মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

বিচিত্রায় প্রচ্ছদ কাহিনী লেখার অভিজ্ঞতা
বিচিত্রায় প্রচ্ছদ কাহিনী করেছিলাম কয়েকটি। তার মধ্যে দু’টির কথা বিশেষভাবে মনে আছে। তার দু’টি কারণ- এক, দু’টি আমার পছন্দের বরং বলা যায় প্রাণের বিষয় ছিলো – নারী নির্যাতন এবং বন উজাড় হওয়া। প্রথমটির শিরোনাম ছিলো ‘ক্রমবর্দ্ধমান ভায়োলেন্সের শিকার বাংলাদেশের নারী’ আর দ্বিতীয়টির শিরোনাম দিয়েছিলাম ‘পাতায় পাতায় সুরের নাচন হারিয়ে গেছে’। আমার আগ্রহের কারণ প্রথমতঃ একজন সচেতন নারী হিসেবে নারী সমাজের বেদনা আমাকে স্পর্শ করতো। আমি নিজেও একটা সময় একক মা হিসেবে লড়াই করেছি। দ্বিতীয়টির কথা বলতে গেলে নিজের জীবনের ফেলে আসা সময়ের কথা বলতে হয়। আমার শৈশবের বেশ অনেকটা অংশ কেটেছে বনে – ফরেস্ট অফিসার বাবার সঙ্গে, প্রথমে সুন্দরবনে, তারপর পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ গভীর অরণ্যে। আবার কৈশোর-তারুণ্যে বার বার সুন্দরবনের কাছে ফিরে গেছি। তখন বাবা খুলনা নিউজপ্রিন্টের ফরেস্ট ম্যানেজার। নারী নির্যাতন নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী যে সংখ্যায় ছিলো, তার প্রতিটি কপি নাকি বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো। সেটা বলেছিলো বিচিত্রার সহকর্মীরা। সেই সময় আমার ফুফাতো ভাই সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেম তথ্যমন্ত্রী।

লুৎফুল হক

একদিন হাশেমভাই ফোন করে জানালো আমাকে ধর্মমন্ত্রী ডেকে পাঠিয়েছেন। সেটা এরশাদ সরকারের আমল। আমি প্রথমে গেলাম বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত ভাইয়ের কাছে। তিনি শুনে বললেন, ‘তুমি যাও।  যদি ভাল কথা বলেন, তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এসো। যদি অন্য রকম কিছু বলেন, তাহলে বলো, আপনি সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলুন।’ আমি প্রথম হাশেমভাইর দফতরে গেলাম। হাশেমভাই বললো, ‘জেনারেল এরশাদ এই কভার স্টোরি পছন্দ করে ধর্মমন্ত্রীকে তোর সঙ্গে কথা বলে নারীদের ব্যাপারে আইন বদলাতে বলেছেন। তুই যা তাঁর দফতরে, আমি ফোন করে দিচ্ছি।’ গেলাম। ধর্মমন্ত্রী একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, ‘আপনার যে কি সব লেখেন। আমি শরীয়ত আইন বদলাই কি করে?’ আমি বললাম, ‘আইন কিভাবে বদলাবেন, সেটা তো আপনার জানার কথা। আমরা আমাদের দেশের নারীর সমস্যা, সংকট ও তাঁদের বিরুদ্ধে হওয়া অবিচারের কথাই শুধু তুলে ধরেছি।’ শাসকদের নানা রকম এজেন্ডা থাকে। নারীর প্রতি পক্ষপাত দেখানো এরশাদ সাহেবের এরকমই একটি এজেন্ডা ছিলো। অপর প্রচ্ছদ কাহিনী করার সময় আমি সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করেছি। যাঁদের সাক্ষাৎকার নেবার কথা নিয়েছি। চট্টগ্রামের ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটে গিয়ে কথা বলেছি। তবে একটা জায়গায় আটকে গেছি।

আমার করা প্রচ্ছদ কাহিনী

বনবিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক বা চীফ কনজারভেটর কিছুতেই দেখা করতে রাজী হচ্ছিলেন না। আবার শাহাদত ভাইয়ের শরণাপন্ন হলাম। তিনি খ্যাতনামা কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র সঙ্গে ফোনে কথা বলে আমাকে ফোনটা ধরিয়ে দিলেন। কবি তখন কৃষি মন্ত্রী এবং আমাদের সবার কাছে ‘সেন্টু ভাই’। তিনি বললেন, ‘কাল সকাল ১০টায় আমার অফিসে চলে এসো। আমি পাস দিয়ে রাখবো।’ পরদিন সকালে গেলাম সচিবালয়ে সেন্টু ভাইয়ের কক্ষে। গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন বসা। সেন্টু ভাই আমাদেও বসতে বললেন। তারপর তাঁদের একজনকে বললেন, ‘ও বিচিত্রার পক্ষ থেকে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। আপনারা ঐ সোফায় বসে কথা বলে নিন।’ চীফ কনজারভেটরের আর কোনো উপায় ছিলো না। তিনি বাধ্য হয়েছিলেন আমাকে সাক্ষাৎকার দিতে। এ দু’টি ঘটনা সবসময় মনে থাকবে। সম্পাদক হিসেবে শাহাদত ভাইয়ের ভূমিকার কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বিচিত্রা তখন প্রতি বছর বর্ষপত্র বের করতো আর আমরা সকলে সেজন্য প্রচুর খাটতাম। সার্বক্ষণিক কর্মীদের তুলনায় আমাদের কাটুনি কমই ছিলো। কিন্তু গোটা ব্যাপারটায় প্রচুর আনন্দ পেতাম।

নাফা ভাই বাংলাদেশ টাইমস’এ ছিলেন আর বিচিত্রায় খ-কালীন কাজ করতেন। সব সময় হন্তদস্ত হয়ে ঢুকতেন। মনে আছে বর্ষপত্রের কাজের সময় দুপুরে সেরকম হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে আমাকে বললেন, ‘লাঞ্চ খেয়েছো?’ আমি খাইনি বলাতে বললেন, ‘চলো।’ আমি তাঁর মোটরবাইকে চড়ে প্রেস ক্লাবে গিয়ে তাঁর খরচে খেয়ে আবার বিচিত্রায় ফিরে কাজে বসতাম। দলটা খুব একটা ছোট ছিলো না। সার্বক্ষণিক কর্মীদের সঙ্গে আমরা খ-কালীন ও মাঝে মধ্যে যারা লিখতো, তাদের অনেকেও ছিলো। এই প্রসঙ্গে শিল্পী লুৎফুল হকের কথা মনে পড়লো। খুব হাসতো হা হা করে। কিছুদিন আগে সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। তাকে কখনো ভুলবো না। কিন্তু সে সময় আমরা সবাই বন্ধু ছিলাম। একসঙ্গে কাজ, আড্ডা সবই চলতো। সে বড় আনন্দের সময় ছিলো।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box