মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

জীবনের গতিপথ বদল
এই সময় আমার জীবনের গতিপথে আর একটি বড় পরিবর্তন ঘটলো। আমার আর সংসার করা হলো না, আমাদের বিচ্ছেদ হলো। রূপকের বয়স মাত্র দেড় বছর। আমি বড় চাচার সঙ্গে আলোচনা করলাম। চাচা বললেন, ‘তোর একটা বাচ্চা আছে। তাই তোকে বলতে পারি না, চলে আয়। তবে তুই যে সিদ্ধান্তই নিস, আমরা তোর পাশে আছি।’ বড় ভাই বাবুল, যাকে আমরা বাবলিঙ ডাকি, সে ছিলো সবচেয়ে বড় সহায়। আমি ভাইদের বললাম, ‘আমি একা ঐ বাড়ি থেকে বের হবো না। তোরা আমাকে আনতে যাবি।’ কি ভেবে বলেছিলাম, আজ আর সেটা নাই বা বললাম। চাচা বললেন, ‘তুই আমার কাছে থাকবি?’ আমি তাতে রাজী হলাম না। চাচা থাকেন এক ছেলে-বৌমার সঙ্গে। তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো। সেটা নষ্ট করতে চাইনি। সেই সময় দৈনিক বাংলার একজন সাংবাদিক আর কবি হাসান হাফিজ প্রস্তাব দিলো, তারা পাঁচ ভাইবোন একটি বাড়ি ভাড়া নিতে যাচ্ছে। আমি তাদের সঙ্গে শেয়ার করে থাকতে পারি।

আমি তাতে রাজী হলাম। ওরা সিদ্ধোশ্বরীতে একটা বাড়ি ভাড়া নিলো। যথা সময়ে আমার মেজভাই ও যমজ ছোট ভাইদের একজন এলো আমাকে নিয়ে নিয়ে যেতে। এখানে একটা কথা বলা দরকার। আমার নিজের কোন ভাই নেই। কিন্তু ভাইয়ের অভাব কখনো অনুভব করিনি। বড় চাচার চার ছেলে আর আমরা একসঙ্গেই বড় হয়েছি। আমার সংসার ত্যাগ করাটা বেশ সহজই হলো। আমি হাসান, ওর ভাই রাজা ও তিন বোনের সঙ্গে থাকতে শুরু করলাম। ওরা আমাকে খুব শ্রদ্ধা করতো ও ভালবাসতো। পাশের বাড়িতে থাকতেন অভিনেতা ইনাম আহমেদ। তাঁর কন্যা সংবাদ পাঠিকা আসমা আহমেদের সঙ্গে খুব সখ্য হলো। ওর মা খুব স্নেহ করতেন আমাকে। কিছু দূরেই থাকতেন ভাষা সৈনিক- সাহিত্যিক আহমেদ রফিক। তাঁর স্ত্রী রুহুল হাসিন ছিলেন আহমেদ হুমায়ুনের বড় বোন, তাঁেক আমি বুবু ডাকতাম আর রূপক ডাকতো বুবু খালা। তাঁর আকর্ষণেই তাঁর বাড়ি যেতাম। বুবু খুব স্নেহ করতেন। তিনি ডাক্তার ছিলেন আর পিজি হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। হুমায়ুন ভাইর বাড়িও খুব দূরে ছিলো না। সেটা ছিলো আমার একটা আশ্রয়ের মত। যাহোক সেখানে বেশ কিছুদিন থাকার পর মনে হলো ওরা আমাকে যতই ভালবাসুক, এক সঙ্গে থাকলে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। সেটা চাইনি বলে একা বাড়ি খুঁজলাম।

মগবাজার ওয়্যারলেসের গলিতে সদ্য নির্মিত একটি বাড়ি পেয়েও গেলাম। বাড়িটা খুব পছন্দ হলো, কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিলো । বাড়ির মূল মালিক মারা গেছেন, তাঁর ছেলে তরুণ ইঞ্জিনিয়ার তিতাস গ্যাসে কাজ করে আর সে ঠিক করেছে উকিল, পুলিশ আর সাংবাদিককে বাড়ি ভাড়া দেবে না। এদের তোলা যায় না। আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, ছেলেটির বস আমার বাল্য বন্ধু আকরাম। আমি আকরামকে গিয়ে ধরলাম, বললাম, ‘ওকে বোঝাও আমি খুব ভাল মেয়ে। ও বললেই বাড়ি ছেড়ে দেবো।’ শেষ পর্যন্ত বাড়ি আমি ভাড়া পেলাম। শুধু তাই নয়, তরুণ ইঞ্জিনিয়ার বাড়িওয়ালা পাড়ার ছেলেদের বলেছিলো, আমি ওর আত্মীয়, কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে। এরপরের কাজ হলো এই সিদ্ধান্ত নেওয়া, একা কিভাবে থাকবো! আমাদের অফিসে একটি ছেলে ছিলো, তাকে কিশোর বলাই উচিত। তার নাম অনীল। সে আরো ছোট থাকতে অফিসের উঠোন ঝাঁট দিতো। এখন পিয়নে উন্নীত হয়েছে।

অফিসেই থাকতো আর তার জন্য থাকা-খাওয়া বাবদ ওকে কিছু টাকা দিতে হতো। ওকে ডেকে বললাম, ‘অনীল, আমি একটা বাড়ি ভাড়া নিচ্ছি। তুই আমার সঙ্গে থাকবি?’ ও রাজী হলো। খুব ভাল ছিলো ছেলেটা। রূপক ওকে মামা ডাকতো আর খুব ভালোবাসতো। মজার কথা, আমি যখন বাড়িটায় ঢুকলাম, তখন জানালার ফ্রেমটা হয়েছে, কাঁচের শার্সি বসেনি। তার মধ্যে একদিন উঠলো ঝড়। আমি আর অনীল অনেক কষ্টে বিছানার চাদর দিয়ে সেই ফাঁক বুঝিয়ে রাত কাটিয়ে ছিলাম। কিন্তু সেখানে খুব ভাল ছিলাম। লন্ডন যাবার আগে পর্যন্ত সে বাড়িতেই ছিলাম। তবে একটা কথা , একা নারী বলে তখন কিন্তু বাড়ি ভাড়া পেতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। শুনেছি এখনকার মেয়েদের সমস্যা হয়। তবে কি আমরা পেছনে হাঁটছি?

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box