মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

গণপ্রচারণে কাজ করার অভিজ্ঞতা

পরবর্তী পাঁচ বছরে আমার জীবনে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। একে একে সব বলবো। ইউনিসেফের ঢাকা অফিসে একজন কাজ করতেন, তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমাকে একদিন তিনি তাঁদের বসের কাছে নিয়ে গেলেন এবং আমাকে এক সারি স্লাইড ছবির স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ জুটিয়ে দিলেন। সেগুলো সবই ঢাকার বাইরে। সেসব জায়গায় থাকা ও যাতায়াতের দায়িত্ব তাঁদের। আমি বগুড়া, ময়মনসিংহ ও খুলনা গিয়ে সে কাজগুলো করলাম। বগুড়া গিয়ে খুব হতাশ হলাম। শৈশবে বড় চাচা বগুড়ার সিভিল সার্জন ছিলেন আর আমরাও তাঁর কাছে যেতাম ও থাকতাম। সেই ছিমছাম সুন্দর শহরের দশা দেখে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। অনেক পরে বিলেতে গিয়ে ছোট ছোট শহর দেখে বুঝেছিলাম, সেসবের আদলে সেই মফস্বল শহরগুলো তৈরী হয়েছিলো। তবে একটা জিনিস বুঝলাম, শৈশবে যাকে খুব বড় মনে হয়, বড় হয়ে দেখলে বোঝা যায় সেটা তত বড় ছিলো না। যখন ছোট ছিলাম, তখন সিভিল সার্জনের বাংলোর লনটা খুব বড় মনে হতো। ইউনিসেফের কাজ করতে গিয়ে দেখলাম, সেটা তেমন বড় নয়। সেই হতাশা থেকে পাবনা যাবার সুযোগ ও আমন্ত্রণ সত্ত্বেও কখনো যাইনি। আমার শৈশবের সেই সোনালী দিনগুলো স্মৃতির মনিকোঠায় থাক। সেই সময় ব্র্যাকের পত্রিকায় লিখতাম।

অত্যন্ত সজ্জন এক ব্যক্তি তার দায়িত্বে ছিলেন, দুঃখের বিষয় আজ আর তাঁর নাম মনে নেই। ব্র্যাক থেকেও জামালপুরে তাদের কাঁথা প্রকল্পের ওপর স্লাইড ফিল্মের স্ক্রিপ্ট লেখার প্রস্তাব এলো। আরো ভাল হলো, মালেকা (খান) ভাবীর ছোটবোন মীরা সেই কেন্দ্রটির দায়িত্বে ছিলো। মীরার সঙ্গে আমার সখ্য ছিলো। জামালপুর রূপককে নিয়েই গেলাম। সেখানকার মেয়েদের

নকশী কাঁথা

সঙ্গে রূপকের খুব ভাব হলো। তাদের সঙ্গে ক্ষেতের আলের ওপর অনেকটা পথ ও হেঁটে যাওয়াতে তারা খুব অবাক ও খুশি হয়েছিলো। ওর বয়স তখন তিন বছর। একদিন শুধু আমরা সন্ধ্যার মুখে নদীর পাড়ে গিয়েছিলাম আর রূপক নৌকা দেখে চড়ার বায়না করে কান্নাকাটি করেছিলো।সেদিন ওকে বুঝিয়ে কেন্দ্রে ফেরত আনি। সেই কাঁথা প্রকল্প দেখে খুব ভাল লেগেছিলো। সেই গ্রামে মেয়েদের একটি সালিশ দেখেছিলাম, যার নির্দেশ গ্রামের পুরুষদেরও মেনে চলতে হয়। এটা আমাকে মুগ্ধ, আশান্বিত আর আনন্দিত করেছিলো। তখন গণপ্রচারণ শিশুদের নানা প্রতিষেধক নিয়ে একটি ক্যাম্পেইন করেছিলো, যাতে রূপকের ছবি দেওয়া হয়েছিলো। সেখানে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রথম দিকে বেশ ভাল ছিলো। নবী ভাই প্রায় রোজ আসতেন, আর ঢুকেই বলতেন, ‘ঊর্মি, বিরিয়ানী লাগাও।’ সেদিন দুপুরে আমরা বিরিয়ানী খেতাম। জাফর ভাই, ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে প্রথমদিকে সম্পর্ক খুব ভাল ছিলো। তাঁর কিছু কিছু আচরণ তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দিয়েছিলো।

রাজশাহী-সিল্ক

একবার আমার বাড়িতে রূপককে দেখার কেউ ছিলো না। যে মেয়েটি দেখতো, সারাদিন ওকে রাখতো, সে কাজ ছেড়ে দেয়। আমি অকূল পাথারে পড়লাম। তখন জাফর ভাইকে বললাম, আমার ছুটি নিতে হবে, কারণ বাচ্চাকে দেখার কেউ নেই। তিনি শুনে বললেন, ‘কেন, ওকে অফিসে নিয়ে আসবেন। এখানে খোলামেলা জায়গায় ও খেলবে। কোন অসুবিধা হবে না।’ আমি অবাক হয়েছিলাম আর তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিলো। রূপককে নিয়ে বেশ কিছুদিন অফিস করেছি। ও দারোয়ান, মালী আর পিয়নের সঙ্গে সময় কাটাতো। ও খুব মিশুক ছিলো বলে আমার কোন সমস্যা হয়নি। সেই সময় গণপ্রচারণের হয়ে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছিলো। তার মূলে অবশ্য ছিলেন নবীভাই আর সম্ভবতঃ বাকী দু’জন উপদেষ্টা শাহাদত ভাই ও মাহফুজুল্লাহ্। একটি হলো, আড়ং’এর জন্য একটি তথ্যচিত্র তৈরী করা। স্মৃতি বিভ্রান্তি না ঘটিয়ে থাকলে যতদূর মনে পড়ে, সেটা ছিলো সিল্কের ওপর। ক্যামেরার কাজ করেছিলো সাহিত্যিক ও আমাদের অফিস-বাড়ির মালিক শওকত ওসমানের পুত্র জানেসার ওসমান। এ কাজের জন্য নবীভাই ও জানেসার রাজশাহী গিয়েছিলেন। ছবিটা খুব ভাল হয়েছিলো। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো একটি ক্যালেন্ডার তৈরী। এটার ব্যাপারেও আমাদের উপদেষ্টাদের কৃতিত্ব দিতে হয়, বিশেষ করে নবীভাইকে। ক্যালেন্ডারটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ প্রতিকৃতি দিয়ে তৈরী। তাঁদের ছবিগুলো স্কেচ ছিলো। এই ক্যালেন্ডারের জন্য অনেক রাত জেগে আমরা কাজ করেছি। ঘুমন্ত রূপককে সোফায় শুইয়ে রেখে সেটা করেছি। আমার পরিশ্রমই হয়তো সবচেয়ে কম ছিলো। নবী ভাই ও তাঁর সহযোগীদের কাজকে সহজ করার জন্য সহায়তা দেওয়াই ছিলো আমার মূল কাজ। আমাদের পরিশ্রম সফল হয়। সেই ক্যালেন্ডার অত্যন্ত জনপ্রিয় হয় এবং প্রায় ধন্য ধন্য পড়ে গিয়েছিলো। অনেকদিন সেই ক্যালেন্ডারের প্রশংসা শুনেছি আর গৌরব অনুভব করেছি। আজও করি।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box