মরচে ধরা টর্চ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

এলিয়ে ছিলো জিনিষটি টেবিলের এক কোনায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে।ছিলো রুজভেল্ট দ্বীপে আমাদের এক প্রতিবেশীর বাড়ীর পড়ার ঘরে। বোঝাই যায়, আছে সে বহুদিন ধরেই। কিন্তু সেই সঙ্গে জানি, দীর্ঘদিন ধরেই ওর কোন ব্যবহার নেই। থাকবেই বা কি করে? ছোট বাতির প্রয়োজন হলে মুঠোফোন তো আছেই। তাই মেঝেতে পড়ন্ত রোদের মতো এলায়ে আছে সে টেবিলের পরে। বহুদিন পরে এককালে নিত্যব্যবহৃত জিনিসটি দেখলাম। খুব বিশুদ্ধ বাংলায় বলা হত ‘বিজলী বাতি’, কিন্তু নিত্যদিনের কথায় আমরা বলতাম ‘টর্চ’ – ইংরেজী ‘টর্চ লাইটের’ সংক্ষিপ্তাকার। তার ধাতব (পরবর্তীতে প্লাস্টিক)মোটা নলের মধ্যে পুরতে হতো ব্যাটারী আর সামনের দিকে একটি বৃত্তাকার কাচের ঢাকনার পেছনে থাকতো অবতল একটি ছড়ানো শঙ্কু যার মাঝে বাতিটির অবস্হান। নলের উপরিস্থিত একটি বোতাম টিপে টর্চের আলো একটি বৃত্তাকার বিন্দুতে যেমন নিয়ে আসা যেতো, তেমনি তাকে ছড়িয়ে দেয়াও যেতো।

কত রকমের যে টর্চ ছিলো। চার ব্যাটারীর টর্চ – সত্যিকার অর্থে বিশাল। সে টর্চের পেটে চারটে বড় ব্যাটারী পরানো হতো। তার সামনের মুখ আর কাঁচ ছিল বেশ বড়োসড়ো। বোতাম টিপলে জোরালো আলো ছড়িয়ে পড়তো সামনে, পাশে চারদিকে। সে জাতীয় টর্চ ব্যবহার করতেন শিকারীরা আর নিরাপত্তা প্রহরীরা। জনান্তিকে আট ব্যাটারীর টর্চের কথাও শুনেছি, তবে দেখি নি কখনো। হয়তো সেটা নিতান্তই গুজব।তবে জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত ছিলো দু’ ব্যাটারীর টর্চ। মনে আছে Eveready নামক টর্চটি ঘরে ঘরে দেখা যেতো। ব্যাটারীর মধ্যে ‘হক’ আর ‘চান্দা’র কথা মনে আছে।

আজকাল টর্চ তেমন একটা দেখা যায় না – ব্যবহার নেই তেমন – হয়তো দূর্যোগ ভিন্ন। মুঠোফোনেই যখন বাতি জ্বালানো যায়, তখন আর ‘বিজলী বাতির’ দরকার কি? কিন্তু আমাদের ছোট বেলায় ঘরে-বাইরে টর্চের ব্যবহার ছিল দেদার। বোনের কানের দুল হারিয়ে গেছে খাটের নীচে, টর্চ জ্বালিয়ে খোঁজ। ভাঁড়ার ঘরে ইঁদুরের খচখচি শোনা যাচ্ছে মনে হলো না? জ্বালো টর্চ। বাড়ীর প্রক্ষালন কক্ষ ঘর ছাড়িয়ে? টর্চ ছাড়া উপায় কি? চোরের ভয়ে আমার মা ঘুমোনোর সময় বালিশের নীচে টর্চ রাখতেন। আমরা হাসাহাসি করতাম। একরাতে কিন্তু সত্যি সত্যিই ঘরে প্রবেশোন্মুখ এক চোর মা’র টর্চের আলা জ্বলে উঠতেই পালিয়েছিলো। বেঁচে গেলাম আমরা।

বরিশাল শহরে বৈদ্যুতিক বাতি চলে যেতো প্রায়ই। তখন হারিকেন খুঁজে বার করা তক টর্চই ভরসা। সারা বাড়ীতে বাবার হাতে একটাই টর্চ এবং সেটার সাহায্যেই হাঁকডাকের মধ্যে হারিকেন অনুসন্ধান। মনে আছে শীতকালে মা-বাবার চোখ এড়িয়ে লেপের নীচে টর্চ জ্বালিয়ে গোগ্রাসে গিলতাম স্বপন কুমার, দস্যু মোহন বা চাঁদের পাহাড়। তারপর একসময় ঘুমিয়ে পড়তাম। সারারাত টর্চ জ্বলে সকালে দেখা যেত যে টর্চের ব্যাটারী শেষ।টর্চকে কম টর্চার করিনি শৈশবে আর কৈশোরে।

