মাতাহারিঃ নগ্ন নাচিয়ে থেকে গুপ্তচর

 

গুলি করে মারা হচ্ছে মাতাহারিকে

মার্গারিটা গ্রিট্রুডিয়া জিলি। জন্ম হল্যান্ডে।নাম শুনে চেনার কোন উপায় নেই। কিন্তু যদি বলা হয় এই কঠিন নামের আড়ালে আছে পৃথিবীখ্যাত নারী গুপ্তচর মাতাহারি তাহলে সবার ইতিহাস চেতনা সায় দেবে।মাতাহারি ছিলেন গুপ্তচর।

সময়টা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কাল। রূপ আর অনবদ্য নগ্ন নৃত্যকে ব্যবহার করে মাতাহারি মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন ইউরোপের অভিতাজ শ্রেণীর মানুষদের। তার কাজই ছিল এভাবে জার্মান সেনাবাহিনীর জন্য খবর সংগ্রহ করা। মাতাহারি ছিলেন জার্মান গোয়েন্দা বিভাগের প্রধা্ন কর্ণেল ওয়াল্টার নিকোলির এজেন্ট এইচ-১৭। কিন্তু বেশীদিন স্থায়ী হয় নি এই নারী গুপ্তচরের জীবন। ফরাসী গোয়েন্দাদের পাতা ফাঁদে ধরা পড়েন মাতাহারি। বিচারে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলিতে মৃত্যু হয় তার।

মাতাহারির শৈশব খুব একটা খারাপ কাটে নি। বাবার ছিল টুপির কারখানা। কিন্তু হঠাৎ একটা সময়ে এসে মাতাহারির বাবা দেউলিয়া হয়ে যায় ব্যবসায়। এই শোকে এক বছরের মাথায় মারা যায় তার মা।বাবা মাতাহারি আর তার ভাইবোনদের পাঠিয়ে দেয় হল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় আত্নীয়স্বজনদের কাছে। এখান থেকেই তাদের পুরো পরিবারটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মাতাহারি ১৮ বছর বয়সে বিয়ে করে বসেন হল্যান্ড সেনাবাহিনীর এক বয়ষ্ক কর্ণেলকে। কিন্তু সে বিয়েও বেশীদিন স্থায়ী হয় না। সংক্ষিপ্ত সংসার জীবনে দুই সন্তানের মা হয়েছিলেন মাতাহারি। কিন্তু তার দুটি সন্তানই অসুস্থ হয়ে মারা যায়। মাতাহারির যাত্রা শুরু হয় অন্য এক জীবনের পথে।

নাচ শিখেছিলেন এই নারী গুপ্তচর। তখন অবশ্য তার গুপ্তচর জীবন শুরু হয় নি। ১৯০২ সালে ‘লেডি মেকলিওয়ড’ নামে মাতাহারি প্যারিস শহরের বিভিন্ন মঞ্চ মাতাতে শুরু করেন। তার অসাধারণ শারীরিক সৌন্দর্য আর নাচের কলাকৌশল অল্প সময়ের মধ্যে সুগন্ধ ছড়াতে শুরু করে। ১৯০৫ সালে মঞ্চে ‘মাতাহার’ নাম নিয়ে নাচের অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন তিনি। তার নৃত্যনাট্য ‘আই অফ দ্য ডে’, ‘সান’ সেই সময়ে ভীষণ হৈ চৈ ফেলে দেয়। মঞ্চে উন্মুক্ত শরীরের নাচ তাকে রাতারাতি প্যারিসে আলোচিত নারীতে পরিণত করে। প্যারিসের অভিজাত ব্যক্তিদের কাছে তার যাতায়াত হয়ে ওঠে অবারিত।আর সম্ভবত এখান থেকেই শুরু হয় তার গুপ্তচর জীবনের ভূমিকা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মাতাহারির বিলাসবহুল জীবন আর নাচ বন্ধ করতে পারে নি। প্যারিসের অভিজাত মহল তখনও তার শরীরের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। নাচের সূত্র ধরে এই নারী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবাধে যাতায়াত করতেন। আর তখনই জার্মান গোয়েন্দা বিভাগের কর্ণেল ওয়াল্টার নিকোলির নজরে পড়ে যান তিনি। ১৯১৪ সালে জার্মান গোয়েন্দা বাহিনীর চর হিসেবে খাতায় নাম লেখান মাতাহারি। তখন থেকে যুদ্ধে বিপক্ষ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করে তা জার্মান সামরিক সদর দপ্তরে পাঠাতে শুরু করেন। এক সময়ে ইংল্যান্ডের গোয়েন্দাদের হাতে প্রায় ধরাই পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বৃটিশ গোয়েন্দা বিভাগের হাতে তেমন কোন প্রমাণ না থাকায় ছাড়া পেয়ে যান মাতাহারি। ছাড়া পেলেন ঠিকই কিন্তু নজরদারি বন্ধ হলো না। বৃটিশ গোয়েন্দারা ফরাসী গোয়েন্দা বিভাগকে মাতাহারি সম্পর্কে সজাগ করে দিলো। ফরাসী গোয়েন্দারাও নজর রাখতে শুরু করলো তার ওপর। মাতাহারিকে ধরার সুযোগও এসে গেল তাদের হাতে। ১৯১৭ সালে প্যারিসের এক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যুদ্ধের সময় ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ খবর পাচার করার। ফ্রান্সের আদালত সংক্ষিপ্ত বিচার শেষে ঘোষণা করলো মাতাহারির মৃত্যুদন্ড।

