মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

সীতা পাহাড়ে মা

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

হাতি খেদা আর জঙ্গলের অভিজ্ঞতা 
জঙ্গলের গল্প কি সহজে শেষ হয়? বন যেমন বিস্তৃত, বিশাল, সেই সঙ্গে সেখানে থাকার আমার অভিজ্ঞতাও অনেক বড়। আমরা যেখানে থাকতাম, সেখানে যেতে পথে পড়ত কাপ্তাই আর রাঙ্গামাটি। তারও আগে পার হতাম সীতা পাহাড়। সেখানে ডাক বাংলোতে কিছুক্ষণের বিরতি। সীতাপাহাড়ের উল্টোদিকে ছিল রাম পাহাড়। কর্ণফুলী নদীর দু’পাশে বিরাট বড় দু’টো পাথর ছিলো। ¯’ানীয় লোককথা বলে. এই দুই পাথরের ওপর দিয়ে নদীতে গোসল করতে এসে নাকি রাম ও সীতার দেখা হয়েছিলো! কাপ্তাই আর রাঙ্গামাটি, জায়গা দু’টো কিš‘ সে সময় এখনকার মত ছিলো না। রাঙ্গামাটিতে লেকও ছিলো না। কাপ্তাইতে বাঁধ ছিলো না, তবে নদীতে বড় বড় ঘূর্ণি ছিলো। আমরা অনেক সময় সেসব জায়গায় থামতাম। আব্বা রাঙ্গামাটিতে রাজার সঙ্গে সাক্ষাত করতে যেতো। তখন রাজা কে ছিলেন, জানি না। হয়ত ত্রিদিব রায়ই ছিলেন। সেই বয়সে আমার কাছে রাজা-রাণী তো রূপকথার চরিত্র ছিলো।

বন্য হাতি

কিš‘ রাজাকে কখনো দেখতে পাইনি। রাণীকে বাগানে বা”চা কোলে ঘুরতে দেখেছিলাম। আমার কল্পনার সঙ্গে না মেলাতে হতাশ হয়েছিলাম।
এই যাত্রাপথে একবার একটা বুনো হাতির মুখোমুখি পড়েছিলাম। নদী সেখানে সরু। আব্বা সেটাকে তাড়াবার জন্য শূন্যে গুলি চালিয়েছিলো। তাতে হাতিটা মুখ ঘুরিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে যায়। গুলি ছোঁড়ার আগে অবশ্য আব্বা ছবি তুলেছিলো। ফটোগ্রাফী আব্বার অনেক হবির মধ্যে একটা ছিলো। পরে এক কন্ট্রাক্টর আব্বার বিরুদ্ধে মামলা করে বলেছিলো আব্বা তার হাতির চোখ কানা করে দিয়েছিলো। হয়ত সেই ঘুষ দেবার চেষ্টা করা কন্ট্রাক্টরই হবে। আব্বাকে তার সততার মূল্য দিতে হয়েছিলো অনেকদিন সেই মামলা লড়ে। আমরা যখন ঢাকায় থাকি, তখনও আব্বাকে নিয়মিত চট্টগ্রাম যেতে হতো মামলা লড়ার জন্য।
জঙ্গলে আমাদের সময় বেশ ভালই কাটতো। আব্বার ব্যাটারী চালিত রেডিও ছিলো আর ছিলো একটা গ্রামোফোন। সেই সঙ্গে ছিল আব্বার আবৃত্তি, গল্প বলা। আমাকে মায়ের কাছে পড়তে বসতে হতো, সেটা যে খুব পছন্দ ছিলো, তা নয়। তবে খেলার অনেক সময় পেতাম। খেলার সাথী সেরকম না থাকলেও একা একা খেলা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। বনের প্রকৃতি আর পাহাড়, নদী ছিল আমার সাথী। সন্ধ্যার পর বাংলোর সামনে বনফায়ার মানে আগুন জ্বালিয়ে আমরা বসতাম। আব্বার কাছে তার বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প শুনতাম। সেসব গল্পের সাথে সাথে আব্বা ফরাসী বিপ্লব অথবা উপমহাদেশের স্বাধীনতার গল্পও বলতো। রাতের খাবার সেখানে খেয়েই আমরা ঘুমাতে যেতাম। ট্রাক্টরে চড়ে ঘোরাও ছিল আমার আনন্দের আর একটা উপকরণ। শুনেছিলাম, আমরা যেখানে থাকতাম, সেটা প্রায় বর্মার সীমান্তের কাছে। সেখানে অনেক চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ থাকতেন। চাকমা মেয়েরা পিঠে বড় ঝুড়ি ভর্তি কমলা নিয়ে আসতেন, যা দামে ছিলো খুবই সস্তা। এক ঝুড়ি কমলা আমরা তিনজন কতদিনে খাব? তাই সেগুলো দিয়ে মা জ্যাম তৈরী করত। আমরা অনেক সময় চাকমা-মারমাদের বাড়ি বেড়াতে যেতাম। তাঁরা খুব খুশি হতেন। তাঁদেও বাড়িতে মৃত গুই সাপ ঝুলতে দেখেছি, তাঁরা সেটা খান। আমাকে উপহার দিতেন আখ আর মুরগীর ডিম। আব্বার এক সহকর্মী ছিলেন সুশীল চাকমা। তাদের সঙ্গেও খুব ঘনিষ্ঠতা