গলায় ব্যথা হলে ছোটবেলার বন্ধু বিভা মিশ্রের মামা ‘দ্য মেডিকাসের ডা: এস.সি. রায়’ টর্চের আলো ফেলতেন মুখের ভেতরে। বর্ষার দিনে পাড়ার আনোয়ার ভাই একহাতে চার ব্যাটারীর টর্চ আর অন্য হাতে কোঁচ নিয়ে বেরুতেন মৎস্য শিকারে।পাশের বাড়ীর ফনী জ্যাঠা রাতে ছাত্র পড়িয়ে যখন ফিরতেন, তখন অনেকটা টর্চ দুলিয়ে দুলিয়ে বাড়ী ফিরতেন। বি.এম. স্কুলের নরেন স্যারের সাইকেলের সামনে উজ্জ্বল বাতি থাকা সত্ত্বেও রাতে সাইকেল চালানোর সময়ে

কেনো যে এক হাতে সাইকেলের হাতা ধরে অন্যহাতে তিনি জোরালো টর্চ নিতেন, তা’ আমার কাছে আজও এক রহস্য।

অনেক সময় সন্ধ্যার পর মা-বাবা পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব বা বাবার সহকর্মীদের বাড়ীতে বেড়াতে যেতেন। এখনও চোখ বুঁজলে দেখতে পাই বরিশালের বি.এম. কলেজের উল্টোদিকে কলেজ পাড়ার গলিতে মা-বাবা ঢুকছেন। কাজী গোলাম কাদির স্যার বা বাকের আলী স্যারের বাড়ীতে যাবেন। বাবা একটু সামনে, মা একটু পেছনে। বাবা সামনে টর্চ ফেলে ফেলে তার আলোয় এগুচ্ছেন, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গেই পিছনে আলো ফেলছেন যাতে মা’র অসুবিধে না হয়। আলোর সেই আগু-পিছু কেমন যেন একটা মিষ্টি চিত্রকল্প তৈরী করতো।

টর্চের এক অভিনব ব্যবহার দেখেছিলাম বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীর বাসায়। তাঁর একমাত্র পুত্র যখন এক বালক, তখন তার কানে একদিন একটি জ্যান্ত পিঁপড়ে কেমন করে যেন ঢুকে গিয়েছিলো। ত্রাহি চিৎকার ছেলেটির – কিন্তু কেউ বুঝতে পারছিলেন কি করে এ সমস্যার সমাধান। বালকটির পিতা অত্যন্ত বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিনিষ্ঠ মানুষ। তিনি বললেন যে কোন প্রানীই আলোর দিকে ধাবিত হয়। সুতরাং বালকটির কানের মধ্যে যদি টর্চের আলো ফেলা হয়, তা’হলে সে আলোকরশ্মি দেখে পিঁপড়েটি বেরিয়ে আসবে। উপায়ন্তর না দেখ তাই করা হলো। এবং সত্যি সত্যিই মিনিট পাঁচেক পরে পিঁপড়েটি বেরিয়ে এলো।

তবে একটি টর্চের আলোর কথা আমি আজীবন মনে রাখব। ১৯৭১ সালের আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা। দেশ তখন পাকিস্তানী হানাদারদের কবলে। রাতের বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলাম। রাত বারোটার মতন। হঠাৎ বাস থেমে গেলো কুমিল্লার উপকন্ঠে। বাসে উঠে এলো মেশিনগান হাতে ক’জন পাকিস্তানী সৈন্য। তাদের একজনের হাতে জোরালো টর্চ। যাত্রীদের সবার মুখ ফ্যাকাশে, হতচকিত, ভয়ার্ত – কেউ কেউ প্রার্থনা শুরু করেছেন, পাশের সারিতে একজন মা তাঁর কোলের শিশুটিকে প্রানপনে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরেছেন, অদূরে একজন নববধূ তাঁর বরের হাতটি শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেনে নিয়েছেন। টর্চের জোরালো আলো এক একটি মুখের ওপরে পড়ছে আর কিছুক্ষনের জন্য স্থির হয়ে থাকছে।

একসময়ে আমার মুখের ওপরেও সে আলো পড়লো। ধাঁধিয়ে গেলো আমার চোখ-মুখ। কতক্ষন সে আলো আমার মুখের ওপরে স্থির হয়েছিলো, তা আমি বলতে পারবো না – তবে মনে হয়েছিলো অনন্তকাল। তারই মধ্যে একটা সময়ে আমার মনে হলো আমি চারদিকের কিছু বা কাউকেই দেখছি না। এমন কি ঐ জোরালো টর্চের আলোও নয়। আমি শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম একটি টর্চের পেছনে দু’টো হায়েনার চোখ।

লেখক:ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box