মনে মনে বলি, আমার নাম দুখু মিয়া

শেখ রানা

শেখ রানা,এডিনবরা, স্কটল্যান্ড:

গান লেখার গল্প। গীতিকার হবার উপাখ্যান।সে গল্পও মন্দ নয়।কেবল তাকে পেছনে ফেরানো। ফিরেতাকালে মনে হবে খুলে গেছে আস্তএক জাদুর বাক্স।উনিশ বছর পূর্তিতে ভাবলাম গান লেখার গল্প হোককিছু। ইদানিং অনুজ গীতিকারদের জানতে চাওয়া কিছু প্রশ্নেরউত্তরও হয়তো এসে যাবে আলগোছে।এভাবেই আমাদের প্রাণের বাংলায় শুরু করলেন গীতিকার শেখ রানাতার গান লেখার গল্প…

এক.

২০০৩-২০০২ এর কোনো এক মাস। ঈদ এর আগ দিয়ে ঘটনা।আমার তখন এতই খারাপ সময়  যে এখন সেই সময়টার কথা ভাবলে আমার হাসি আসে। এ এক অদ্ভুত সাইকোলোজি বটে। যাই হোক, ঘটনায় চলে যাই।ততদিনে আনন্দমেলার জৌলুশ অস্তগামী। সমস্ত রূপ-রস-মেধা হারিয়ে আনন্দমেলা ধুঁকছে। আমরা যেমন আমাদের শৈশব-কৈশোরে ঈদের দিন সাড়ে দশটায় সব কাজ খাওয়া সেরে ঈদের ফিনিশিং টাচ দিতাম সেমাই এর বাটি হাতে আনন্দমেলা দেখতে দেখতে, সেই সময় আর নেই।

সেই নিরানন্দ মেলা সময়ের ঈদের সপ্তাহখানেক আগে আর কে নামে একজন আমাকে খুঁজে বের করে বাড়ি পর্যন্ত চলে এলেন। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম আনন্দমেলায় একটা সমবেত গান থাকবে ঈদ নিয়ে, সেটার জন্য লিরিক লাগবে। চারজন ছেলে ভোকাল, চারজন মেয়ে। চারটা অন্তরা লাগবে, ব্রিজ লাইন লাগবে-ইত্যাদি নানা বিড়ম্বনা। হাতে সময় নেই একদম। সপ্তাহখানেক এর ভিতর লিখে  দিতে হবে।প্রমাদ গুনলাম। তবে কাজটা নিলাম চ্যালেঞ্জ নিয়েই। সপ্তাহখানেক ঈদের আনন্দের শব্দকল্পে ডুব দিয়ে অবশেষে একটা লিড়িক দাড় করে ফেললাম।  আর কে নির্দিষ্ট সময়ে আমার কাছ থেকে লিরিক নিয়ে তখনকার সময়ে বেশ সম্মানজনক রেমুনারেশন দিয়ে আমার মুখ হাসিমুখ করে দিয়ে চলে গেলেন।

ঈদের দিন। আনন্দমেলার আনন্দ না নিয়েই বাসার সবাই যার যার রুমে চলে গেলো ঘুমদেশে যাবে বলে। আমার আর বলা হলো না আনন্দমেলায় আমার লেখা একটা গান যাবে। ভাবলাম ভালোই হলো, কেমন না কেমন হয়েছে লিরিক। আমি একাই দেখি বরং। শুরু হলো ঈদের ঝলমল টলমল আনন্দমেলা। আমি পিঠ সোজা করে বসে দেখতে লাগলাম আনন্দমেলা, আর অপেক্ষা করতে লাগলাম সমবেত সঙ্গীত এর জন্য। আরে, এইতো শুরু হয়েছে আমার লেখা গান। কি সুন্দর করে মনোযোগ দিয়ে গায়ক-গায়িকারা ডান পাশে হেলে বাম পাশে দুলে গান গাইছে। আমি প্রসন্নমুখে গান দেখতে লাগলাম। বজ্রপাত হলো গান শেষে। গীতিকার নাম এ লেখা দেখাচ্ছে- বদরুল আলম প্রামাণিক। আমি প্রামাণিক? কবে! কেনো!কিভাবে!