মিসেস ম্যাকেঞ্জি, মা আর আমি

ছিলো। এক কেনেডিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন মিঃ মেকেঞ্জি। তিনি আমাকে খুব আদর করতেন। আর এক বিদেশী ছিলেন, যাঁর শিশুপুত্রকে নিয়ে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন। আরো কয়েকজন ছিলেন। তাঁরা যেতেন-আসতেন। সেই সময় বিদেশীদের দেখা বা তাঁদের প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো। আব্বা অন্য এলাকায় কাজ দেখতে যেতো, আমিও মাঝে মাঝে জুটে যেতাম। সেখানে তাঁবুতে থাকাটা খুব আনন্দের ছিলো।
তবে জঙ্গলের জীবনে সবচেয়ে মনে রাখার মত অভিজ্ঞতা ছিলো হাতি খেদা তার মানে বুনো হাতি ধরা দেখাটা। আব্বার অধীনে কয়েকটি হাতি ছিলো। তাদের একটার নাম ছিলো লাল বাহাদূর। মাহুত যখন হাতিকে গোসল করাতে নিয়ে যেতো, তখন আমিও জুটে যেতাম। হাতির পিঠে চড়ে যেতাম। হাতি শূড় দিয়ে গায়ে পানি ছিটাতো। পাড়ে বসে সেসব দেখতে খুব ভাল লাগতো। তবে খেদা দেখার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটা। সেবার পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা এসেছিলেন সেই হাতি খেদা দেখতে। খেদার জন্য বেশ বড় জায়গা রাখা হতো। তারপর সে জায়গা বিশাল বিশাল গাছ পুঁতে ঘিরে ফেলা হতো। তার সঙ্গেই কিছু মাচাং করে বসার ব্যব¯’া ছিলো। আমরা একটা মাচাং’এ বসে দেখেছিলাম। ঘেরা জায়গাটার একটা দিকে গেট বানানো হলো, যা বন্ধ রাখার মজবুত ব্যব¯’া ছিলো। বুনো হাতিকে আগুন ও ঢাকঢোলের তীব্র শব্দে তাড়িয়ে এনে সেই ঘেরা জায়গায় ঢোকানো হলো। আমরা ওপর বসে তাদের সেই অল্প জায়গায় ঘুরতে দেখেছিলাম। সঙ্গে একটা-দুইটা বা”চা হাতিও ছিলো। পরে এক একটা বুনো হাতির দু’পাশে দু’টো পোষা হাতিতে বসে মাহুত বুনো হাতিকে বেঁধে বাইরে নিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখলো। প্রথমে তাদের গায়ে ডাল ও পাতা দিয়ে সুড়সুড়ি কমানো হল। সেটা নাকি করতে হয়। তারপর শুরু হল তাদের প্রশিক্ষণ। আমরা যখন ওপরে মাচাং’এ বসে ছিলাম আর যখন বুনো হাতিগুলোকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, তখন তাদের অ¯ি’র পদচারণা ও ঘেরা জায়গার দেয়ালে ধাক্কা মারার ফলে আমাদের মাচাং করা বসার জায়গা কেঁপে কেঁপে উঠেছিলো। ভয়ে আম্মাকে আঁকড়ে ধরেছিলাম। কিš‘ সব যখন শেষ হল আর আমরা নেমে এলাম, তখন বুঝলাম এ এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। সেটা আজও মনের গভীরে দাগ কেটে আছে। সে অভিজ্ঞতা ভোলার মত নয়। (চলবে)
ছবিঃ লেখকের সংগ্রহ ও প্রাণের বাংলা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]