১৯১৭ সালের ১৯ অক্টোবর প্যারিসের এক প্রাচীন দূর্গ ‘কাসেরানি দ্য ভেনসিনেস’-এ সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে এই নারী গুপ্তচরকে। বৃটিশ সাংবাদিক হেনরি ওয়ালেস এই খবরটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোতে প্রচার করেন। খবরটি ছিল এরকম, ‘‘সৈন্যরা এসে সারবন্দী হয়ে দাঁড়ালো দূর্গের ভেতরে। তাদের হাতের বন্দুক তখনও নামানো। একজন নন কমিশন অফিসার দন্ডায়মান এই দলটির পেছনে। একটু পরেই মাতাহারিকে নিয়ে একটি গাড়ি প্রবেশ করলো দূর্গে। মাতাহারি শান্ত ভঙ্গীতে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে দাঁড়ালেন একটি কাঠের তক্তার সামনে। কাঠের দন্ডটির সঙ্গে তাকে বেঁধে ফেলার পর নিয়ম অনুযায়ী এলেন পুরোহিত। তার কথা শেষ হওয়ার পর এক সামরিক অফিসার মাতাহারির মাথায় পড়িয়ে দিতে চাইলো সাদা মুখোশ। মাতাহারি প্রশ্ন করলেন,‘এটা কি আমাকে পড়তেই হবে’? অফিসার উত্তরে বললেন ‘সেটা আপনার ইচ্ছা। তাতে কিছু আসবে যাবে না’।

অকম্পিত ভঙ্গীতে মাতাহারি দাঁড়িয়ে রইলেন সেখানে। নন কমিশন অফিসারের হাতে ধরা তরবারিটি শূণ্যে উঠে গেলো। তারপর নেমে এলো অমোঘ নির্দেশের মতো। গুলি ছুঁড়লো সৈন্যরা। গুলির আঘাতে মাতাহারির শরীর খানিকটা ঝুঁকে, পা ভাঁজ করে ঝুলে রইলো কাঠের তক্তার সঙ্গে।নিষ্পলক দৃষ্টি আকাশের দিকে, সে দৃষ্টিতে ছিলো না কোন অভিযোগ’’।

মাতাহারিকে নিয়ে প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র তৈরী হয় জার্মানীতে ১৯২০ সালে।এই নারী গুপ্তচরের জীবন নিয়ে এরপর ইউরোপ এবং হলিউডে সিনেমা তৈরী হয়েছে বহুবার। সবচাইতে আলোচিত ছবিটি তৈরী হয় ১৯৩১ সালে। বিখ্যাত অভিনেত্রী গ্রেটা গার্বো তাতে অভিনয় করেন নাম ভূমিকায়। মাহারি ইতিহাসের পাতায় এতোটাই বিখ্যাত যে হল্যান্ড সরকার পরবর্তী সময়ে তার ওপর ডাকটিকেটও প্রকাশ করে।

মনসুর রহমান

তথ্য ও ছবিঃ পিন্টারেস্ট