দুঃখে জমে গেলাম একদম। সেমাই খেতে আর ইচ্ছে করলো না। পাথর হয়ে ফোন করলাম আর কে-কে। ‘ভাই, এটা কি হলো?’

‘রানা ভাই, আর বইলেন না রে ভাই। প্রযোজক এর খুব ইচ্ছা, তার নাম গীতিকার হিসেবে যাবে, সে বলে রাখসে তার শালা-শালিকা কে। বুঝছেন অবস্থা!’- আর কে জানায় আমাকে।

মানুষ অধিক শোকে পাথর হয়, আমি অবিশ্বাস্য শোকে হয়ে গেলাম কংক্রিট!

দুই.

এ রকম নাম বদল আমার আরও বেশ কয়বার হয়েছে। বৃষ্টি গানের প্রথম মিউজিক ভিডিও দেখায় শুভেচ্ছাতে। আসিফ এর ও প্রিয়া ও প্রিয়া-ও প্রচার হলো সেই শুভেচ্ছায় । ক্রেডিট লাইন গুবলেট হয়ে গিয়েছিলো। বৃষ্টি গানের ক্রেডিট লাইনে দেখচ্ছিলো- কথা ও সুর-ইথুন বাবু। অবসকিওর এর একটা অ্যালবামে আমার একটা লিরিক আর এক গীতিকারের নামে গিয়েছে ( টিপু ভাই সজ্জন মানুষ, জানাতেই ভুল স্বীকার করেছে), সামনে দাড়া-গানটার মিউজিক ভিডিওতে ভুল করে গিয়েছে শাহানের নাম। দীর্ঘ অভ্যাসে আমি এখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি এসবে।

পরী গান দিয়েই শেষ করি।দেশে ফিরে এক রৌদ্র দুপুরে আমি উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটছিলাম হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে। একদম গল্পের বই থেকে উঠে এসে মাজেদা খালা  ‘এই রানা, এই…গাড়িতে উঠে আয়, কি রোদের ভিতর উদাস মুখে হাঁটছিস ‘ বলে আমাকে দ্বিতীয়বার ভাববার অবকাশ না দিয়ে গাড়িতে তুলে নিলেন আর আমিও পরিবাগ আসতেই তাকে ভাববার অবকাশ না দিয়ে নেমে পড়লাম।তারপর টং এর দোকানে চা খেতে খেতে ওভারব্রিজ দেখতে লাগলাম।

‘ আপনি, ঢাকায়? কবে এলেন? ‘

মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি রোদ চশমা পড়া অপরুপ এক তরুণী আমার তাকিয়ে তাকিয়ে আছে।

‘ জানেন, কালকে পরী গানটা টিভিতে দেখাচ্ছিলো একটা লাইভ অনুষ্ঠানে। বাপ্পা ভাই আপনার কথা বললো। ‘

এবার চিনতে পারলাম। একটা ছোট্ট মেয়ের জন্য পরী গানটা লিখেছিলাম আমি। এত বছর পর সেই ছোট্ট পরীর সাথে আমার পরীবাগে দেখা হলো পরী গানের সুত্রেই।

আমার ফেলে আসা বোহেমিয়ান জীবনের কথা মনে পরে গেলো। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া বাদ দিয়ে আমি একটা ব্যাগপ্যাক, কিছু জামা-কাপড়, কবিতার খাতা আর জয় গোস্বামীর কবিতার বই নিয়ে ঘুড়ে বেড়াতাম। ট্রেন ধরে চলে যেতাম নাম না জানা স্টেশনে।

সেইসব আনন্দ-বেদনার কাব্য মনে পরে গেলো এতদিন পর।

চায়ে চুমুক দিয়ে আমি পরীর দিকে তাকিয়ে শান্ত করে হাসি। মনে মনে বলি, ‘ আমার নাম দুখু মিয়া।’

ছবি: সৌজন্যে শাহানা হুদা

পড়ুন
ফিরে দেখা সব সময় আনন্দের…
আনন্দ-বেদনার আসা যাওয়াতেই জীবন