মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

রূপকের প্রথম স্কুলে যাওয়া

ফেরদৌস কোরেশী এক সময় আমাদের সঙ্গে বিবিসি’তে অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। সেই সময় একবার তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের যখন বয়স হয়ে যায়, তখন তারা আত্মজীবনী লেখে। অথচ ততদিনে তাদের স্মৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এটা শুরু করা উচিত কম বয়সে, যখন স্মৃতি তর-তাজা।’ কথাটা যে কতখানি সত্যি, সেটা এখন বুঝতে পারছি। আমার স্মৃতিতে এখন অনেকটা ধূলোর আস্তরণ পড়েছে, অনেক কথা মনে থাকছে না। তাই আগের কথা পরে বলতে হচ্ছে। আজও সেরকম কিছু একটা করতে যাচ্ছি।

মারুফী খান

আমার জীবনের একটা বড় অংশ বাদ পড়ে গেছে, সেটাই এখন বলবো। আমি যখন দৈনিক সংবাদে কাজ শুরু করি, তখন একটা সময় এয়ার ফোর্স অফিসারস্ মেসে পারিবারিক বন্ধু এয়ার ভাইস মার্শাল এম কে বাশারের বাড়িতে ছিলাম, সেটা আগেই বলেছি। সেখান থেকে যাতায়াত করাটা খুব সহজ ছিলো না। বাস ছাড়াও রিক্সায় গুলিস্তান পর্যন্ত গিয়ে নবাবপুর রোড ধরে হেঁটে বংশাল রোডে সংবাদ অফিসে যেতাম। সেই সময় আমি রিক্সা শেয়ারও করেছি এবং সেটা অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে। তবে তাঁরা এতই অনভ্যস্ত ছিলেন যে শিটিয়ে বসে থাকতেন। যাহোক, তারপর আমি সার্কিট হাউজ রোডে ইয়াঙ উইমেন’স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ওয়াইডব্লিউসিএ কর্মজীবী নারীদের হস্টেলে চলে এলাম। সেখানকার অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। নানা বয়সী মেয়ে। সবাই কাজ করে। মজার কথা হলো আমরা তিনটি মেয়ে ছিলাম এমএ পাশ এবং আমাদের বেতন ছিলো সবচেয়ে কম। বাকী অল্পবয়সী মেয়েরা সেক্রেটারিয়াল জব করতো, অধিকাংশই বিভিন্নি দূতাবাসে। তাদের বেতন আমাদের চেয়ে অনেক বেশী ছিলো। তবে সেখানে কোন ভেদাভেদ ছিলো না।

সবার সঙ্গে সবার চমৎকার সখ্য ছিলো। একবার মনে পড়ে, আমার খুব অসুখ হলো, আমি প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে ছিলাম। আমার দুই রুমমেট ও হোস্টেলের অন্য মেয়েরা যখন রাত ন’টার দিকে দেখলো, জ্বর কমছে না, তখন দু’জন গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনে। আমি অচেতন থাকায় টাকার ব্যবস্থা করার উপায় ছিলো না। ওরা হোস্টেলের সবার কাছ থেকে টাকা ধার করে আমাকে ডাক্তার দেখায়। এই ঘটনা আমাকে অত্যন্ত আপ্লুত ও কৃতজ্ঞ করেছিলো। সেই সময় আমি আমার একটা সখ মেটানোর জন্য উদ্যোগ নেই। আমি ছায়ানট ও সন্দীপনের ছাত্রী ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গান শেখা আমার হয়ে ওঠেনি। এবার ভাবলাম, সেতার শিখি। ওস্তাদ আবেদ হোসেন খানের কাছে গিয়ে ভর্তি হলাম, নাড়া বাঁধলাম। একটা বেশ বড় গ্রুপ ছিলাম আমরা, তার মধ্যে দু’একজন ইংরেজও ছিলো। ছিলেন স্বপন আদনান। আমরা শিখি এবং ওস্তাদজী মাঝে মাঝে আমাদের নিয়ে অনুষ্ঠানও করেন। দল বেঁধে যাই। ওস্তাদজীর ছেলে শাহাদত বা শাহীন তখন কিশোর। ওর পড়ার ক্ষতি হবে বলে ওস্তাদজী ওকে নিতে চাইতেন না। ও এসে আমাদের ধরতো।

আবেদ হোসেন খান

আমরা ওস্তাদজীকে রাজী করিয়ে ওকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। ও খুব ভাল বাজাতো। পরে ও অনেক নাম করে। যাহোক, আমার জীবনের নানা ওঠা-পড়ায় সেটাও আমার শেষ পর্যন্ত হয়নি। কারণ তার কিছুদিন পর আমি দেশ ছাড়ি। নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিই, এক জীবনে সব হয় না। আগেই বলেছি, গণপ্রচারণে কাজ করার সময় আমি পুত্র রূপককে নিয়ে অফিস করতাম। ও বায়না ধরলো, ও স্কুলে যাবে। স্কুল কি জিনিস বুঝতো বলেও মনে হয়না। ভাবলাম, সেটা ভালোই হবে। আর কিছু না হোক, কিছু খেলার সাথী পাবে। মগবাজার মোড়ে নজরুল একাডেমীর কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিলো। ওকে নিয়ে সেখানে গেলাম। দেখি সেখানে প্রিন্সিপাল মারুফী খান, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্ংালা বিভাগে পড়তেন। মুখ চেনা ছিলো। বললাম, আমার ছেলেকে ভর্তি করতে চাই। তবে একটা কথা আছে, আমি ওর বাবার সঙ্গে থাকি না এবং আমিই ওর অভিভাবক বলে অভিভাবক হিসেবে নিজের নাম দিতে চাই। আশঙ্কা ছিলো এতে স্কুল কর্ত্তৃপক্ষ রাজী হবে না। কিন্তু মারুফী এক মুহূর্ত দেরী না করে বললেন, ‘নিশ্চয়, আপনার নামই থাকবে অভিভাবক হিসেবে।’

আমি একই সঙ্গে বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছিলাম। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিলো। আশান্বিত হয়েছিলাম, এবার দেশে মেয়েদের অবস্থার হয়তো পরিবর্তন শুরু হতে যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, রূপক এত ছোট, হয়তো স্কুলে কান্নাকাটি করবে, থাকতে চাইবে না। এর কোনটাই হলো না। ও খুব আনন্দে থাকতো। সবকিছুতে অংশ নিতো। স্পার্টস’এর ভাল করতে পারতো না ওর পায়ের জন্য। কিন্তু তখন তো প্রতিযোগিতা বুঝতো না, খেলার আনন্দটাই ওর কাছে বড় ছিলো। মারুফী ওকে খুব আদর করতেন। আর ওর ক্লাস টীচার রওশান ওরফে রুনুও খুব আদর করতেন রূপককে। আমি লন্ডন যাবার পর মারুফী একবার আমেরিকা যাবার পথে আমার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছিলেন। তখন রওশন রূপকের জন্য একটা উপহারও পাঠিয়েছিলেন। জীবনে চলার পথের শুরুতে ওকে আমার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু অনেক মানুষের ভালবাসা ওকে ভরিয়ে তুলেছিলো।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box