মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ছিমছাম ছোট্ট শহরটার গল্প

সময়টা পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে। সবে চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী পেপার মিল তৈরী হয়েছে। সেটা এখন কাপ্তাই উপজেলায় পড়ছে। কর্ণফুলি নদীর পাড়ে অবস্থিত এই মিলটা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় কাগজকল। আব্বা সেখানে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে যোগ দিয়েছিলো। তখন চট্টগ্রাম থেকে চন্দ্রঘোনা যাবার কোন রাস্তা ছিলো না। লঞ্চ বা নৌকায় যেতে হতো। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাবার ট্রেন জার্নিটা আমার খুব পছন্দ ছিলো। চট্টগ্রাম যাবার পথে ভৈরব বাজার পড়ে, ট্রেন ব্রিজের ওপর দিয়ে যায়। অনেক নিচে নদী, নৌকা, নদীর পাড়ে বাজার, পিঁপড়ের সারির মত মানুষ। আমার সেসব দেখতে খুব ভাল লাগতো। আমি ঝুঁকে পড়ে সেসব দেখতাম আর আম্মা আমার ফ্রকটা টেনে ধরে থাকতো।
তখন চন্দ্রঘোনা ছিলো পাহাড়ে ঘেরা ছিমছাম ছোট শহর। অবশ্য শহর বলা যাবে কিনা জানি না। কাগজকলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জনপদ। সেখানে অনেক কিছুই ছিলো, স্কুল, একটা চমৎকার ক্যান্টিন যেখানে খুব ভালো ভালো পেস্ট্রি পাওয়া যেতো (মনে রাখতে হবে তখন সবে উপনিবেশের মায়া ত্যাগ করে ইংরেজরা চলে যেতে শুরু করেছে, তাদের কিছু চিহ্ন তো থাকবেই), ফুটবল মাঠ, যেখানে নিয়মিত খেলা হতো আর আমি বাদাম ভাজা আর খেলার শেষে ক্যান্টিনে পেস্ট্রি খাবার লোভে আব্বার সঙ্গে খেলা দেখতে যেতাম। শহরে একটা সিনেমা হল পর্যন্ত ছিলো। যেদিন কোনো টিলার ওপর কর্তাব্যক্তি বা তাঁর পরিবার ছবি দেখতে যেতেন, সেদিন তাঁরা না পৌঁছানো পর্যন্ত ছবি শুরু হতো না। আবার অনেক কিছু ছিলো না। আমাদের জামাকাপড় বানাবার জন্য চট্টগ্রাম থেকে দর্জি এসে অর্ডার, মাপ ও কাপড় নিয়ে যেতো। আবার পরে একদিন এসে দিয়ে যেতো। নদীর পাড়ে টিলার ওপর ছিলো বড়কর্তাদের বাংলো। আমরাও থাকতাম একটি ঘোড়ার নালের আকারের পাহাড়ের ওপর। সেই পাহাড়ের পেছনের অংশে তিনটে ধাপে আট/দশটা বাংলো ছিলো। সামনের অংশে ছিলো মিলিটারী ক্যাম্প। প্রথমে আমাদের অংশে নিচে নামার ভাল সিঁড়ি ছিলো না। তখন আব্বা শেষ বিকালে মিলিটারী ক্যাম্প পার হয়ে ফিরলে আমি ছুটে গিয়ে তার হাত ধরতাম। পরে আমাদের অংশে সুন্দর পাকা সিঁড়ি হবার পর আমরা ¯ু‹লে যাবার সময় সেই সিঁড়ির পাশের নতুন সিমেন্টের পাকা নালা দিয়ে স্লাইডের চড়ে নামার মতো নেমে রাস্তায় যেতাম। তাতে অবশ্য বাড়িতে রোজই বকুনী খেতে হতো।
আমাদের পাশের বাড়িতে একটা অ্যাংলো পরিবার থাকতো। তাদের মেয়ে ব্রেন্ডা আর অ্যানা ছিলো আমার খেলার সাথী। পরে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলে গিয়েও ওদের দেখা পেয়েছিলাম। ওদের ভাই একবার ব্যাটারী এক ছুঁড়ে মেরে আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো। বাকী পরিবারের মধ্যে বাঙালি যেমন ছিলো, তেমনি উর্দূভাষীও ছিলো। মনে রাখতে হবে সেটা পাকিস্তান আমল। আর একটি পরিবারের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা ছিলো আমাদের। তাদের বাড়ির মেয়ে লিলি আপা, ছেলে বাবলু আর রোমেল আমার বন্ধু ছিলো। একাত্তরের যুদ্ধের সময় রোমেল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে আহত হয়। আমাদের বাড়িটা ভারী সুন্দর ছিলো। সিমেন্টের মেঝে, দরমার দেয়াল আর টিনের ছাদ। মা অনেক ফুলগাছ লাগিয়েছিলো। কঞ্চির গেটের ওপর মাধবীলতা, বাড়ি ঘিরে থাকা কঞ্চির দেয়ালে কুঞ্জলতা। বেলী থেকে শুরু করে অনেক রকমের ফুলগাছ। সব তখন নামও জানতাম না।
