মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গলে…

মায়ের সঙ্গে আমি

চন্দ্রঘোনার কথা লিখতে গিয়ে আব্বার জঙ্গলে যাবার কথা লিখেছিলাম। আব্বাকে মাসের বেশ অনেকটা সময় সেখানে কাটাতে হতো। পরে আমরাও সেখানে গিয়ে থেকেছি। প্রথমদিকে যখন আব্বা জঙ্গলে যেতো, তখন আমি যথারীতি সঙ্গে যাবার জন্য বায়না ধরতাম আর আব্বার হোল্ড অলের ভেতরে আমার ছোট বালিশটা ঢুকিয়ে দিতাম। পরদিন ঘুম ভেঙ্গে দেখতাম, আমার বালিশ আমার মাথার নিচে আর আব্বা চলে গেছে। তখন তো অয়্যারলেস ছাড়া গতি ছিলো না। একবার আব্বার খবর না পেয়ে আম্মা আমাকে নিয়ে জঙ্গলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলো। মজার কথা, পথে আমাদের দেখা হয়ে গিয়েছিলো, আব্বাও চন্দ্রঘোনা ফিরছিলো। আমাদের গন্তব্যে যেতে প্রায় তিনদিন লাগতো। নৌকাগুলো ছিলো অন্য রকম। বেশ লম্বা নৌকা, তাতে দু’টো ছই থাকতো, মাঝখানে সামান্য ফাঁক। সামনেরটায় আমরা থাকতাম। পিছনেরটায় মাঝি-মাল্লারা থাকতো আর রান্নাবান্না হতো। অনেক সময় নদীর পাড়ে নৌকা ভিড়িয়ে নদীর তীরেও স্টোভ নামিয়ে রান্না করা হতো। নদী বেশীর ভাগ জায়গায় খুব অগভীর আর নদীর পানি স্বচ্ছ ছিলো। তলা পর্যন্ত দেখা যেতো। সেখানে ছোট চিংড়ি আর ব্যাঙাচিদের বিচরণ দেখতে বেশ আনন্দ পেতাম। নৌকাগুলোতে স্পীডবোটের মেশিন লাগানো থাকতো। কিন্তু অগভীর নদীতে সেটা ব্যবহার করা যেতো না। তখন সেই মেশিন তুলে রেখে লগী দিয়ে নৌকা বাওয়া হতো। সেরকম একটা জায়গায় আমি নদীতে পড়ে গিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিয়েছিলাম। পানি বেশী না থাকায় আমার ফ্রক ভিজেছিলো, সেরকম কোন বিপদ হয়নি। আবার জায়গায় জায়গায় নদী খুব গভীর ছিলো। সাধারণতঃ কোন বড় পাহাড়ের গায়ের জায়গাগুলো সেরকম ছিলো। সেখানে মেশিনে নৌকা চলতো খুব দ্রুত গতিতে।

তখনকার আদিবাসীরা

এই যাত্রা পথ আমার খুব আনন্দে কাটতো। আব্বা কবিতা আবৃত্তি করতো – বাংলা ও ইংরেজী, দু’রকমই। অনেক সময় আব্বার বই লাগতো না। কবিতা মুখস্ত থাকতো। শেলী-কিটস্ এবং রবীন্দ্রনাথ-সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বা যতীন্দ্র মোহন বাগচী। নিশ্চুপ, নিঝুম নদীতে আব্বার উদাত্ত কণ্ঠের সেই আবৃত্তি আজও কানে ভাসে। আর কবিতার পাশাপাশি আব্বা আমাকে গ্রীক ও হিন্দু পুরাণের গল্প বলতো। আমরা রাতে সাধারণত নৌকায় ঘুমাতাম। কখনো কখনো যাত্রা পথে কোন ডাক বাংলোতেও রাত কাটিয়েছি।

আমরা জঙ্গলের দু’টা জায়গায় থেকেছি – ওড়াছড়ি আর গঙ্গারাম ছড়া। যতদূর মনে পড়ে গঙ্গারাম ছড়ায় বাজার বসতো। কিন্তু ওড়ছড়িতে কিছু ছিলো না। সাতদিনের বাজার নৌকা করে নিয়ে আসা হতো। আমরা তখন প্রচুর টিনের খাবার খেতাম। টিনের মাছ, কটেজ চীজ ইত্যাদি। এই বাজার এত মহার্ঘ ছিলো যে সেটা ঘুষের আকারেও আসতো। একবারের কথা মনে আছে, আব্বার অফিসের এক কর্মচারী ছুটতে ছুটতে এসে মাকে বলেছিল, ‘একটা লোক এক ঝুড়ি বাজার নিয়ে আসবে। স্যর বলেছেন সেটা না রাখতে।’ পরে জানা গেল, জঙ্গলে গাছ কাটার অবৈধ অনুমতির জন্য সেই ঘুষ পাঠিয়েছিলো এক কন্ট্রাক্টর।

জঙ্গলে জীবনটা খুব আনন্দের ছিলো। আমার খেলার সাথী তেমন ছিলো না। মাত্র তিনটা বাংলো ছিলো। তবে একটা চাকমা ছেলেকে রাখা হয়েছিলো আমার দেখাশোনা করার জন্য। তার সঙ্গে নদীর পাড়ে যেতাম। সে মাঝে মাঝে গামছা দিয়ে ছোট মাছ ধরতো। আমাদের বাংলোটা খুব সুন্দর ছিলো। মাচাঙের ওপর কাঠের বাড়ি। সামনে-পিছনে সিঁড়ি। পিছনদিকে রান্নাঘর ও ভাঁড়ার ঘর। এই দুই ঘরের মাঝখানে দরমার দেয়ালটা ছিলো ছাদ থেকে একটু নিচে। তার ওপর চাল-ডালের বস্তা ঝুলিয়ে রাখা হতো। একবার একবার সেই বস্তার ওপর একটা বড় সাপকে ঝুলে থাকতে দেখা গেলো। প্রচ- হৈ চৈ করে লোকজন ছুটে এলো। আব্বা রাইফেল নিয়ে বেরিয়ে এলো। সাপটা সুড় সুড় করে নেমে একটা গর্তে গিয়ে ঢুকলো। কার্বলিক এসিড ঢেলে সেটাকে বের করা হলো। তারপর আব্বা গুলী করে সেটাকে মারলো। শুনলাম সেটা দুধরাজ সাপ, যার বুকের দিকটা ধবধবে সাদা। বেশ বড় ছিলো সাপটা। কিছুক্ষণ পর যেসব আদিবাসী কর্মী জঙ্গলের ভেতরে বাঁশ কেটে নদীতে ভেলা বানায়, তাদের দু’চারজন এলো আর আব্বার কাছে, অনুরোধ করল সাপটা তারা নিয়ে যেতে পারে কিনা। সেই সঙ্গে তারা আর্জি জানালো, তারা পরদিন কাজে যাবে না। আব্বা রাজী হলো। এখন তো জানি পৃথিবীর অনেক জায়গায় সাপ খাওয়া হয়। তখন ছোট ছিলাম বলে খুব অবাক হয়েছিলাম।
জঙ্গলে আরো অনেক গল্প আছে, সেসব আগামীতে বলবো।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]