মাইয়া পোলা

সাব্বিরুল হক

দেখতে নাকি মেয়েদের মতো দেখায় আমাকে। মহল্লা আর ক্লাসের বড় ছেলেগুলো ‘মাইয়া পোলা’ বলে ক্ষ্যাপায়। রিকশা গ্যারেজ,দোকানের লোকজন এমনকি মসজিদের হুজুর সুযোগ পেলে গাল টিপে ধরে চুমু মেরে দেয় আড়ালে।সেদিন ফালতু হেলাল পাছা চেপে ধরলো আমার।কোলের দিকে নিয়ে ডলে দিলো বেশ করে।আমি ঝটকা মারতেই কানের কাছে খসখস করে বললো,’আইসক্রিম খাওয়ামু তোরে।’

সেকেন্ড ইয়ারের এক ছাত্রনেতা অনেকদিন ধরে চাচ্ছে আমাকে।ওকে প্রায়ই বলতে শুনি,’তুই একটা জোস মাল।’পাত্তা দেই না দেখে চোখ পাকায়,’আমারে কিন্তু দিতে হবে একদিন।’কি দিতে হবে কিছুটা বুঝতে পারি।কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে বাসার হুজুর একবার আরবি পড়াতে বসে বুক খামচে ধরে শরীর ঘসতে শুরু করেছিলেন।সেদিন বোন চলে আসায় আর কিছু করেননি।তবে আমার মেয়েলী  শরীর হুজুরকে উত্তেজিত করেছিল ভীষণ সেটা বেশ বুঝতে পেরেছিলাম।

আমার পাঁচ বোন-এর মধ্যে তিনজন দেখতে বেশ কালো। রঙ ফর্সা করার জন্য ওদের চেষ্টা খুব বেশিরকমের।  মাসে অন্তত দু’বার ত্বক পরিচর্যা আর রূপচর্চার  প্রসাধনী এবং কসমেটিকস আনিয়ে নেয় ওরা আমাকে দিয়ে।এনে দিই হাসিমুখে।ওরা জিনিসগুলোর নাম কাগজে লিখে দেয়।অনেক সময় কসমেটিকসের দোকানে পাওয়া যায় না।তখন দূরের মাল্টি শপে যেতে হয়।বড় মার্কেটগুলোতে গেলে পাওয়া যায়।ওদের গুরুত্বপূর্ণ প্রসাধনী আনতে শহরে চলে যাই।বিরক্তি লাগে না ওদের জিনিস নিয়ে আসতে।সারাবাড়িতে ফর্সা রঙয়ের একজনই আছে,আমি।বোনেরা বলে আমার নাকি দুধে কলা গায়ের রঙ।দেখে বলে হিংসেই হবে মেয়েদের।

যেকোনো জায়গায় বেড়াতে যেতে আমার আপত্তি না থাকলেও বোনদের আছে । ওরা সবার সঙ্গে মিশতে চায় না আমার মতো । কথাও বলে কম । আত্নীয় বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও বেড়াতে যেতে চায় না । ওদের খুশি বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে । পানিটা এগিয়ে দেবে ।  বানিয়ে দেবে চা নাস্তা । বাড়িয়ে দেবে পাল্টে ফেলার কাপড় চোপড়।

দিনকাল বেশ ভালই কাটছিলো আমার।না,ভুল বললাম।আসলে খারাপের দিকেই যাচ্ছিলো।কেননা এরই মাঝে একদিন ফালতু হেলালের হাতে ধরা পড়ে গেলাম।হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো সে রুস্তমের গ্যারেজে।ছুটতে পারলাম না কিছুতেই।অন্ধকারে একটা মচমচে চৌকির উপর ফেলে দিয়ে যা ইচ্ছে করলো সে।বুঝলাম না কিছুই।শুধু সিগারেটের গন্ধ ছড়ানো মুখে হিসহিস করছিল,’মাইয়া গো ত্থন বেশি নরোম রে তুই। তোর …মারুম।’

ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।আমার ধর্ষণকারী সম্বন্ধে বললাম না কাউকেই কিছু।বললে বিপদে পড়বো,রাস্তাঘাটে হাঁটতে দেবে না!

কিছুদিনের মধ্যে বিপদে পড়ে গেলো এক বোন। কোচিং ক্লাস করতে খুব সকালে একা যাচ্ছিল।পথে ঝাপটা পার্টি ছিনতাই করলো। কে একজন নাকি যাচ্ছিলো সেখান দিয়ে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসে। অবাক হয়ে দেখতে পাই বোনটাকে নিয়ে এসেছে সেই ফালতু হেলাল!বোনদের নিয়ে বড় ধরনের অহংকার ছিলো মনে।এরপর থেকে ওদের নিয়ে নিজের চেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়ে উঠি।দেখতে কালো,বিয়ে থা হচ্ছে না একজনেরও।

হঠাৎ এক সন্ধ্যায় পাড়ার মুরব্বিরা আসেন আমাদের বাড়িতে I আমাকে ডেকে পাঠান । ওদের ভয় পাই আমি , বড়দের রাগ আর কথার তেজ সাংঘাতিক ! সাধারণত পাড়ার গণ্যমান্যদের সামনে পড়তে চাই না।  চারপাশে নারী সমাজ,আর একারণে নিজেকে অসহায় একঘরে আরেক মেয়েমানুষই মনেহয় আমার।

সব দোষ চাপিয়ে দেওয়া হলো আমার ওপর।

‘তুই জানিস না অথচ ওই হেলাল তোর ব্ন্ধু ! এমন ব্ন্ধু

যারে সবাই ফালতু বলে,বখাটে বলে…

বিষয়টা না জানার ভান করতে গিয়ে ধরা পড়ে যাই I কাহিনী গুটিয়ে আনতে চাই।

‘এসব তো আমি কিছুই জানিনা !’