আব্বার সঙ্গে মিলে যেতাম বেড়াতে। নদীর পাড়ে ব্যাম্বু ইয়ার্ডে যেতাম। সেখানে স্তূপ করে রাখা থাকতো বাঁশ, যা জঙ্গল থেকে কেটে এনে রাখা হতো আর সেটাই ছিলো কাগজ তৈরীর কাঁচামাল। নদীতে বাঁশ বেঁধে বেঁধে ভেলা করা থাকতো। গভীর বন থেকে সেভাবেই বাঁশগুলো আনা হতো। আব্বার সহকর্মী কিংবা বড় কর্তাদের বাড়িও যেতাম। নদী আর তার পাড়টা খুব সুন্দর ছিলো। পাহাড়ি নদী কর্ণফুলী। এমনিতে শান্ত। কিন্তু বর্ষায় তার ভয়ঙ্কর রূপও দেখেছি। দু’টি রূপই সুন্দর। মিলের কাছাকাছি নদী ভরে থাকতো কস্টিক সোডার ফেনায়। পরে বারোঘুনিয়া নামে একটা কলোনী হলো সমতলে, যা আমাদের বাড়ির পিছন দিক থেকে দেখা যেতো। অনেকটা ঘোড়ার নালের আকারের সেই পাহাড়ের মাঝখানে আর পিছনে খাদ ছিলো। সেখানে থেকে অনাহূত অতিথিরা উঠে আসতো। একবার আব্বার গাম্বুট পরিষ্কার করার সময় সেটা থেকে কাঁকড়া বিছে বেরিয়েছিলো। আর একবার মা রাতে খাবার সময় কি একটা আনতে শোবার ঘরে গিয়ে বাতি জ্বালতে দেখতে পায় টেবিল ফ্যানের গায়ে জড়িয়ে একটা সাপ বসে আছে।
আমার প্রথম স্কুল চন্দ্রঘোনায়। আমাদের বাড়ির মতো পাকা মেঝে, দরমার দেয়াল আর টিনের ছাদ দেওয়া টানা লম্বা স্কুলঘর। আমাদের বাড়ি যেখানে ছিলো, সেই পাহাড় থেকে নেমে কাটা পাহাড় নামের রাস্তা পেরিয়ে যেতে হতো। আজকালের মতো তখন মা-বাবা প্রতিদিন ছেলেমেয়েকে স্কুলে আনা-নেওয়া করতো না। আমরা বাচ্চারা একসঙ্গে যেতাম। পাহাড় থেকে নেমে দৌড় দিতাম। স্কুলটা ভালো লাগতো। আমাদের একটা ব্রেক’এ দুধ আর চিনি বসানো বিস্কুট খেতে দেওয়া হতো। স্কুল থেকে দেওয়া ড্রয়িং খাতা ছিলো খুব মোটা, কাগজকলের স্কুল বলে কথা! আমাদের ইউনিফর্ম, জুতো সব বিনাখরচে স্কুল থেকে দেওয়া হতো। ফুটবল মাঠের সামনে ছিল স্কুলটা। টিচারদের মধ্যে মেমটিচারও ছিলেন। রাইম বা ছড়া মুখস্ত করতে পারলে এঁটেল মাটি দেওয়া হতো কোন কিছু বানাবার জন্য। তখন প্লাস্টিসিন চিনতাম না আমরা। যতদূর মনে পড়ে স্কুলের পিছনের পাহাড় থেকে সেই এঁটেল মাটি আনা হতো। আব্বাকে প্রায়ই জঙ্গলে যেতে হতো। অথাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক গভীরে ক্যাম্প থাকতো, সেখানে যেতে হতো কয়েকদিনের জন্য। কিস্তু সে কাহিনী আর একদিন বলবো।
চন্দ্রঘোনায় একটা বড় ঘটনা ঘটে। চন্দ্রঘোনায় আগুন লেগে শহরের বেশ অনেকটা অংশ পুড়ে গিয়েছিলো। আমাদের ঘোড়ার নালের আকারের পাহাড়ের সামনের অংশের মিলিটারী ক্যাম্পে প্রথম একটা স্ফূলিঙ্গ পড়ার পর পিছনের অংশে সকলে সতর্ক হয়ে হয়ে ওঠে। সবাই একটা কি দু’টো বাক্সে যা নেওয়া সম্ভব নিয়ে নিচে নেমে যাই। আমরা সবাই যখন রাস্তায় বসে আছি, তখন আব্বা, যার সখ ছিল ফটোগ্রাফী, তিনি ছবি তুলছিলেন বলে অনেকে বিস্মিত ও বিরক্ত হয়েছিলো। বাংলোর দেয়ালগুলো খুলে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু সব জায়গায় সেটা করা সম্ভব না হওয়ায় বাজার ও বেশ কিছু বাড়িঘর পুড়ে যায়। আমাদের স্কুলে ও নানা সহকর্মীর বাড়িতে লোকজনকে থাকতে হয়েছিলো বেশ কিছুদিন। আমরা নদীর পাড়ে আব্বার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাড়িতে ছিলাম, যাঁর ছোট মেয়ে বেবী আমার বন্ধু ছিলো। আগেই বলেছি নদীর পাড়টা ভারি সুন্দর। কিন্তু যত সুন্দর জায়গাই হোক, অন্য কারো বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকাটা খুব একটা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় ছিলো না। তবে সে সময়ের এই ঘটনা সবার মনে খুব দাগ কেটেছিলো, যা আজ এত বছর পরও স্পষ্ট মনে আছে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]