মনে রাখবো,বুকে রাখবো তোমাকে গুরু আজন্ম

লুৎফুল কবির রনি

‘তার জন্যই আসলে আমরা রক মিউজিক নিয়ে আজ বাংলাদেশে কাজ করছি। তার প্রাপ্য অনেক, কিন্তু আজও কি তিনি সেই মূল্য পেয়েছেন?’

-হামিন আহমেদ

‘২০শে আগস্ট, ১৯৭১ একটা তাঁবুতে আলো জ্বলছে, আর সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর: হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ- বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা।’

‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এভাবেই লিখেছেন আজম খানের কথা।

‘একাত্তরে ২৫ মার্চের পর সারা শহরে কারফিউ। আর্মিদের জ্বালায় থাকতে পারতাম না। পালিয়ে থাকতাম। বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে নয়। মরলে যুদ্ধ করেই মরব। সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম, ভারতে গিয়ে ট্রেনিং করবো। যুদ্ধ করবো। যে যার মতো চলে গেলো। আমি যেদিন গেলাম, সেদিন আমার সঙ্গে ছিলো দুই বন্ধু শাফি আর কচি। বেলা সাড়ে ১১টা।যুদ্ধে যেতে চাই। মা বললেন, ‘ঠিক আছে, তোর বাবাকে বল।’ বাবা প্রয়াত আফতাব উদ্দীন খান ছিলেন কলকাতার প্রশাসনিক কর্মকর্তা। কাঁপতে কাঁপতে গেলাম বাবার সামনে। মাথা নিচু করে বললাম, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। চিন্তা করলাম, এই বুঝি লাথি বা থাপ্পড় দেবেন।

কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবা বললেন, ‘ঠিক আছে, যুদ্ধে যাইবা ভালো কথা। দেশ স্বাধীন না কইরা ঘরে ফিরতে পারবা না।’

এই আমাদের পপগুরু আযম খান। ।বাবাকে দেয়া কথা রেখেছিলেন ।

আজম খান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ২১ বছর বয়সে। তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা যোগাতো। আজম খান মূলত যাত্রাবাড়ি-গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তার নেতৃত্বে সংঘটিত ‘অপারেশান তিতাস’। তাদের দায়িত্ব ছিলো ঢাকার কিছু গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করার মাধ্যমে বিশেষ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান শেরাটন হোটেল), হোটেল পূর্বাণী’র গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। তাদের লক্ষ্য, ওই সকল হোটেলে অবস্থানরত বিদেশীরা যাতে বুঝতে পারে যে দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে তিনি তার বাম কানে আঘাতপ্রাপ্ত হন। যা পরবর্তীতে তার শ্রবণক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়। আজম খান তার সঙ্গীদের নিয়ে পুরোপুরি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। এর আগে তারা মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংগঠিত যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করেন

ষাট এবং সত্তুরের দশক ছিলো প্রথা না মানার সময়। শুরু হয়েছিলো পশ্চিমে, কিন্তু জের গিয়ে আছড়ে পড়েছিলো সুদূর বাংলাভূমিতেও। প্রথা না মানা এরকমই একদল দ্রোহী তরুণ বিদ্রোহ করেছিল রক্ষণশীল বাংলা গানের বিরুদ্ধে। পপ গানের উন্মাতাল অর্গল খুলে দিয়েছিলেন তাঁরা। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন আজম খান। দ্রোহী ছিলেন এরা, সামাজিক প্রথা ভেঙেছেন, কিন্তু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হননি তাঁরা কখনো। সাধারণ মানুষের নাড়ির সঙ্গে যোগাযোগটা ছিলো সবসময়ই অক্ষুন্ন।

যুদ্ধের মধ্যেও গানকে ছাড়েননি তিনি। জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলিতেও সে কথা লেখা আছে। রুমি তার মাকে বলেছিলো যে রাতের বেলা তারা মেলাঘরে আজম খানের উদাত্ত্ব গলার গান শুনতো। শুধু ট্রেনিং ক্যাম্পেই নয়, সম্মুখসমরেও গানকে বিসর্জন দিতেন না তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রেও গান গাইতে গাইতেই লড়াই করতে তিনি।

আযম খান – অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা সেই অভিমানী কন্ঠ , বাঙালির তারুণ্য যার দ্বারা বিমোহিত আজন্ম ।

দেশকে আজন্ম দিয়ে যাওয়া মানুষটি নিজে পাননি কিছুই।এখনকার উঠতিরাও ব্যবসায়ী না শিল্পী বুঝতে কষ্ট হয় কিন্তু তখন তারা সংসার,অর্থ কোন দিন চিনেননি। যেদিন পপগুরু আজম খান টাকার অভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন না করেই ফিরে এসেছিলেন এবং তার কিছু দিন পরেই
কোটি টাকা খরচ করে অরিজিত সিং কে নিয়ে
আসা হয়েছিলো তখন বুঝেছিলাম আমরা জাতি হিসেবেই অকৃতজ্ঞ।

অজানা কোনো অন্যভূবনে অনেক অনেক ভাল থাকুন আপনি আজম খান। অভিমান ভুলে গলা খুলে গান গান গভীর ভালবেসে আগের মত।

আযম খান – অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা সেই অভিমানী কন্ঠ , বাঙালির
তারুণ্য যার দ্বারা বিমোহিত আজন্ম ।

গান আর মানুষের প্রতি অফুরন্ত ভালবাসা ছাড়া এই ভালো মানুষটার আর কিছু ছিলো বলেতো মনে হয় না। কোন অভিমানে যে চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে, কে জানে?আপনাকে ঘিরে থাকা স্মৃতিগুলো জমাট বেঁধে যায়, সে স্মৃতি আর বাড়ে না।

মনে রাখবো,বুকে রাখবো তোমাকে গুরু আজন্ম।

শুভ জন্মদিন গুরু।

ছবি: গুগল