মনে মনে অরণ্যে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাহবুবুর রশীদ

সাতচল্লিশে সিরিল রেডক্লিফ যদি ধর্মের পরিবর্তে ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর পরম্পরাকে বিবেচনায় রেখে ভারত-পাকিস্তানের সীমান্তরেখাটা টানতে পারতেন, তাহলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো অবিভক্ত ‘বাংলা’, আর ভুটান সীমান্তের পাহাড়শ্রেণির পায়ের তলায় দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কুচবিহারের পাহাড়, অরণ্য, নদী, চা-বাগান, আদিবাসী নারীপুরুষ নিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘ডুয়ার্স’ অঞ্চলটা হতো সেই অখণ্ড বাংলার অংশ। মন চাইলে কাঁধে ট্রাভেলব্যাগ ঝুলিয়ে যে কোনো সময় চেপে বসতে পারতাম ডুয়ার্সগামী বাসে কিংবা ট্রেনে। ছেলেবেলা থেকে লেখক জিম করবেট, রুডিয়ার্ড কিপলিং, বুদ্ধদেব গুহ পড়ে আর সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ দেখে জঙ্গলের প্রতি যে মোহ তৈরি হয়েছিলো, সমরেশ মজুমদার সেটাকে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন ডুয়ার্সে।

তার ট্রিলজি উপন্যাসের নায়ক অনিমেষ হয়ে আমি কল্পনায় কত ঘুরে বেড়িয়েছি পাহাড়, জঙ্গল, নদী, চা-বাগান আর দেহাতিদের ঘরবাড়িতে। ভিঞ্চি, ভ্যান গগ, রেমব্রা, রাফায়েল, সেজান, পিকাসো, রদ্যা, হেনরি মুর, রামকিঙ্কর – এরা যতই মহান ও কালজয়ী চিত্রকর বা ভাস্কর হন না কেন, প্রকৃতি নামক এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পীর সামনে নিতান্তই ধূলিকণাতুল্য। সেই মহত্তম শিল্পীর সৃষ্টি গোটা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকলেও, স্থিরচিত্র-ভিডিও-সিনেমা দেখে আর গল্প উপন্যাস ও ভ্রমণের গদ্য পড়ে এই ডুয়ার্স নামক অঞ্চলটাকে তাঁর অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম বলে মনে হয়।

১৯৮১ সালে প্রথম ভারত ভ্রমণের পর বেশ ক’বার সীমান্ত পারাপার করেছি, দিল্লী-আগ্রা-জয়পুর-ব্যাংগালোর-উটি-মানালি যাওয়া হয়েছে, কিন্তু বাড়ির কাছে ডুয়ার্স ভ্রমণের স্বপ্নটা অপূর্ণই রয়ে গেছে। পাসপোর্ট-ভিসা-প্যানডেমিক-উপযুক্ত ভ্রমণসঙ্গী ইত্যাদির মীমাংসা না করে চাইলেই হুট করে যাওয়া যায় না। জীবনের অনেক সাধই অপূর্ণ থাকবে জানি, কিন্তু ডুয়ার্সের কোন টিলার মাথায় কাঠের তৈরি বাংলোর বারান্দায় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখবো, পূর্ণিমার জ্যোছনায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর, তোরষা নদীর নীল জলে নিজেকে দেখছে রূপসী চাঁদ, অদূরেই গম্ভীর নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে সারিবদ্ধ ভূটান পাহাড়, প্রকৃতির এই অসহ্য সুন্দর রূপে বিমোহিত হয়ে জংগলের গভীরে সশব্দে ছুটে বেড়াচ্ছে চিত্রল হরিণ, বাঘ, হাতি আর বাইসনের দল। স্বপ্নবাজ মানুষের কাজ কী? স্টিল ফটোগ্রাফ দেখা, মনে মনে ভরা জ্যোৎস্নায় ফরেস্ট বাংলোর কাঠের ঝুল বারান্দায় বসে থাকা। আপাতত দুধের সাধ ঘোলে মেটানো।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ প্রকৃতি ও সৌন্দর্য সর্বজনীন, ক্যামেরায় ক্যাপচার করলেই মালিকানা বর্তায় না, তাই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত স্থিরচিত্রগুলি অনুমতি ছাড়াই ব্যবহৃত হয়েছে।

ছবি: গুগল

লেখক: পোস্টমাস্টার জেনারেল হিসাবে অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box