‘অবাক হবার ভান করছিস?তোর বোন,পালিয়েছে কি- না তোর বন্ধু ফালতু হেলালের সঙ্গে ! আবার বলছিস তুই জানিস না ?

কলেজের সেই ছাত্রনেতা পথ আটকে দিলো একদিন।

একা ফিরছিলাম।ধরে নিয়ে গেলো ক্যাম্পাসের ভাঙ্গাচোরা একরুমে।বললো ছাড়ছি না আজ কোনো কিছুতেই।আরো বললো বাড়িতে ফিরে যেতে হলে ওর কথায় রাজি হতে হবে। নাহলে বোন একটাকে ডেকে নিয়ে আসতে হবে সেখানে।ওর প্রস্তাব মেনে না নিয়ে উপায় থাকলো না।ছুরি,পিস্তল সবই রয়েছে দেখলাম ওর।তাই ভাই হয়ে বোনের মান ইজ্জত বাঁচাতে নিজেরই করতে হলো পুরুষের দেহদান!

বাড়িতে এখন চার বোন ।ওদের চেহারা আরেকটু কালো দেখায় আজকাল ।পাড়ার বড় ভাইরা অভয় দিয়ে বলে,’আমরা আছি না? তোর  ভয় কি!তুই তো আবার বিদেশে চলে যেতে পারিস বাবার কাছে তাই না ?

আমি বলি না কিছু।দেখে উৎসাহ বাড়ে বড় ভাইদের,’

আচ্ছা একটা কথা বল তো দেখি

জ্বী কি কথা

তোর বোনদের বিয়ে দিয়ে দিসনা কেনো? আমরা তো  আছিই!

কোনদিকে কেটে গেলো আরো কিছু বছর ।

বাবার মৃত্যু হলো হজ্ব পালনে গিয়ে,ফিরতি পথে মদীনায় সড়ক দুর্ঘটনায়। মায়ের ধরা পড়ল ক্যান্সার।

চার বোনের তিনজন নিলো চাকরি। প্রাইভেট স্কুল, এনজিও আর পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে ।

বোনদের জন্য প্রসাধনী সামগ্রী এখন আর এনে দিতে হয়না । ওদেরটা ওরাই জোগাড় করে নেয় । মা’র ডাক্তার খরচ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কিইনা করতে হয় আমার!

পাড়ার ময়মুরুব্বিরা এখবর জানার চেষ্টা করে এখনো  যে,বোনগুলোর বিয়ে দেওয়া হলো নাকি!অনেক বয়স হয়ে গেছে তারপরও মা বেঁচে আছেন ক্যান্সার শরীরে।  তাও আবার একেবারে ব্লাড ক্যান্সার ! ক’দিন টিকে থাকবেন কে বলতে পারে ?

আত্নীয় স্বজন এখন কেউ আর আসে না।বাড়িটাও খুব সম্ভব বিক্রি করে দিতে হবে আমাকে।মায়ের জন্য উন্নত সেবা শুশ্রুষা দরকার।বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে কোথায় যাবো জানি না।

ছোট যে বোন চলে গিয়েছিল ওকে দেখতে যাই মাঝে মাঝে লুকিয়ে। যাতে অন্য বোনরা জানতে না পারে।  পালিয়ে বিয়ে করেছে বলে কোনো দুঃখ আছে ওর,  বুঝি না। অনেক কথার পর বোনটা যেন স্বান্তনা দেয় আমাকে,’ভাই রে আমার তো একটা সংসার হয়েছে তাই না ?

আমি বলতে চাই,’তাই বলে ওই বখাটেকে নিয়ে!’বলতে পারি না।

মিনমিন করে বলি,’তোর বড় আরো তিনটার কি হবে একবার চিন্তা করেছিলি ?’

ওদেরও এই করতে হবে আমার মতো। বুঝতে পারছিস ?

বুঝতে পারছি না। কেনো !

তুই তো ফর্সা,বুঝবি কেমন করে! তোর ওই কালো কালো চেহারার বোনগুলোকে কে এসেছে বিয়ে করে নিয়ে যেতে ?

আগে ঘুমাতাম বোনদের সঙ্গে।আজকাল রাতে একাই ঘুমাই, ঘুম আসে না । জেগে থেকে রাত কাটাই।  মাঝ রাতের পরে আর খাটে শুয়ে থাকতে পারি না। অস্বস্তি লাগে। একাকি লাগে । আর ভয় ভীতি দেখাতে আসে একা রাতটা।

মধ্যরাতে বাইরে বেরিয়ে এসে আকাশের নিচে দাঁড়াই।  ওপরে তাকাই, অনেক ওপরে। দেখা যায় নাকি কাউকে, যে কি না সৃষ্টি করে সবকিছুকে! কাউকে কালো আর কাউকে সাদা করে। কাউকে সবকিছু দিয়ে আর কাউকে কোনোকিছু না দিয়ে।

আমি খালি চোখে সৌরজগতটাকে  দেখতে পাই।   গ্রহতারা সব নেমে আসে হাতের নাগালে।দূর আকাশের সবকিছুই জানা হয়ে যায় আমার।পুরো নাড়িনক্ষত্র।  একা এক রাতের আকাশ দর্শনে।

ছবিঃ গুগল