মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

শৈশবের চট্টগ্রাম

আমার আর একটি প্রিয় শহর চট্টগ্রাম। আমি তখন খুব ছোট। আব্বা সরকারী বন বিভাগে কর্মরত। থাকতাম, যতদূর মনে পড়ে জেএমসেন লেনে। একটা দোতলা বাড়ির এক অংশে আমরা, পাশের অন্য অংশে (বা দু’টি আলাদা ফ্ল্যাটে) আর একটি পরিবার। নিচের তলায় ছিলো মেস। সেখানে আমার টফি কাকু, লজেন্স কাকুরা থাকতেন। গলি দিয়ে রোজ কাঁধে ভাড়া নিয়ে ফেরীওয়ালা ডেকে যেতো ‘দই মাখন’। আম্মা আমাকে কাঁচা মাখন কিনে খাওয়াতো আর আমি ভাবতাম সেটার নামই ‘দই মাখন’। সে যে খেতে কী অপূর্ব ছিলো বলে বোঝাতে পারবো না। এখনো সে স্বাদ মুখে লেগে আছে। আজকাল শহরে সেসব পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। বহুকাল পর লন্ডনে থাকার সময় একবার দেশে এলে শ্রদ্ধাভাজন উমর ভাই (বদরুদ্দিন উমর) বললেন, ‘আমরা ভোলার গ্রামে কৃষক সম্মেলনে যাচ্ছি। যাবে নাকি?’ আমি তো বেড়াবার নামে এক পায়ে খাড়া। চলে গেলাম। অনেকে ছিলো। বন্ধু আনু মুহাম্মদ, ওর স্ত্রী বাপী, গোলাম মুস্তাফা। খুব উপভোগ করেছিলাম সেই সফর, সম্মেলন, আড্ডা। একদিন সকালে গ্রামের বাজারে নাস্তা খেতে গিয়ে কাঁচা মাখন দেখে কি যে আনন্দ হয়েছিলো। উমর ভাইর কাছে বকুনীও খেয়েছিলাম। কারণ তিনি জানতেন আমার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। কিন্তু সেই আশঙ্কা আমাকে দমাতে পারেনি।
চট্টগ্রামের সঙ্গে আব্বার দীর্ঘ দিনের স¤পর্ক। আব্বা-আম্মার বিয়ে যখন হয়, তখন আব্বার পোস্টিং ছিলো পটিয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত বড়মামার কাছে পিতৃহীন আম্মা থাকতো। দেশভাগের আগে বহরমপুরেও ছিলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমার বড় ফুফাও ছিলেন। তাঁরা দু’জন সম্বন্ধ করে বিয়ে দিয়েছিলেন। সুদূর খুলনার গ্রামে আমার নানী তাঁর সব ছোট সন্তান ও একমাত্র মেয়েকে তার ভাই দোজবরে বিয়ে দিচ্ছে বলে অনেক চোখের পানি ফেলেছিলেন। আব্বার আগে একটা বিয়ে হয়েছিলো। সন্তান প্রসবের সময় সেই মা মারা যান। পরে নানী, যাঁকে আমরা নানু ডাকতাম. তাঁর খুব প্রিয়পাত্র হয়ে দাঁড়ায় আব্বা, হয়তো নিজের ছেলেদের চেয়েও বেশী। ওই নানা বাড়ি, অর্থাৎ আব্বার প্রথম বিয়ের শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে আমাদেরখুব ঘনিষ্ঠতা ছিলো। সেখানে নানী, মামা-খালাদের কাছে অনেক আদর পেয়েছি। আম্মাকে তাঁরা তাঁদের মৃত একমাত্র কন্যার আসন দিয়েছিলেন আর তাঁর নামে ‘আঙুর’ বলেই ডাকতেন। যশোরের বেলেডাঙ্গায় সেই নানা বাড়ি আমরা অনেকবার গিয়েছি। নবগঙ্গা নদীর পাড়ে খালা-মামাদেরসঙ্গে প্রচুর আনন্দে সময় কাটিয়েছি।
চট্টগ্রামে আব্বার অফিস ছিলো কাটা পাহাড়ে। সেখানে মাঝে মাঝে যেতাম। একবার একটা ভালুক সেখানে ছিলো। তাকে যা বলা হতো, সে সেটাই করতো। আমার দই-মাখন ওয়ালার মতো একটা লাঠি কাঁধে নিয়ে হাঁটতো। তখন একবার চট্টগ্রামে ভূমিকম্প হয়েছিলো। আমার জীবনে ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা সেই বোধহয় প্রথম। আমার মনে আছে, আব্বা আমাকে বিছানা থেকে এক ঝটকায় তুলে আম্মার হাত ধরে সিঁড়ি ভেঙ্গে বাড়ির পিছনের উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। বাকীরাও সবাই সেখানে ছিলেন। দালান, গাছপালা কেঁপে উঠেছিলো।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত তখন ভারী সুন্দর ছিলো। সৈকতটা বেশ ছড়ানো ছিলো। দোকানপাট ছিলো না। একটা গোল ঘর ছিলো। ঘরটাকে ঠিক ঘর বলা যাবে না। সিঁড়ি বেয়ে উঠলে একটা গোল বারান্দার মত। দেয়াল নেই। শুধু রেলিং আর ছাদ। আম্মার একটা পোল্কা ডটের জর্জেট শাড়ি ছিলো। সেটার কথাও মনে পড়ে। চানাচূর খেতাম সেখানে গেলে। কেউ নিশ্চয় বিক্রি করতো। এসবই টুকরো টুকরো স্মৃতি, কিছুটা আবছা। তবে সমুদ্রটা পরিস্কার মনে আছে। সাদা ফেনার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। যতদূর তাকাই, তার কোন শেষ নেই, সীমানা নেই। আব্বা কিংবা আম্মার হাত ধরে পা ভিজাতাম। পুরো গোসল করেছি বলে মনে পড়ে না। হয়তো আব্বার কোলে বসে করেছি। আসলে খুব ছোট ছিলাম। তাই আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখা হতো।
এখনকার চট্টগ্রামকে দেখলে তখনকার চট্টগ্রাম সম্পর্কে কোন ধারণা করাই সম্ভব হবে না। এত ছিমছাম সুন্দর শহর ছিল। তখন ভূমি দস্যুরা পাহাড় কেটে দালান বানায়নি। শহরটা ভীড়ে-ভীড়াক্রান্ত হয়নি। রাস্তাঘাট এত ঘিঞ্জি ছিল না। ছবির মত শহর ছিল সেটা।রেলস্টেশনে স্যাভয় নামের দোকান থেকে চকলেট বা অন্য কনফেকশনারী কিনে খেতাম। শুনেছি সেটা এখনো আছে। সব তাহলে হারায় না!
চট্টগ্রামের সঙ্গেও ভালবাসা সেই অবোধ শৈশব থেকেই।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]