয়সে যখন খুলনা গিয়ে কলেজে পড়লাম, তখন রানু আপা অর্থাৎ আনোয়ারা বেগম অধ্যক্ষা ছিলেন। আমি বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিলাম আর ছাত্র রাজনীতিতে খুবই জড়িত ছিলাম। রানু আপার অনুপ্রেরণায়/অনুরোধে বাংলা সাহিত্য নিয়ে অনার্সে ভর্তি হই। সেটা আমার জীবনের অন্যতম সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো। খোকন ভাইর আসল নাম তরিকুল আলম। তিনি সাহিত্যিক ছিলেন। চমৎকার ডিটেকটিভ উপন্যাস লিখেছিলেন। খুলনা শহরে চমৎকার চিকেন টিক্কা পাওয়া যেতো। বড় হয়ে দেশবিদেশ ঘুরেও অত ভালো চিকেন টিক্কা খাইনি। মিষ্টিও খুব ভালো ছিলো খুলনার। এখনকার মত তখন এত নানা রকমের খাবার পাওয়া যেতো না ঠিকই। যা ছিলো, তাই আমাদেরআনন্দ দেবার জন্য যথেষ্ট ছিলো।
ছিমছাম শহর খুলনার প্রকৃতি, শহরের মাঠ, পথ, নীলা নামের সিনেমা হল(যার নাম পরে হয়েছিল পিকচার প্যালেস), ঐতিহ্যবাহী জেলা স্কুল, বহমান রূপসা নদী, এ সমস্তই ছিলো আমার শৈশবের আনন্দের অংশ। আজ এত বছর পর আর অনেক দেশ ঘোরার পরও খুলনার প্রতি আমার একটা মমত্বময় ভালবাসা রয়ে গেছে।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]