মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

জীবিকার পরিবর্তন

বিচিত্রার সময়ের কথা অনেক আছে। শুধু আর একটি প্রসঙ্গ দিয়ে সেই সময়ের কথা শেষ করি। শাহাদত ভাইদের হাটখোলার বাড়ির কথা মনে পড়ে। শুনেছি সে বাড়িটা এখন আর নেই। এক সময় অনেক আনন্দের মুহূর্ত কেটেছে ঐ বাড়িতে, সেলিনা ভাবীর আতিথ্যে, সবার সঙ্গে। বর্ষপত্রের প্রথম সভা সেখানেই হতো। তবে সবচেয়ে আনন্দঘন অনুষ্ঠান ছিলো ইংরেজি নববর্ষের পার্টি, যা হতো নিউ ইয়র্স ইভ বা ৩১শে ডিসেম্বরে। সেখানে আমরা সবাই তো থাকতামই, আরো থাকতেন অনেক বিশিষ্ট্য অতিথি, তার মধ্যে দু’একজন মন্ত্রীও। আড্ডা, খাওয়া, নাচ – সবই হতো। একবার বেশ মজা হয়েছিলো। খাবারগুলো সাজানো থাকতো একটা ঘরে। নাচ হচ্ছে, তারই এক পাশে। আমার খুব খাবার ইচ্ছা, কিন্তু ঐ ঘরে ঢুকতে ভয় পাচ্ছি। আমি নাচতে জানি না। কিন্তু ঢুকলেই কেউ না কেউ হয়তো হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবে। আমি নবী ভাইর (শিল্পী রফিকুন্নবী বা রনবী) কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কেউ এসে আমাকে ডাকলেই নবী ভাই বলছিলেন, ‘ওকে টেনো না। ও নাচবে না।’ কার সঙ্গে যেন কথা বলছিলাম, হঠাৎ তাকিয়ে দেখি নবী ভাই নেই।

খানিক পরে তিনি ফিরে এলেন প্লেট ভর্তি খাবার নিয়ে। আমি বললাম, ‘আপনি কি করে খাবার আনলেন।’ নবী ভাই বললেন, ‘কেন? নাচতে নাচতে গেলাম আর খাবার নিয়ে আবার নাচতে নাচতে ফিরে এলাম। তুমিও তাই করো।’ নবী ভাই এমনই মজার মানুষ। যাহোক। প্রেস ইন্সটিটিউটে কাজ ঠিকমত চলছিলো। এমন সময় বড় ধরনের একটা পরিবর্তন এলো। সরকার সিদ্ধান্ত নিলো তোয়াব ভাইকে সরকারের প্রেস ইনফর্মেশন ডিপার্টমেন্টের প্রধান অর্থাৎ প্রিন্সিপাল ইনফর্মেশন অফিসার করা হবে এবং পিআইবি’তে তাঁর জায়গায় আসবেন এবিএম মুসা। তাঁকে আমি চাচা ডাকতাম। শৈশবে আমরা প্রতিবেশী ছিলাম। তাঁর স্ত্রী সিতারা চাচীর সঙ্গে মায়ের সখ্য ছিলো। মুসা চাচা এলেন আর তোয়াব ভাই চলে গেলেন। আমাদের কয়েকজনের খুব মন খারাপ হলো। এটা হয়, কোন একজনের সঙ্গে দীর্ঘ কাজ করা বা কাজ শেখার পর তিনি চলে গেলে খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক। কিন্তু কারো তো কিছু করার ছিলো না। পিআইবি’র কাজ মন দিয়েই করছিলাম। আমি মাঝে মাঝে তোয়াব ভাইর কাছে যেতাম নিছক আড্ডা মারার লোভে।

রফিকুন নবী

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী

আমি কিছুদিন না গেলে তিনি ফোন করে জানতে চাইতেন আমি কেন বেশ কিছুদিন যাইনি। এরকম একদিন আমি তাঁর কক্ষে বসে আছি। একজন ইনফর্মেশন অফিসার এলেন কিছু কাজ নিয়ে। তোয়াব ভাই জানতে চাইলেন যে ইনফর্মেশন অফিসারকে প্রোটোকল ডিউটি দেওয়া হয়েছিলো, তিনি কেন যাননি। উপস্থিত ইনফর্মেশন অফিসার বললেন, ‘স্যার, আফটার অল তিনি তো মহিলা…।’ ভদ্রলোক বোধহয় আরো কোন অজুহাত দেখাতে যাচ্ছিলেন, তোয়াব ভাই প্রচন্ড রেগে গিয়ে আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘ও মহিলা না? ওকে আমি যখন যেখানে যেতে বলেছি, ও কোন অজুহাত না দেখিয়ে সেখানে গেছে।’ আমি খুব বিব্রত বোধ করলাম। যতই হোক, আমি একজন বাইরের লোক। এর কিছুদিনের মধ্যেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্ণধার ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী একদিন আমার বাড়িতে এলেন। বিচিত্রা, বিশেষ করে শাহাদত ভাইয়ের সূত্রে তাঁর সঙ্গে আলাপ। তিনি আমাকে তাঁর প্রচারনা শাখার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হবার প্রস্তাব দিলেন। আমাকে সাভারে যেতে হবে না। রাজারবাগেই অফিস হবে। সেখানে উপদেষ্টা হিসেবে থাকবেন শাহাদত ভাই, নবী ভাই ও মাহফুজউল্লাহ। জাফর ভাইর প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা ছিলো, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবদানের জন্য।

আমি রাজী হলাম। এটা বেশ বড় একটা সিদ্ধান্ত ছিলো। কিন্তু তখন আমি জীবনের এমন একটি মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছিলাম যে, সিদ্ধান্ত নিতে খানিকটা সময় লাগলেও সাহসে ভর করে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। পিআইবি থেকে পদত্যাগ করলাম। নতুন অফিসটি ছিলো সাহিত্যিক শওকত ওসমানের বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই তিন-চারটি ঘর নিয়ে তৈরী একটি ছোট একতলা বাড়ি। সামনে ছোট বাগান। নবী ভাইর এক কাজিন মুকুল আমার সঙ্গে যোগ দিলো। পিয়ন, মালী নিযুক্ত করা হলো। আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো হলো। আমার যাত্রা শুরু হলো এক ভিন্ন কর্মজীবনে। ততদিনে আমার ব্যক্তিগত জীবনেও পরিবর্তন এসেছে। সেকথা আগামীতে বলবো।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box