মাঝে শুধু একটি মাস…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জয়দীপ রায়

 ১০ জুন.

(কলকাতা থেকে): পরপর দু’দিন বৃষ্টি হ’ল। ভাবলাম মনসুন এসে গেলো বুঝি। আজ সকালে জলভরা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বাতাসের বম্বে শহরে আসার কথা ছিলো। কাল খবরে দেখেছিলাম। দুপুরবেলা গোরেগাঁও থেকে সদুকাকা ফোন করে বললো, ঘুম থেকে উঠেই দেখি বৃষ্টি, ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কাকার ড্রইংরুমের বড় জানলা দিয়ে আমি দেখতে পেলাম সবুজে ছাওয়া একটা সুন্দর শহর সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজলো। ঝুপুস বৃষ্টি। আমি ভাবলাম এখানেও বর্ষা আসলো বোধহয়। পরপর দু’দিন বৃষ্টি হয়েছে। তার আগের দিন নন্টেমামার বাড়ির পাশের আমবাগানে নারকোলগাছে বাজ পড়েছে। খুকুপিসি নিজের চোখে দেখেছে। জানলায় দাঁড়িয়ে ছিলো। বললো, গায়ে হলকা লাগলো একটা আর উপর থেকে ঝুরঝুর করে আগুন পড়তে লাগলো। আমাদের বাড়িতে তখন টুকলু টুসকি ভয়ে দমকে দমকে কাঁদছে। সানাই সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো, ছুটে গিয়ে শকুন্তলার কোলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদে ওঠে। দুটো ইনভার্টার পুড়ে গিয়ে বাড়ি তখন অন্ধকার।

আমি ভাবলাম বর্ষা আসছে তো! তারই প্রস্তুতি চলছে। কে যেন বললো ভগবান আর কত পরীক্ষা নেবে আমাদের! একের পর এক অস্ত্রের মত আসছে করোনা, লকডাউন, ঝড়। দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই আবার করোনা, লকডাউন, ঝড়। একই সিকোয়েন্সে।

১০ জুলাই.

প্রায় একমাস হয়ে গেলো পশ্চিমবঙ্গে বর্ষা এসেছে। বাকি ভারতেও এসেছে। আমাদের গ্রামগঞ্জে প্রচুর ঝিঁঝিঁ ডাকছে। ব্যাঙও ডাকছে। তবে সেভাবে নয়। আরও জল হবে। পুকুর ভেসে যাবে। রস টানার জায়গা থাকবে না পৃথিবীতে আর কোনও। তখন ব্যাঙ ডাকবে ধুন্ধুমার। এখন যার যার বাড়িতে পাতাবাহারের বেড়া তারা সন্ধ্যেবেলায় পাশের বাড়ির বেড়া থেকে যুঁই ফুলের গন্ধ পায়। কলকাতায় এখন কি অবস্হা কে জানে! বহুদিন যাওয়া হয় না ওদিকে। কোন কোন রাস্তায় গেলে তীব্র ছাতিমের গন্ধ পাওয়া যায়, ভুলেই গেছি।

এই করোনা এসে মহা মুশকিল হয়েছে। অনেক কিছুই ভুলে ভুলে যাই। করোনা হয়নি এবারেও, তবু অনেককিছুই মনে থাকে না। আসলে করোনার কথা ভাবতে গিয়ে বোধহয় অনেক কিছুই ভাবা হয় নি বহুকাল। এখন করোনা নেই আর প্রায়। কিন্তু কোভিডে না ভোগা মানুষদেরও অনেকদিন ভুগতে হবে আরও। মন নিয়ে।

খুকুপিসিদের বাড়ির ছ’টা নারকোলগাছ এখনও পুড়ে মাথা মুড়িয়ে রয়েছে। ব্যালকনি থেকে দেখি আর ভাবি যে মাত্র কুড়ি ফুট দূরে বাজ থাকে। গাছ পোড়ায়।

গাছ আমিও অনেক পুড়িয়েছি। চোখ বন্ধ করলে এখনও দেখতে পাই দোতলার ঘরের জানালা দিয়ে গ্রিল গলিয়ে জামরুল ঢোকাচ্ছে গাছ। সঙ্গে কচি সবুজ নরম পাতা। তাতেও জামরুলেরই মত গন্ধ। উঠোন ভরা কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষ, শিউলি, গন্ধরাজ, কামিনী, রক্তকরবী কত ফুলের গাছ! বাড়ি গন্ধে ম ম করতো। সব শেষ করেছি আমি। জানি এজন্যে একদিন কঠিন শাস্তি পেতে হবে আমাকে। সেই ভয়ে মাঝে মাঝে গাছ লাগানোর কথা ভাবি। ভাবি মাঠের মধ্যে পথহীন একটা জমি কিনবো সস্তায় আর তাতে অনেক গাছ ভরে দেবো। কিন্তু শেষপর্যন্ত পথের মায়া ছাড়তে পারি না আর। সেজন্য জমিও মহার্ঘ হয়ে যায়। আমার প্রায়শ্চিত্তও করা হয়ে ওঠেনা আজও।

আমার দিদিমা অনেক গাছ লাগিয়েছে জীবনে। দুটো আমবাগান বানিয়েছে বড়। শকুন্তলাও গাছ ভালবাসে, পাগলের মত। ওদের বাড়ির সামনে খুজুজ্যাঠা ছিলেন গাছপাগল। যেখানে জায়গা পান, গাছ লাগাতে ছোটেন। পেছন পেছন ছেলেবেলার শকুন্তলা, বদন, রতন হাতে হাতে শাবল, কোদাল নিয়ে।

এবারে আমরাও কিছু গাছ লাগাতে পেরেছি। বেশ কিছু দেবদারু আর কিছু ফুলের গাছ। যেদিন যেদিন গাছ লাগানোর কথা ছিলো, আগের রাতে বৃষ্টি হয়। মাটি নরম হয়ে কোদাল খাবার জন্য রেডি হয়ে থাকে। বৃক্ষরোপণ হয়ে গেলে বৃষ্টি হয়। হাইস্কুল মাঠে ফুলের গাছগুলো বাঁচানোর জন্য প্রথম দু’দিন দু’বেলা জল দিতে হয়েছে। তারপর থেকে আকাশই জল দিচ্ছে নিয়মিত। আকাশ আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড় একটা ছেলে।

আজ স্কুলমাঠের পাশে বাড়ি বাবন একটা ছবি পাঠালো। অমলতাস গাছের ডালভর্তি ফড়িং। তেরোটা অব্দি গুনতে পেরেছি। ছবির নিচে লিখে পাঠিয়েছে,অমলতাসে এখন ফড়িং আসে।

মাঠের পাশে তপারও বাড়ি। ও নাকি সুজিতকে বলেছে গাছগুলো বেঁচে গেল সব। বৃষ্টিতে পর্যাপ্ত জল থাকলেও প্রতিদিনই কেউ না কেউ গাছগুলোকে দেখতে যাচ্ছে। কেমন আছে ওরা। সবাই বলছে সব গাছই বেঁচে যাবে। গাছ যার কাছ থেকে এনেছিলাম, তিনিও বলে দিয়েছিলেন, একটা গাছও মারা গেলে পাল্টে দেব। কোন ভরসায় বলেছিলেন জানি না, কিন্তু গাছগুলোকে বোধহয় প্রকৃতি আর মানুষের ভালবাসাই বাঁচিয়ে দিলো।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box